মুক্তদেশ ডেস্ক:জধানীতে শিশু রামিসাকে পৈশাচিক কায়দায় হত্যার ঘটনায় দেশজুড়ে সৃষ্টি হয়েছে গভীর ক্ষোভ ও শোক। এক সপ্তাহের ব্যবধানে চার শিশুকে ধর্ষণ ও হত্যার ঘটনায় কন্যাশিশুর অভিভাবকদের মধ্যে বেড়েছে আতঙ্ক। বৃহস্পতিবার চট্টগ্রামে ধর্ষণের অভিযোগে গ্রেপ্তার এক ব্যক্তিকে পুলিশের কাছ থেকে ছিনিয়ে নেওয়ার চেষ্টা করে বিক্ষুব্ধ জনতা।
শুধু এসব ঘটনাই নয়, সারা দেশে দখল, চাঁদাবাজি, খুন, ছিনতাই, চুরি-ডাকাতির মতো অপরাধ যেন নিত্যদিনের বাস্তবতা হয়ে উঠেছে। পুলিশের পরিসংখ্যান অনুযায়ী, দেশে প্রতিদিন গড়ে প্রায় ১০ জন খুন হচ্ছেন। অপহরণের শিকার হচ্ছেন গড়ে তিনজন। আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর সদস্যরাও নিরাপদ নন; মাঠপর্যায়ে হামলার শিকার হচ্ছেন নিয়মিত। গতকাল দায়িত্ব পালনকালে নিহত হয়েছেন র্যাবের এক সদস্য।
সংশ্লিষ্টরা বলছেন, অন্তর্বর্তী সরকারের আমলে ভেঙে পড়া আইনশৃঙ্খলা পরিস্থিতি নানা উদ্যোগের পরও কাঙ্ক্ষিত মাত্রায় নিয়ন্ত্রণে আনা সম্ভব হয়নি। পরিস্থিতি সামাল দিতে ‘অপারেশন ক্লিনহার্ট’-এর আদলে নতুন করে চিরুনি অভিযানের কথা ভাবছেন নীতিনির্ধারকরা। সম্প্রতি সরকারের প্রভাবশালী দুই মন্ত্রী আলাদা অনুষ্ঠানে বিশেষ অভিযানের ইঙ্গিত দিয়েছেন।
অপরাধ বিশ্লেষকদের মতে, ধারাবাহিক অপরাধপ্রবণতা আইনশৃঙ্খলা পরিস্থিতির অবনতির স্পষ্ট ইঙ্গিত। মানুষের মধ্যে স্বস্তি ফেরাতে বিশেষ অভিযান কার্যকর হতে পারে। তবে এ ধরনের অভিযানে যেন কোনো আইনবহির্ভূত ঘটনা না ঘটে, সে বিষয়ে সতর্ক থাকার পরামর্শ দিয়েছেন তারা।
২০০২ সালে আইনশৃঙ্খলা পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণে তৎকালীন বিএনপি নেতৃত্বাধীন চারদলীয় জোট সরকার ‘অপারেশন ক্লিনহার্ট’ নামে বিশেষ অভিযান পরিচালনা করেছিল। তখন দ্রুত পরিস্থিতির উন্নতি হয়েছিল বলে দাবি করা হয়।
সম্প্রতি দলীয় এক সভায় রাজনৈতিক সহিংসতা ও বিশৃঙ্খলা বন্ধে নেতাকর্মীদের সতর্ক করেন স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী সালাহউদ্দিন আহমদ। সভায় উপস্থিত যুবদল সভাপতি মোনায়েম মুন্না বলেন, প্রধানমন্ত্রী উপস্থিত ওই সাংগঠনিক বৈঠকে স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী কড়া হুঁশিয়ারি দিয়ে বলেছেন, আইনশৃঙ্খলার অবনতি ঘটায়— এমন কোনো কর্মকাণ্ডে জড়িতদের ছাড় দেওয়া হবে না। প্রয়োজনে সরকার কঠোর সিদ্ধান্ত নেবে। গত ৯ মে খামারবাড়ির কৃষিবিদ ইনস্টিটিউশনে বিএনপি ও এর সহযোগী সংগঠন যুবদল, ছাত্রদল ও স্বেচ্ছাসেবক দলের ওই সভা অনুষ্ঠিত হয়।
এর আগে মার্চ মাসে পরিবেশ, বন ও জলবায়ু পরিবর্তনমন্ত্রী আবদুল আউয়াল মিন্টু বলেছিলেন, সরকার দুই-তিন মাসের মধ্যেই ‘অপারেশন ক্লিনহার্ট’-এর মতো একটি অভিযান চালাবে। প্রকৃত অপরাধীদের আইনের আওতায় আনা হবে এবং কাউকে ছাড় দেওয়া হবে না। ফেনী জেলা প্রশাসকের সম্মেলন কক্ষে আইনশৃঙ্খলাবিষয়ক এক সভায় তিনি এ মন্তব্য করেন।
র্যাবের মহাপরিচালক আহসান হাবীব পলাশ বলেন, “মন্ত্রী যদি এমন কথা বলে থাকেন, তাহলে সেটি অবশ্যই একটি বার্তা। তবে আমরা ৫ আগস্টের আগের পুলিশিং ব্যবস্থায় ফিরতে চাই না। আইনশৃঙ্খলা পরিস্থিতির ধীরে ধীরে উন্নতি হচ্ছে। কিছুটা সময় লাগবে, সবাইকে ধৈর্য ধরতে হবে।”
এদিকে আইনশৃঙ্খলা পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণে পুলিশকে সহায়তা দিতে মাঠে মোতায়েন সেনাসদস্যদের ধাপে ধাপে ব্যারাকে ফিরিয়ে নেওয়া হচ্ছে। আগামী মাসের মাঝামাঝি সময়ে সব সদস্যের ফেরার কথা রয়েছে। সংশ্লিষ্ট সূত্র জানিয়েছে, সেনাসদস্যদের অনুপস্থিতিতে নতুন নিরাপত্তা পরিকল্পনা সাজাচ্ছে পুলিশ। পুলিশের ঊর্ধ্বতন কর্মকর্তাদের সঙ্গে কথা বলে জানা গেছে, পরিস্থিতির আরও অবনতি ঠেকাতে জুন মাসেই ‘অপারেশন ক্লিনহার্ট’-এর আদলে নতুন নামে চিরুনি অভিযানের পরিকল্পনা চলছে।
সাবেক মহাপুলিশ পরিদর্শক আশরাফুল হুদা বলেন, “দুই-তিন মাস পরে নয়, পুলিশের অভিযান আজ থেকেই শুরু হওয়া উচিত। এটি তো পুলিশের দৈনন্দিন দায়িত্ব। নিয়মিত কাজ সঠিকভাবে হলে বিশেষ অভিযানের প্রয়োজন পড়ে না। পুলিশের উপস্থিতি দৃশ্যমান হতে হবে, যাতে অপরাধীরা ভয় পায়। এখন পরিস্থিতি এমন যে, ভদ্রলোক পুলিশকে ভয় পায়, কিন্তু সন্ত্রাসীরা পায় না।”
পুলিশ সদর দপ্তরের তথ্য অনুযায়ী, চলতি বছরের প্রথম চার মাসে দেশে ১ হাজার ১৪২টি হত্যাকাণ্ড ঘটেছে। অর্থাৎ দিনে গড়ে প্রায় ১০ জন খুন হয়েছেন। ২০২৪ সালের একই সময়ে হত্যা মামলা ছিল ১ হাজার ৬টি এবং ২০২৫ সালে ছিল ১ হাজার ১৭টি। সে হিসাবে, ২০২৪ সালের তুলনায় হত্যাকাণ্ড বেড়েছে ১৩ দশমিক ৫২ শতাংশ এবং ২০২৫ সালের তুলনায় বেড়েছে ১২ দশমিক ২৯ শতাংশ।
তবে এই পরিসংখ্যান কেবল থানায় দায়ের হওয়া হত্যা মামলার ওপর ভিত্তি করে তৈরি। এর বাইরে অজ্ঞাতপরিচয় মরদেহ উদ্ধারের ঘটনায় অপমৃত্যুর মামলা হয়, যেগুলোর অনেকগুলো পরবর্তীতে হত্যাকাণ্ড হিসেবে প্রমাণিত হয়। আবার অনেক ঘটনায় মরদেহ না পাওয়ায় মামলাই হয় না।
পুলিশ সদর দপ্তরের অপরাধ বিশ্লেষণে দেখা গেছে, ঢাকা বিভাগে অপরাধপ্রবণতা সবচেয়ে বেশি। চলতি বছরের প্রথম চার মাসে ঢাকা রেঞ্জে খুন, চুরি, ডাকাতি, নারী ও শিশু নির্যাতনসহ বিভিন্ন অপরাধে মামলা হয়েছে ১১ হাজার ৮৭১টি। দ্বিতীয় অবস্থানে থাকা চট্টগ্রাম রেঞ্জে মামলা হয়েছে ৯ হাজার ৯০৮টি। এরপর রংপুর রেঞ্জে ৫ হাজার ৩৯০টি, খুলনায় ৫ হাজার ৩৫২টি এবং রাজশাহীতে ৫ হাজার ২২৪টি মামলা হয়েছে। একই সময়ে ঢাকা মহানগরে মামলা হয়েছে ৫ হাজার ১৮৬টি।
ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের সমাজকল্যাণ ও গবেষণা ইনস্টিটিউটের সহযোগী অধ্যাপক ও অপরাধ বিশ্লেষক ড. তৌহিদুল হক বলেন, “অতীতে অপরাধ দমনে যে অনিয়ম ও অব্যবস্থাপনা ছিল, এখন সরকারকে তার ফল মোকাবিলা করতে হচ্ছে। এ পরিস্থিতিতে অপারেশন ক্লিনহার্টের মতো অভিযান হতে পারে। তবে এ ধরনের অভিযানে আইনবহির্ভূত কর্মকাণ্ডের ঝুঁকি থাকে, সেদিকে সতর্ক থাকতে হবে।”
চলতি বছরের প্রথম চার মাসে রাজধানীসহ দেশের বিভিন্ন স্থানে বেশ কয়েকটি বর্বরোচিত হত্যাকাণ্ডের ঘটনা ঘটে। গত ২৭ ফেব্রুয়ারি মতিঝিলে মোহাম্মদ ওবায়দুল্লাহকে হত্যার পর মরদেহ সাত টুকরো করে বিভিন্ন স্থানে ফেলে দেওয়া হয়। পরে পুলিশ খণ্ডিত মরদেহ উদ্ধার করে এবং সন্দেহভাজন শাহীনকে গ্রেপ্তার করে।
১৪ এপ্রিল রাতে যাত্রাবাড়ীর কাজলায় কলেজছাত্রী মাহাদিয়া হাসান নবনী ওরফে দিয়ামনিকে কুপিয়ে হত্যা করা হয়। হামলায় তার মায়ের একটি কবজি বিচ্ছিন্ন হয়ে যায়; আহত হন ভাই ও বোনও। ২৮ এপ্রিল নিউ মার্কেট এলাকায় প্রকাশ্যে গুলি করে হত্যা করা হয় শীর্ষ সন্ত্রাসী খন্দকার নাঈম আহমেদ টিটনকে। ১১ এপ্রিল কুষ্টিয়ার দৌলতপুরে দরবার শরিফে ঢুকে পীর আবদুর রহমান শামীমকে কুপিয়ে ও পিটিয়ে হত্যা করা হয়। ২৬ এপ্রিল চট্টগ্রামের রাউজানে দুর্বৃত্তদের গুলিতে নিহত হন যুবদলকর্মী নাসির উদ্দিন।
অপহরণের ঘটনাও উদ্বেগজনক হারে বেড়েছে। ২০২৪ সালের প্রথম চার মাসে অপহরণের ঘটনা ছিল ২০০টি। ২০২৫ সালে তা বেড়ে দাঁড়ায় ৩৫৪টিতে। চলতি বছরের একই সময়ে অপহরণের শিকার হয়েছেন ৩৪৭ জন।
চাঁদাবাজির আলাদা পরিসংখ্যান পুলিশের কাছে না থাকলেও রাজধানী থেকে প্রত্যন্ত অঞ্চল পর্যন্ত ব্যবসায়ীরা এর কারণে অতিষ্ঠ। চাঁদাবাজির প্রভাব পড়ছে পণ্যের দামেও। ঢাকা চেম্বার অব কমার্স অ্যান্ড ইন্ডাস্ট্রির (ডিসিসিআই) সভাপতি তাসকিন আহমেদ সম্প্রতি বলেন, “আইনশৃঙ্খলা পরিস্থিতির কার্যকর উন্নয়ন ও চাঁদাবাজি নির্মূলে গুরুত্ব দিতে হবে। এখন কারখানা থেকে পণ্য বের করা বা আনা-নেওয়ার ক্ষেত্রেও চাঁদা দিতে হচ্ছে। কারা এই চাঁদাবাজির সঙ্গে জড়িত, সরকারকে তা খুঁজে বের করে ব্যবস্থা নিতে হবে।”
সংশ্লিষ্টরা বলছেন, অপরাধ নিয়ন্ত্রণে মাঠে থাকা আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর সদস্যরাও এখন ঝুঁকির মধ্যে রয়েছেন। ২০২৫ সালে দায়িত্ব পালনকালে পুলিশ সদস্যদের ওপর ৬০১টি হামলার ঘটনা ঘটেছে। চলতি বছরের প্রথম চার মাসেই হামলার ঘটনা ঘটেছে ২১৩টি।
