একে একে ভেঙে পড়ল সেতুর সাত গার্ডার
মুক্তদেশ ডেস্ক:
সেতু নির্মাণ নয়, যেন লুটপাটের মহোৎসব চলছে। সুনামগঞ্জবাসীর বহুদিনের স্বপ্ন এখন অনিশ্চয়তায় আটকে আছে। বিশ্বম্ভরপুর–মহেষখলা–মধ্যনগর সংযোগ সড়কের (সীমান্ত সড়ক) যাদুকাটা নদীর ওপর নির্মাণাধীন শাহ আরেফিন (রা.)–অদ্বৈত মহাপ্রভু মৈত্রী সেতুর কাজে দেখা দিয়েছে বড় ধরনের সংকট। প্রায় ৮৬ কোটি টাকা ব্যয়ে নির্মিতব্য এই সেতুর গার্ডার দুই বছরের মধ্যে দুই দফায় ভেঙে পড়েছে। সব মিলিয়ে সাতটি গার্ডার ধসে পড়ায় আতঙ্ক ও ক্ষোভ ছড়িয়ে পড়েছে এলাকাজুড়ে।
স্থানীয়দের আশঙ্কা, যাদুকাটা নদীর ওপর থাকা বাকি গার্ডারগুলোর অবস্থাও ঝুঁকিপূর্ণ। সীমান্তের গুরুত্বপূর্ণ বালুমহাল হিসেবে পরিচিত এই নদীপথে প্রতিদিন শত শত নৌযান চলাচল করে। ফলে আবারও গার্ডার ধসে পড়লে বড় ধরনের দুর্ঘটনার আশঙ্কা রয়েছে।
এলজিইডির এক কর্মকর্তা বলেন, এর চেয়েও গভীর ও খরস্রোতা নদীতে সুনামগঞ্জে বহু সেতু নির্মাণ হয়েছে। কিন্তু একই সেতুর গার্ডার বারবার ভেঙে পড়ার এমন নজির নেই। তিনি জানান, সেতুর ঠিকাদারি প্রতিষ্ঠান তমা কনস্ট্রাকশনের মালিক আতাউর রহমান ২০২৪ সালের ৫ আগস্টের পর দেশ ছেড়েছেন। যদিও এরও আগে থেকেই নির্মাণকাজ কার্যত বন্ধ ছিল। কিন্তু দীর্ঘ সময়েও এলজিইডি কার্যকর কোনো ব্যবস্থা নেয়নি।
সম্প্রতি ঠিকাদারি প্রতিষ্ঠান বাতিল করে অসমাপ্ত কাজ শেষ করতে নতুন দরপত্র আহ্বানের প্রক্রিয়া শুরু হয়েছিল। তবে সোমবার বিকেলে আরও পাঁচটি গার্ডার ভেঙে পড়ার পর সেই প্রক্রিয়াও থমকে গেছে। এখন নতুন করে ক্ষয়ক্ষতির হিসাব ও ব্যয়ের প্রাক্কলন তৈরি করতে হবে।
এলজিইডির প্রকৌশল সূত্র জানায়, পল্লি সড়ক নির্মাণ প্রকল্পের আওতায় ২০১৮ সালের ডিসেম্বরে সেতুটির নির্মাণকাজ শুরু হয়। রাজধানীর তমা কনস্ট্রাকশন একাধিক দফায় সময় বাড়িয়েও আট বছরে কাজ শেষ করতে পারেনি। সেতুর মোট ৭৫টি গার্ডারের মধ্যে এখনও ১৮টি ডি-গার্ডার ও পাঁচটি স্লাবের কাজ বাকি রয়েছে। এর মধ্যেই দুই দফায় সাতটি গার্ডার ভেঙে পড়েছে।
তমা কনস্ট্রাকশনের মালিক আতাউর রহমান মানিক নোয়াখালীর বাসিন্দা। বিগত সরকারের সময়ে তিনি সাবেক মন্ত্রী মির্জা আজমের ঘনিষ্ঠ হিসেবে এলজিইডি সদরদপ্তরে পরিচিত ছিলেন। শুধু যাদুকাটা সেতুই নয়, একই সীমান্ত সড়কের মধ্যনগরের সোমেশ্বরী সেতু এবং তাহিরপুরের ডাম্পের বাজার সেতুর কাজও পায় তাঁর প্রতিষ্ঠান। কিন্তু আট বছরেও এসব প্রকল্পের কাজ শেষ হয়নি। স্থানীয়দের অভিযোগ, এসব সেতুর কাজেও ছিল ব্যাপক অনিয়ম ও নিম্নমানের নির্মাণসামগ্রীর ব্যবহার।
এলাকাবাসীর অভিযোগ, ঠিকাদারি প্রতিষ্ঠানের মালিক দেশ ছেড়ে কানাডায় চলে গেলেও তাঁর বিরুদ্ধে কোনো আইনি ব্যবস্থা নেওয়া হয়নি। এলজিইডি শুধু ঠিকাদারি বাতিল করে নতুন দরপত্র আহ্বানের উদ্যোগ নিয়েছে।
তাহিরপুরের ব্যবসায়ী ফেরদৌস আলম বলেন, “দুই দফায় সাতটি গার্ডার পড়ে গেছে। এই সেতু ভেঙে নতুন করে নির্মাণ করা উচিত। গার্ডার ভাঙার পর এলজিইডির দায়িত্বজ্ঞানহীন বক্তব্যে মানুষ আরও ক্ষুব্ধ।”
তাহিরপুর উপজেলা বিএনপির আহ্বায়ক কমিটির সদস্য আমির শাহ্ বলেন, “রাষ্ট্রীয় সম্পদ লুটপাটের সময় এই সেতুর কাজ হয়েছে। তদন্ত করে নির্মাণকারী প্রতিষ্ঠান ও সংশ্লিষ্ট কর্মকর্তাদের বিরুদ্ধে ব্যবস্থা নিতে হবে।”
মঙ্গলবার সেতু এলাকায় গিয়ে দেখা যায়, স্থানীয়দের মধ্যে তীব্র ক্ষোভ বিরাজ করছে। তাঁদের অভিযোগ, আট বছর ধরে শুধু প্রকল্পের নামে টাকা লুটপাট হয়েছে, কিন্তু কাজের অগ্রগতি নেই। সেতুর পাশের রাজারগাঁও গ্রামের মাওলানা শামীম আহমদ বলেন, “অবহেলা আর অনিয়ম না থাকলে দুই বছরের মধ্যে দুইবার গার্ডার ভাঙত না।”
লামাশ্রম এলাকার বাসিন্দা আব্দুল মজিদ বলেন, “সেতু তো হয়নি, উল্টো নির্মাণসামগ্রী ফেলে রেখে মানুষের চলাচলে দুর্ভোগ তৈরি করা হয়েছে।”
বাদাঘাট ইউনিয়ন পরিষদের চেয়ারম্যান নিজাম উদ্দিন বলেন, “নির্মাণ ত্রুটির কারণেই এমন ঘটনা ঘটছে। এখন কাজ আরও পিছিয়ে যাবে।”
তমা কনস্ট্রাকশনের ম্যানেজার আনিসুর রহমানের সঙ্গে যোগাযোগ করা হলে তিনি এ বিষয়ে কোনো তথ্য জানেন না বলে দাবি করেন এবং এলজিইডির নির্বাহী প্রকৌশলীর সঙ্গে যোগাযোগ করতে বলেন। পরে আর ফোন ধরেননি।
সুনামগঞ্জ এলজিইডির নির্বাহী প্রকৌশলী আনোয়ার হোসেন জানান, আগের ঠিকাদারি প্রতিষ্ঠান বাতিল করে নতুন দরপত্রের কাজ প্রায় শেষ হয়েছিল। প্রায় ১৯ কোটি ৮০ লাখ টাকা ব্যয়ে নতুন প্রস্তাব প্রস্তুত করা হয়েছিল। কিন্তু সাম্প্রতিক গার্ডার ধসের পর আরও প্রায় দুই কোটি টাকা ব্যয় বাড়িয়ে নতুন প্রাক্কলন তৈরি করতে হবে। এতে অন্তত এক মাস সময় লাগবে। তিনি বলেন, ভেঙে যাওয়া গার্ডার পুনর্নির্মাণে আরও আট থেকে নয় মাস সময় লাগতে পারে।
তবে কাজে অনিয়মের অভিযোগ অস্বীকার করে তিনি বলেন, ঠিকাদারি প্রতিষ্ঠান গার্ডার স্থাপনের সময় ‘ক্লোজ গার্ডার’ পদ্ধতি অনুসরণ না করায় এ দুর্ঘটনা ঘটেছে। এজন্য প্রতিষ্ঠানটির পাওনা বিল থেকে দুই কোটি ১০ লাখ টাকা কেটে রাখা হবে।
সোমেশ্বরী ও ডাম্পের বাজার সেতুতেও একই চিত্র
একই সীমান্ত সড়কের সোমেশ্বরী নদীর ওপর ৪২ কোটি টাকা ব্যয়ের আরেকটি সেতুর কাজও অসমাপ্ত রেখে তমা কনস্ট্রাকশনের লোকজন এলাকা ছেড়েছে। এ প্রকল্পেও নতুন দরপত্র আহ্বান করা হয়েছে। এছাড়া ৪৭ কোটি টাকা ব্যয়ের ডাম্পের বাজার সেতুর অ্যাপ্রোচ সড়কের কাজও শেষ করেনি প্রতিষ্ঠানটি। সম্প্রতি এ প্রকল্প থেকেও তমা কনস্ট্রাকশনকে বাতিলের প্রস্তাব পাঠিয়েছে এলজিইডি।
