মুক্তদেশ ডেস্ক: গত ১৩ বছর ধরে সি চিন পিং যুক্তরাষ্ট্রের সমকক্ষ এক বিশাল সামরিক বাহিনী গড়ে তোলার পেছনে সময় দিয়েছেন। কিন্তু চীনের সামরিক শক্তি যত বেড়েছে, বাহিনীর শীর্ষ পর্যায়ে নিজের হাতে বেছে নেওয়া জেনারেলদের ওপর সি চিন পিংয়ের আস্থা ততটাই কমেছে। সূত্র :নিউইয়র্ক টাইমসের বিশেষ প্রতিবেদন।
সম্প্রতি চীনের একটি নীতি-নির্ধারণী সভায় সি চিন পিংয়ের চালানো সামরিক শুদ্ধি অভিযানের চিত্রটি স্পষ্টভাবে ফুটে উঠেছে। এক বছর আগেও রাষ্ট্রীয় টেলিভিশনের ফুটেজে একই ধরনের সভায় প্রায় ৪০ জন জেনারেলকে দেখা গিয়েছিল। কিন্তু এবারের সভায় হাতেগোনা কয়েকজনের উপস্থিতি দেখা গেছে। চীনের এই নেতা স্পষ্ট বুঝিয়ে দিয়েছেন যে মাও সে–তুং আমলের মতো বড় ধরনের রদবদলের পালা এখনো শেষ হয়নি। কঠোর মুখে সভায় উপস্থিত বাকি কর্মকর্তাদের সি সতর্ক করে দিয়ে বলেন, কারও মধ্যে যেন বিন্দুমাত্র আনুগত্যহীনতা না থাকে।
সি চিন পিং বলেন, ‘সেনাবাহিনীতে এমন কেউ থাকতে পারবেন না, যাঁর মনের মধ্যে পার্টির প্রতি বিভক্তি বা দ্বিধা রয়েছে।’ ক্ষমতায় আসার পর গত ১৩ বছরের মধ্যে সি চিন পিংয়ের জন্য এ এক অন্যতম বড় রাজনৈতিক সংকট। গত এক দশক ধরে যে সামরিক নেতৃত্বকে তিনি নিজের মনের মতো করে সাজিয়েছিলেন, শেষ পর্যন্ত তাদের ওপর থেকেই আস্থা হারিয়েছেন—এমন জনসমক্ষে স্বীকারোক্তি দেওয়ার ঘটনা বিরল।এই সংকটের কারণে সি চিন পিংয়ের অন্যতম বড় এক সাফল্য এখন হুমকির মুখে। তিনি চীনের সামরিক বাহিনীকে একটি শক্তিশালী শক্তিতে রূপান্তর করেছেন; যার ঝুলিতে রয়েছে নতুন বিমানবাহী রণতরি, হাইপারসনিক ক্ষেপণাস্ত্র ও বড় পারমাণবিক অস্ত্রভান্ডার। এ পরিস্থিতি (সংকট) এমন এক সময়ে তৈরি হয়েছে যখন যুক্তরাষ্ট্রের সঙ্গে চীনের প্রতিদ্বন্দ্বিতা চরম আকার ধারণ করেছে। একই সঙ্গে ভেনেজুয়েলা ও ইরানে নিজেদের সামরিক সক্ষমতা ও এর সীমাবদ্ধতা—দুটোই স্পষ্টভাবে প্রদর্শন করেছে ট্রাম্প প্রশাসন।
প্রেসিডেন্ট সির দাবি অনুযায়ী, সামরিক বাহিনীকে কলঙ্কমুক্ত ও শক্তিশালী করতে এ শুদ্ধি অভিযান প্রয়োজন। তবে এর ফলে চীনের যুদ্ধপ্রস্তুতি আগামী কয়েক বছরের জন্য ব্যাহত হতে পারে। একসময় যা শুধু দুর্নীতির বিরুদ্ধে সীমিত অভিযান মনে হয়েছিল, তা শেষ পর্যন্ত কয়েক ডজন শীর্ষস্থানীয় কর্মকর্তার গণপদচ্যুতির ঘটনায় রূপ নিয়েছে। এর চূড়ান্ত বহিঃপ্রকাশ ঘটে চলতি বছরের শুরুর দিকে চীনের শীর্ষ সামরিক কমান্ডার ঝাং ইউক্সিয়ার পতনের মধ্য দিয়ে। ঝাং ইউক্সিয়াকে সির অত্যন্ত ঘনিষ্ঠ ও বিশ্বস্ত বলে মনে করা হতো।
কিছু সূত্রের দাবি, সি যখন শুদ্ধি অভিযানের নেতৃত্ব দেওয়া জেনারেলকে ঝাংয়ের সমমর্যাদার কোনো পদে পদোন্নতি দিতে চেয়েছিলেন, তখনই তাঁদের সম্পর্কের চূড়ান্ত অবনতি ঘটে। জেনারেল ঝাং এতে আপত্তি জানান। এর কয়েক মাস পরই তিনি পদ হারান।
এই শুদ্ধি অভিযানের ভয়াবহতা গত সপ্তাহে আবারও স্পষ্ট হয়েছে। ঘুষ নেওয়ার অপরাধে দেশটির একটি সামরিক আদালত দুই সাবেক প্রতিরক্ষামন্ত্রীকে দুই বছরের স্থগিতাদেশসহ মৃত্যুদণ্ড দিয়েছেন। তাঁদের সম্ভবত বাকি জীবন কারাগারেই কাটাতে হবে।২০১২ সালে ক্ষমতায় আসার পর সি চিন পিং সেই কমান্ডারদের বিরুদ্ধে তদন্ত শুরু করেন, যাঁরা হু জিনতাওয়ের আমলে অঢেল সম্পদ ও ক্ষমতার মালিক হয়েছিলেন। এমনকি তাঁদের মধ্যে এমন ব্যক্তিরাও ছিলেন, যাঁদের সামাজিক মর্যাদার কারণে আগে ছোঁয়াও সম্ভব ছিল না।
২০১৪ সালে সি চীনের পূর্বাঞ্চলীয় শহর গুটিয়ানে শত শত জ্যেষ্ঠ সামরিক কর্মকর্তাকে তলব করেন। কমিউনিস্ট পার্টির ইতিহাস অনুযায়ী, ১৯২৯ সালে এই গুটিয়ানেই মাও সে–তুং সেই মৌলিক নীতি প্রতিষ্ঠা করেছিলেন, যা আজকের চীনকে সংজ্ঞায়িত করে—‘পার্টিই অস্ত্রের (সেনাবাহিনী) নিয়ন্ত্রণ করবে।’
সেই ঐতিহাসিক প্রেক্ষাপট ব্যবহার করে সি চিন পিং সতর্ক করেছিলেন যে সশস্ত্র বাহিনীর ওপর কমিউনিস্ট পার্টির নিয়ন্ত্রণ বিপজ্জনক পর্যায়ে হ্রাস পেয়েছে। গুটিয়ানে তিনি তাঁর উত্তরাধিকার সূত্রে পাওয়া সমস্যাগুলো তুলে ধরেন। তিনি বলেন, ‘পার্টির আদর্শের ওপর বিশ্বাস নষ্ট হয়ে গেছে। দুর্নীতি, স্বজনপ্রীতি ও অবাধ্যতা নির্লজ্জ রূপ নিয়েছে। এমনকি প্রশিক্ষণের নামে এমন ভুয়া মহড়া হতো যেখানে সেনারা বন্দুকের বদলে কোদাল ও লাঠি ব্যবহার করেছেন।’
ভেতরের পচন
সির কাছে দুর্নীতির এই পচনের বড় উদাহরণ ছিলেন জেনারেল শু সাইহৌ। তিনি সেন্ট্রাল মিলিটারি কমিশনের অবসরে যাওয়া ভাইস চেয়ারম্যান ছিলেন, যা তাঁকে পিপলস লিবারেশন আর্মির (পিএলএ) শীর্ষ নেতৃত্বের সারিতে বসিয়েছিল। জেনারেল শুর বিরুদ্ধে পদোন্নতির বিনিময়ে বিপুল পরিমাণ ঘুষ নেওয়াসহ দুর্নীতির নানা অভিযোগ ছিল।
গুটিয়ানে দেওয়া সি চিন পিংয়ের একটি বক্তৃতার অনুলিপি সেনাবাহিনীতে ছড়িয়ে পড়েছিল, যা আগে বিস্তারিত জানা যায়নি। সেখানে তিনি বলেছিলেন, ‘শু সাইহৌ সব সময় বড় গলায় পার্টির প্রতি তাঁর গভীর ভালোবাসা ও অবিচল আনুগত্যের কথা বলতেন। কিন্তু বাস্তবে অনেক আগেই পার্টির আদর্শ থেকে বিচ্যুত হয়ে দুর্নীতি ও নৈতিক স্খলনের অতলে তলিয়ে গিয়েছিলেন।’
দেশের বাইরের কিছু ঘটনাও সির মনে ভীতি জাগিয়েছিল। তিনি মধ্যপ্রাচ্য ও সাবেক সোভিয়েত ইউনিয়নের নেতাদের উদাহরণ টেনে কর্মকর্তাদের সতর্ক করেছিলেন। সেখানে গণ-অভ্যুত্থানের মুখে সেনাবাহিনী পাশ থেকে সরে দাঁড়ানোয় কীভাবে ক্ষমতা হারাতে হয়েছিল, সেই সতর্কবাণী তিনি শুনিয়েছিলেন।চিয়েন-ওয়েন কু, তাইওয়ানের ন্যাশনাল চেংচি বিশ্ববিদ্যালয়ের অধ্যাপক
সি যখন ক্ষমতায় বসেন, তখন থেকেই পিপলস লিবারেশন আর্মির প্রতি তাঁর একধরনের শ্রদ্ধা ছিল। তাঁর বাবা ছিলেন একজন বিপ্লবী নেতা, যিনি মাও সে–তুংয়ের অধীন লড়াই করেছেন। ক্যারিয়ারের শুরুতে সিও প্রতিরক্ষামন্ত্রীর সচিব হিসেবে কাজ করেছেন। তিনি বিশ্বাস করতেন, সেনাবাহিনীতে নিজের ও পার্টির প্রতি আনুগত্য ফিরিয়ে আনতে হলে ‘রাজনৈতিক কাজ’ পুনরুজ্জীবিত করতে হবে। অর্থাৎ কর্মকর্তাদের মগজধোলাই, কড়া নজরদারি ও যাচাই-বাছাইয়ের মাধ্যমেই তাঁদের বিশ্বাসযোগ্য করে তুলতে হবে।
গুটিয়ানে তাঁর কাঙ্ক্ষিত নতুন শৃঙ্খলার বার্তা পৌঁছে দিতে সি চিন পিং সাধারণ মোটা চালের ভাত ও মিষ্টিকুমড়ার স্যুপ খেয়েছিলেন। আদিকালের রেড আর্মির সদস্যদের স্মৃতিবিজড়িত সাধারণ এই খাবারের মাধ্যমে তিনি ত্যাগের মহিমা তুলে ধরেন।
সি চিন পিং বলেন, ‘পার্টির প্রতি পূর্ণ আনুগত্যের মূলভিত্তি দাঁড়িয়ে আছে “পূর্ণ” শব্দটির ওপর। এ আনুগত্য হবে অটুট, সর্বজনীন, শর্তহীন ও সব ধরনের খাদ ও ভণ্ডামিমুক্ত।
উল্লেখ্য, এমন সাজার অর্থ হলো, আদালত আসামিকে মৃত্যুদণ্ড দিয়েছেন ঠিকই, কিন্তু তা এখনই কার্যকর করা হবে না। আগামী দুই বছর তাঁদের পর্যবেক্ষণে রাখা হবে। এ সময়ের মধ্যে যদি আসামি কোনো নতুন অপরাধ না করেন ও কারাগারে ভালো আচরণ দেখান, তবে তাঁর মৃত্যুদণ্ড পরিবর্তন করে যাবজ্জীবন কারাদণ্ডে রূপান্তর করা হবে।
চীনের রাজনীতি ও সামরিক বাহিনী নিয়ে গবেষণা করেন ইয়েল ইউনিভার্সিটির সহযোগী অধ্যাপক ড্যানিয়েল ম্যাটিংলি। তিনি বলেন, ‘এটি সি চিন পিংয়ের নিজস্ব সেনাবাহিনী। তাহলে তিনি নিজে যা গড়ে তুলেছেন, তা কেন নিজেই ভাঙছেন?’ তিনি আরও বলেন, ‘এমনকি পাঁচ বছর আগেও মানুষ সি চিন পিংয়ের কাছ থেকে এমনটা আশা করেনি। বড় ধরনের কোনো পরিবর্তন ঘটে গেছে।’সি যে দুর্নীতির বিরুদ্ধে অভিযান চালাচ্ছেন, তা বাস্তব। তবে আগে বিস্তারিতভাবে প্রকাশিত হয়নি এমন কিছু রুদ্ধদ্বার বক্তৃতায় অন্য একটি কারণ ফুটে উঠেছে। সি তাঁর শাসনের বিরুদ্ধে যেকোনো ধরনের অবাধ্যতাকে রাজনৈতিক হুমকি হিসেবে দেখেন। বিশ্লেষকদের মতে, সির ধারণা হয়েছে যে সামরিক বাহিনীকে আধুনিকায়নের জন্য তিনি যাঁদের বেছে নিয়েছিলেন, তাঁরা আর বিশ্বস্ত নেই। দুর্নীতি আর স্বজনপ্রীতির কারণে তাঁদের আনুগত্য ও কার্যকারিতা নষ্ট হয়ে গেছে।
বিশ্লেষকদের মতে, এ অস্থিরতা সির দুটি গুরুত্বপূর্ণ লক্ষ্যের মধ্যে দ্বন্দ্ব তৈরি করেছে। এর একটি হলো যুদ্ধের প্রস্তুতি নেওয়া এবং অন্যটি হলো প্রশ্নাতীত আনুগত্য নিশ্চিত করা। শেষ পর্যন্ত তিনি যুদ্ধক্ষেত্রে অভিজ্ঞ এক জেনারেলকে সরিয়ে দিয়েছেন, যিনি সামরিক বাহিনীকে নতুনভাবে গড়ে তুলতে সাহায্য করেছিলেন। তাঁর জায়গায় এমন একজনকে স্থলাভিষিক্ত করেছেন, যিনি মূলত তদন্তকারী বা বিচারকের ভূমিকা পালন করেন। বর্তমানে সির পাশাপাশি তিনিই চীনের সর্বোচ্চ সামরিক কাউন্সিলের একমাত্র সদস্য হিসেবে টিকে আছেন।
অধ্যাপক চিয়েন–ওয়েন কু বলেন, ‘সি চিন পিংয়ের শাসনকাল ধীরে ধীরে শেষ পর্যায়ে প্রবেশ করছে। এ পর্যায়ে তাঁর রাজনৈতিক হিসাব-নিকাশ বদলে যাচ্ছে এবং তিনি নিজের ঘনিষ্ঠ বৃত্তের সদস্যদের নিয়ে ক্রমশ বেশি উদ্বিগ্ন হয়ে পড়ছেন।’
তাইওয়ানের ন্যাশনাল চেংচি বিশ্ববিদ্যালয়ের অধ্যাপক চিয়েন-ওয়েন কু বলেন, ‘সি চিন পিং যখন “ডিভাইডেড হার্ট” (দ্বিধাবিভক্ত মন/বিভক্ত আনুগত্য) শব্দটি ব্যবহার করেন, তখন এর গভীর অর্থ থাকে।’
প্রাচীন চীনের বিভিন্ন নীতিশাস্ত্রে রাজাদের সতর্ক করা হয়েছিল যেন তাঁরা বিশ্বাসঘাতক জেনারেলদের থেকে সাবধানে থাকেন। এমন একটি বই সি চিন পিংয়ের ব্যক্তিগত সংগ্রহেও রয়েছে।
অধ্যাপক চিয়েন–ওয়েন আরও বলেন, ‘যখন তাঁর (সি চিন পিং) সবচেয়ে বিশ্বস্ত ও গুরুত্বপূর্ণ ঘনিষ্ঠ লোকেরাই পদচ্যুত হন, তখন প্রশ্ন জাগে—আর কে তাঁর আস্থা অর্জন করতে পারবেন?’অস্ত্রের ওপর নিয়ন্ত্রণ প্রতিষ্ঠা
ক্ষমতার শুরুর দিকে সি চিন পিং তাঁর পূর্বসূরি হু জিনতাওয়ের পরিণতি এড়াতে দৃঢ়প্রতিজ্ঞ ছিলেন। হু জিনতাও চীনের সামরিক কমান্ডারদের ওপর নিজের কর্তৃত্ব প্রতিষ্ঠা করতে ব্যর্থ হয়েছিলেন বলে ব্যাপকভাবে মনে করা হয়।
২০১১ সালে তৎকালীন মার্কিন প্রতিরক্ষামন্ত্রী রবার্ট গেটসের বেইজিং সফরের সময় হু জিনতাওয়ের এ দুর্বলতা প্রকাশ পেয়েছিল। সে সময় চীনের ওয়েবসাইটগুলোতে একটি স্টিলথ ফাইটার জেটের পরীক্ষামূলক উড্ডয়নের খবর আসে। গেটস এ বিষয়ে জিনতাওকে প্রশ্ন করলে দেখা যায়, তিনি এ সম্পর্কে কিছুই জানেন না। পরে গেটস সাংবাদিকদের বলেছিলেন, ‘ওই পরীক্ষা নিয়ে বেসামরিক নেতৃত্ব অবাক হয়েছে বলে মনে হয়েছে।’
সাবেক সিআইএ বিশ্লেষক ও বর্তমানে ব্রুকিংস ইনস্টিটিউশনের সদস্য জন কালভার বলেন, সেনাকমান্ডারদের কাছে হু জিনতাওয়ের নির্দেশনা ছিল অনেকটা ‘পরামর্শের’ মতো—যা তাঁরা বিবেচনা করে দেখতেন। তিনি বলেন, ‘মূলত সেই ব্যবস্থাটি (চীনের সামগ্রিক সামরিক শাসনব্যবস্থা বা কাঠামো) আর কমিউনিস্ট পার্টির নিয়ন্ত্রণে ছিল না।’
