মুক্তদেশ ডেস্ক: যুদ্ধবিরতির কারণে স্থলভাগে হামলা বন্ধ থাকলেও অস্থিরতা বেড়েছে জ্বালানি সরবরাহের গুরুত্বপূর্ণ জলপথ হরমুজ প্রণালিতে। গতকাল বৃহস্পতিবার এর ব্যাপ্তি ছড়ায় ভারত মহাসাগরেও। ইরানের তেলবাহী একটি জাহাজ জব্দের পাশাপাশি তিনটিকে সেখান থেকে ফিরিয়ে দিয়েছে মার্কিন নৌবাহিনী।
মধ্যপ্রাচ্যসহ দক্ষিণ এশিয়ায় যুক্তরাষ্ট্রের সামরিক কার্যক্রম পরিচালনার কমান্ড ‘সেন্টকম’ জানিয়েছে, নৌ অবরোধের অংশ হিসেবে তারা এ পর্যন্ত ৩১টি জাহাজের গতিপথ ঘুরিয়ে দিয়েছে বা মূল বন্দরে ফিরে যেতে বলেছে। এদিকে সাগরে জাহাজ অবরোধের এমন ঘটনায় গতকাল বৃহস্পতিবার অপরিশোধিত তেলের দাম সাময়িকভাবে ৪ শতাংশ বাড়ে। আন্তর্জাতিক মানদণ্ড ব্রেন্ট নর্থ সি ক্রুড বিক্রি হয় প্রতি ব্যারেল ১০৫ ডলারে। সাংহাই, হংকং, টোকিওসহ এশিয়ার বিভিন্ন শেয়ারবাজারও ছিল নিম্মমুখী।তেলবাহী জাহাজ ঘিরে এই উত্তেজনা কবে
প্রশমন হবে, গতকাল রাত ৯টা পর্যন্ত তার কোনো ইঙ্গিত পাওয়া যায়নি। ইরানের পক্ষ থেকে বলা হয়েছে, নৌ অবরোধ যতদিন চলবে, ততদিন তারা আলোচনায় বসবে না, হরমুজও খুলে দেবে না। প্রণালিটিতে জাহাজ চলাচলে বড় শঙ্কার জায়গা হলো ইরানের স্থাপন করা মাইন। গতকাল মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প বলেন, মাইন বসাতে দেখলেই সরাসরি গুলি করতে তিনি নৌবাহিনীকে নির্দেশ দিয়েছেন।
দুপক্ষের এই পাল্টাপাল্টি হুমকি ও পদক্ষেপে চলমান উত্তেজনা ‘গানবোট’ কূটনীতির দিকে গড়িয়েছে বলে লিখেছে ব্রিটিশ গণমাধ্যম দ্য গার্ডিয়ান। গতকাল প্রকাশিত এক বিশ্লেষণে বলা হয়েছে, হরমুজ প্রণালিতে দুই পক্ষই নিজেদের জারি করা অবরোধ কার্যকরে মরিয়া হয়ে উঠেছে। নৌ শক্তিকে ব্যবহার করে নিজেদের স্বার্থ উদ্ধারের চেষ্টা চলাচ্ছে। এ অবস্থা চলতে থাকলে সংকট আরও দীর্ঘস্থায়ী হবে। অপরদিকে আলজাজিরাকে রোম বিশ্ববিদ্যালয়ের আন্তর্জাতিক সম্পর্ক বিভাগের সহকারী অধ্যাপক আন্দ্রেয়া দেসি বলেছেন, সংকট নিরসনে উভয় পক্ষের ওপর দ্রুত আন্তর্জাতিক চাপ বাড়ানো এখন সময়ের দাবি।ভারত মহাসাগরেও অবরোধ
গত বুধবার হরমুজ প্রণালিতে তিনটি জাহাজে গুলি করে দুটিকে জব্দ করে ইরান। এর প্রতিক্রিয়ায় গতকাল ভারত মহাসাগরে পতাকাবিহীন ও মার্কিন নিষেধাজ্ঞার আওতাভুক্ত ‘এমটি ম্যাজেস্টিক এক্স’ নামের জাহাজ জব্দ করে নৌবাহিনী। এতে ইরান থেকে তেল পরিবহন করা হচ্ছিল বলে জানিয়েছে পেন্টাগন। গত মঙ্গলবারও মার্কিন নৌবাহিনী ভারত মহাসাগরে পতাকাবিহীন ‘এমটি তিফানি’ নামের জাহাজ আটক করেছিল।
জাহাজ চলাচল ও নিরাপত্তা সূত্রের বরাত দিয়ে রয়টার্স জানিয়েছে, মার্কিন সামরিক বাহিনী বৃহস্পতিবার এশিয়ার জলসীমায় অন্তত তিনটি ইরানি পতাকাবাহী ট্যাঙ্কার আটকে দেয়। পরে সেগুলোর গতিপথ পরিবর্তন করতে বাধ্য করে। জাহাজগুলো ভারত, মালয়েশিয়া ও শ্রীলঙ্কার কাছাকাছি অবস্থানে ছিল।
পেন্টাগনের প্রকাশিত একটি বিবৃতির বরাত দিয়ে গতকাল এএফপি জানায়, যুক্তরাষ্ট্র বিশ্বজুড়েই সামুদ্রিক অভিযান অব্যাহত রাখার ঘোষণা দিয়েছে। ইরানকে সহায়তাকারী জাহাজের নেটওয়ার্ক ভেঙে দেওয়া এবং যেখানেই চলুক না কেন সেগুলো আটক করাই অভিযানের লক্ষ্য। সামাজিক মাধ্যমে পোস্ট করা পেন্টাগনের বিবৃতির সঙ্গে একটি ভিডিও যুক্ত করা হয়। এতে দেখা যায়, সামরিক সদস্যরা হেলিকপ্টার থেকে দড়ি বেয়ে নিচে নামছেন। ঘটনাস্থল উল্লেখ না করলেও পোস্টে লেখা হয়েছে, ইন্দো-প্যাসিফিক কমান্ডের আওতাধীন এলাকায় এই অভিযান চালানো হয়েছে। এই কমান্ড প্রশান্ত ও ভারত মহাসাগর মিলিয়ে বিস্তৃত একটি অঞ্চলে তদারকি করে।
‘গানবোট’ কূটনীতি
দ্য গার্ডিয়ান লিখেছে, হরমুজ প্রণালি দিয়ে চলাচলকারী বাণিজ্যিক জাহাজে গুলি ও জব্দ করে ইরান বিশ্ব অর্থনীতির ওপর তাদের প্রভাব প্রতিষ্ঠার বার্তা দিচ্ছে। অন্যদিকে যুক্তরাষ্ট্র অবরোধ, নিষেধাজ্ঞা ও অভিযানের মাধ্যমে ইরানের অর্থনীতি ভেঙে দিতে চাইছে।
মার্কিন অর্থমন্ত্রী স্কট বেসেন্ট বলেছেন, আগামী কয়েকদিনের মধ্যে খার্গ দ্বীপে তেল মজুতের কেন্দ্র পূর্ণ হয়ে যাবে। তখন ইরান তেল উৎপাদন বন্ধ করতে বাধ্য হবে। সামুদ্রিক বাণিজ্য বাধাগ্রস্ত করার মধ্য দিয়ে দেশটির সরকারের প্রধান আয়ের উৎসে যুক্তরাষ্ট্র সরাসরি আঘাত করছে।
‘রিয়েল ক্লিয়ার ডিফেন্স’ নামের ওয়েবসাইটে অবসরপ্রাপ্ত নৌ কর্মকর্তা ল্যান্স বি গর্ডন লিখেছেন, মজুতের জায়গা না থাকায় ইরান যদি উৎপাদন বন্ধ করতে বাধ্য হয়, তাহলে দীর্ঘ মেয়াদে ক্ষতি হবে। যেমন– তেল ক্ষেত্রের শিলাস্তরের ছিদ্র বন্ধ বা সুরু হওয়া, পানি জমা ইত্যাদি। এসব কারণে ভবিষ্যতে উৎপাদন ও আয় স্থায়ীভাবে কমে যেতে পারে।
এদিকে ইরানও প্রণালি বন্ধ রাখার মাধ্যমে যুক্তরাষ্ট্র ও মিত্রদের ওপর চাপ তৈরি করছে। জেট ফুয়েলের উচ্চ মূল্যের কারণে জার্মানির বৃহত্তম উড়োজাহাজ পরিচালনাকারী সংস্থা লুফথানসার ২০ হাজার ফ্লাইট বাতিল হয়েছে। সংযুক্ত আরব আমিরাতের ফুজাইরাহ বন্দরে তেলের মজুত কমছে। তামা ও কনডমের দামও বাড়ছে। ইউরোপীয় দেশগুলো জ্বালানি মূল্যস্ফীতি সামলাতে বাড়তি খরচ করতে বাধ্য হচ্ছে। এমনকি এর প্রভাব কাজে লাগিয়ে ট্রাম্পের বিরোধী দল ডেমোক্রেটিক পার্টিও নভেম্বরের মধ্যবর্তী নির্বাচনে বড় জয়ের স্বপ্ন দেখছে।
ইরান ইঙ্গিত দিচ্ছে, হরমুজ ছাড়াও তাদের হাতে তুরুপের তাস আছে। আইআরজিসি-সংশ্লিষ্ট তাসনিম নিউজ এজেন্সি সম্প্রতি সাগরে থাকা ইন্টারনেট কেবল বিচ্ছিন্নের সম্ভাবনা নিয়ে প্রতিবেদন প্রকাশ করেছে। এই সংযোগ বিচ্ছিন্ন করা হলে মধ্যপ্রাচ্যের ইন্টারনেট বিঘ্নিত ও ডিজিটাল অর্থনীতিতে ধস নামতে পারে।
