মুক্তদেশ ডেস্ক: চট্টগ্রামের জঙ্গল সলিমপুরে আইন-শৃঙ্খলা রক্ষা বাহিনীর তিন হাজারের বেশি সদস্য কয়েকটি দলে বিভক্ত হয়ে অভিযান চালিয়েছেন। অভিযানের পর পুলিশ জানিয়েছে, দীর্ঘদিন ধরে গড়ে ওঠা সন্ত্রাসীচক্রের নিয়ন্ত্রণ ভেঙে দিয়ে এলাকায় আইন-শৃঙ্খলা রক্ষা বাহিনীর পূর্ণ অধিকার ও আধিপত্য প্রতিষ্ঠা করা হয়েছে।
অভিযান কার্যকর ও নিরাপদভাবে পরিচালনার লক্ষ্যে তিনটি হেলিকপ্টার, ১৫টি এপিসি, র্যাব ও সিএমপির তিনটি ডগ স্কোয়াড এবং ১২টি ড্রোন ব্যবহার করা হয়। আধুনিক প্রযুক্তি ও কৌশল ব্যবহার করে এই দুর্গম পাহাড়ি এলাকায় অভিযান পরিচালনা করা হয়।
অভিযান বাধাগ্রস্ত করতে জঙ্গল সলিমপুরের সড়কে বড় ট্রাক রেখে এবং একটি খালের ওপরের কালভার্ট ভেঙে প্রতিবন্ধকতা সৃষ্টির চেষ্টা করে সন্ত্রাসীরা। গতকাল সোমবার ভোর ৬টা থেকে শুরু হওয়া এই অভিযান বিকেল ৪টা পর্যন্ত চলে। সব বাধা উপেক্ষা করে অভিযান চালিয়ে ১৫ জনকে আটক করা হয়েছে। যদিও র্যাব সদস্য হত্যা মামলার আসামি জঙ্গল সলিমপুরের ইয়াসিনসহ তালিকাভুক্ত সন্ত্রাসীদের গ্রেপ্তার করা যায়নি, তবে অভিযানকালে বিপুল পরিমাণ অস্ত্র উদ্ধার করা হয়েছে বলে জানা যায়।
এলাকাটির নিয়ন্ত্রণ বজায় রাখতে সেখানে পুলিশ ও র্যাবের দুটি ক্যাম্প স্থাপন করা হবে বলে সংশ্লিষ্ট ব্যক্তিরা জানিয়েছেন।
আইন-শৃঙ্খলা রক্ষা বাহিনী ও স্থানীয় সূত্রে জানা গেছে, সকাল ৬টা থেকে শুরু হওয়া অভিযানে সেনাবাহিনী, বিজিবি, পুলিশ ও র্যাবের প্রায় তিন হাজার সদস্য অংশ নেন। অভিযানের শুরুতেই জঙ্গল সলিমপুরের চারপাশ ঘিরে ফেলে আইন-শৃঙ্খলা রক্ষা বাহিনী। প্রবেশ ও বের হওয়ার পথগুলোতে বসানো হয় তল্লাশি চৌকি।
যৌথ বাহিনীর সদস্যরা কয়েকটি দলে বিভক্ত হয়ে অভিযান পরিচালনা করেন।
অভিযানে যাওয়ার সময় যৌথ বাহিনীর সদস্যদের বিভিন্ন প্রতিবন্ধকতার মুখে পড়তে হয়। জঙ্গল সলিমপুরের ভেতরের সড়কে বড় ট্রাক রেখে দেওয়া হয়েছিল। আবার কোথাও কালভার্ট ভেঙে ফেলা হয়েছে। একটি স্থানে নালার স্ল্যাবও তুলে ফেলা হয়েছিল।
ধারণা করা হচ্ছে, অভিযানের খবর আগেই পেয়ে সন্ত্রাসীদের একটি অংশ এসব প্রতিবন্ধকতা তৈরি করে। এ বিষয়ে চট্টগ্রাম রেঞ্জের অতিরিক্ত ডিআইজি নাজমুল হাসান সাংবাদিকদের বলেন, ছিন্নমূল এলাকা পেরিয়ে আলীনগরে ঢোকার আগে সড়কে একটি ট্রাক দিয়ে ব্যারিকেড দেওয়া হয়। এর কিছুদূর পর একটি কালভার্ট ভেঙে ফেলা হয়েছিল। পরে ওই অংশ ইট-বালু দিয়ে ভরাট করে যৌথ বাহিনীর গাড়ি আলীনগরে প্রবেশ করে অভিযান চালায়। অভিযান শুরুর আগে এসব ঘটনা কিভাবে ঘটল—এমন প্রশ্নের জবাবে নাজমুল হাসান বলেন, জঙ্গল সলিমপুর এলাকা যারা নিয়ন্ত্রণ করে, তাদের সিএনজি অটোরিকশাচালক থেকে শুরু করে বিভিন্ন ধরনের সোর্স রয়েছে। কোনোভাবে হয়তো তারা অভিযানের খবর জেনে গেছে।
সিসি ক্যামেরা বসিয়ে পর্যবেক্ষণ : আইন-শৃঙ্খলা রক্ষা বাহিনীর সদস্যদের নজরদারিসহ পুরো জঙ্গল সলিমপুর নিয়ন্ত্রণে রাখতে বিভিন্ন স্থানে সিসিটিভি ক্যামেরা বসানো হয়েছিল। এসব ক্যামেরা একটি কন্ট্রোলরুম থেকে পরিচালিত হতো, যার নিয়ন্ত্রণ ছিল সন্ত্রাসীদের হাতে। অভিযানের এক পর্যায়ে আইন-শৃঙ্খলা রক্ষা বাহিনীর সদস্যরা এসব সিসিটিভি ক্যামেরা ভেঙে দেন। এ বিষয়ে র্যাবের অধিনায়ক লেফটেন্যান্ট কর্নেল মো. হাফিজুর রহমান সাংবাদিকদের বলেন, সিসিটিভি ক্যামেরার মাধ্যমে দুই-তিনটি মনিটরিং রুম থেকে পুরো এলাকা নিয়ন্ত্রণ করা হতো। এসব ক্যামেরা ব্যবহার করে আইন-শৃঙ্খলা রক্ষা বাহিনী কখন এলাকায় প্রবেশ করছে, তা আগেই জানতে পারত তারা।
ডিআইজি যা বললেন : চট্টগ্রাম রেঞ্জের ডিআইজি (অতিরিক্ত আইজিপি) মো. আহসান হাবীব পলাশ সাংবাদিকদের বলেন, জঙ্গল সলিমপুরে সরকারকে পাশ কাটিয়ে একটি চক্র জমির কাগজ তৈরি ও জমি হস্তান্তরের কার্যক্রম পরিচালনা করত। সেখানে সাধারণ মানুষ সহজে প্রবেশ করতে পারত না। এমনকি আইন-শৃঙ্খলা রক্ষা বাহিনীর সদস্যরাও প্রবেশ করতে ভয় পেতেন। তিনি বলেন, ‘এবার পঞ্চমবারের মতো সেখানে অভিযান চালানো হয়েছে। আগের চারবার আমরা ব্যর্থ হয়েছিলাম। এবার সেনাবাহিনী, বিজিবি, র্যাব, পুলিশ, জেলা প্রশাসনসহ সবাই মিলে একটি সফল যৌথ অভিযান পরিচালনা করেছি। এই অভিযানের মাধ্যমে ওই এলাকায় আমাদের পূর্ণ অধিকার প্রতিষ্ঠিত হয়েছে।’ তিনি আরো বলেন, ‘অভিযানের মূল লক্ষ্য ছিল জঙ্গল সলিমপুরের জায়গার ওপর রাষ্ট্রের কর্তৃত্ব প্রতিষ্ঠা করা। আমরা সেটি করতে সক্ষম হয়েছি। এখন জায়গাটির ওপর নিয়ন্ত্রণ প্রতিষ্ঠিত হওয়ায় পরবর্তী সময়ে আরো অস্ত্র উদ্ধার করা সম্ভব হবে।’ ডিআইজি জানান, এখন পর্যন্ত ১৫ জনকে আটক করা হয়েছে। শীর্ষ সন্ত্রাসী ও দখলদারদের গ্রেপ্তারের বিষয়ে তিনি বলেন, কিছু সন্ত্রাসীকে পাওয়া যায়নি এটি ঠিক। এলাকা অনেক বড়। অভিযানে অস্ত্র উদ্ধার করা হয়েছে, তবে কী পরিমাণ অস্ত্র উদ্ধার হয়েছে তা পরে জানানো হবে। তিনি আরো বলেন, জঙ্গল সলিমপুরে বাংলাদেশ পুলিশের একটি ক্যাম্প এবং র্যাপিড অ্যাকশন ব্যাটালিয়নের (র্যাব) একটি ক্যাম্প চালু থাকবে। সোমবার থেকেই এসব ক্যাম্প কার্যকর করা হবে, যাতে ভবিষ্যতেও এখানে নিয়মিত কার্যক্রম পরিচালনা করা যায়। জঙ্গল সলিমপুরে যাতায়াতের ব্যবস্থা সহজ করতে সরকারি উন্নয়ন কার্যক্রম দ্রুত শুরু করার জন্য বিভাগীয় কমিশনারকে উদ্যোগ নেওয়ার অনুরোধ জানান তিনি। এ ছাড়া এলাকায় সরকারের পরিকল্পিত উন্নয়ন প্রকল্পগুলো দ্রুত বাস্তবায়নের ওপরও গুরুত্ব দেন তিনি।
বিভাগীয় কমিশনার যা বললেন : জঙ্গল সলিমপুরে প্রবেশমুখে অভিযান পরিদর্শনকালে চট্টগ্রামের বিভাগীয় কমিশনার ড. মো. জিয়াউদ্দীন বলেন, ‘সরকারের পরিকল্পনা বাস্তবায়নে যে প্রতিবন্ধকতা ছিল, তা থেকে আমরা আজ মুক্ত হলাম। চট্টগ্রামের উন্নয়নের জন্য যে প্রকল্পগুলো বাস্তবায়নের পরিকল্পনা রয়েছে, সেগুলোর পথ এখন উন্মুক্ত হয়েছে। এই এলাকায় সরকারের কর্তৃত্ব প্রতিষ্ঠায় যে সমস্যা ছিল তা দূর হয়েছে। এখন পরিকল্পনাগুলো বাস্তবায়নের জন্য কাজ করা হবে।’
অভিযান শেষে র্যাবের অধিনায়ক লেফটেন্যান্ট কর্নেল মো. হাফিজুর রহমান সাংবাদিকদের বলেন, একটি সফল অভিযান শেষ হয়েছে। অভিযান চলমান থাকবে। তাদের অবৈধ ও সন্ত্রাসী রাজত্ব অচিরেই ধ্বংস হয়ে যাবে।
গতকাল সন্ধ্যা সাড়ে ৫টার দিকে চট্টগ্রাম জেলা পুলিশের অতিরিক্ত পুলিশ সুপার (গণমাধ্যম) মো. রাসেল কালের কণ্ঠকে বলেন, ‘আজকের মতো অভিযান শেষ হয়েছে। অভিযানের বিস্তারিত তথ্য পরে জানানো হবে।’
জানা যায়, অভিযানে একটি পিস্তল, একটি এলজি, চারটি কার্তুজ, ১১টি ককটেল, ১৭টি দেশি অস্ত্র, ১৯টি সিসিটিভি ক্যামেরা, দুটি ডিভিআর, একটি পাওয়ার বক্স এবং দুটি বায়নোকুলার উদ্ধার করা হয়েছে।
জঙ্গল সলিমপুর যারা নিয়ন্ত্রণ করত : স্থানীয় সূত্রে জানা গেছে, জঙ্গল সলিমপুরে সন্ত্রাসীদের দুটি পক্ষ সক্রিয়। একটি পক্ষের নেতৃত্বে রয়েছে মোহাম্মদ ইয়াসিন এবং অন্যটির নেতৃত্বে রোকন উদ্দিন। ইয়াসিন গত জানুয়ারিতে ওই এলাকায় অভিযানে যাওয়া এক র্যাব কর্মকর্তাকে হত্যা মামলার প্রধান আসামি। জঙ্গল সলিমপুরের আলীনগর এলাকায় তাঁর একচ্ছত্র নিয়ন্ত্রণ ছিল।
চট্টগ্রাম নগরের লিংক রোডের উত্তর পাশে প্রায় তিন হাজার ১০০ একর জায়গাজুড়ে জঙ্গল সলিমপুরের অবস্থান। দুর্গম পাহাড়ি এলাকা হওয়ায় এটি সন্ত্রাসীদের নিরাপদ আস্তানায় পরিণত হয়। চার দশক ধরে সরকারি পাহাড় কেটে সেখানে কয়েক হাজার অবৈধ বসতি গড়ে উঠেছে। পাহাড় কেটে চলে প্লট বাণিজ্য। এই বাণিজ্য ও দখল টিকিয়ে রাখতে এলাকায় গড়ে তোলা হয় সন্ত্রাসী বাহিনী।
