মুক্তদেশ ডেস্ক:রাজবাড়ীর পদ্মা নদীতে রাতভর মাছ ধরেন মাঝি রিপন মৃধা। ভোরে ঘাটে ফিরে বাজারের দেয়ালজুড়ে চোখ বোলাতে গিয়ে তিনি লক্ষ্য করেন—একসময় যেসব জায়গায় স্থানীয় আওয়ামী লীগ নেতাদের পোস্টার–ব্যানার টাঙানো থাকত, সেসব এখন ফাঁকা।
কয়েক মাস আগেও এখানে দলটির দাপুটে উপস্থিতি ছিল। কিন্তু ২০২৪ সালের গণ–অভ্যুত্থানের পর ক্ষমতাচ্যুত হওয়ার সঙ্গে সঙ্গে আওয়ামী লীগের রাজনৈতিক কর্মকাণ্ড নিষিদ্ধ ঘোষণা করা হয়। দলটির সভাপতি ও সাবেক প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা দেশ ছাড়েন এবং বর্তমানে ভারতে অবস্থান করছেন বলে জানা যায়।
অভ্যুত্থানের সময় সহিংসতায় বহু মানুষের প্রাণহানির ঘটনায় তাঁর ভূমিকা নিয়ে দেশে একটি বিশেষ ট্রাইব্যুনালে বিচার চলছে বলে অন্তর্বর্তী সরকার জানিয়েছে। এসব ঘটনাই দলটির ভবিষ্যৎ নিয়ে নতুন করে প্রশ্ন তুলেছে।
আগামী ১২ ফেব্রুয়ারি জাতীয় সংসদ নির্বাচন। কিন্তু আজীবন নৌকায় ভোট দেওয়া রিপন মৃধা এবার দ্বিধায়। তিনি বলেন,
“নৌকা না থাকলে কাকে ভোট দেব, বুঝতে পারছি না। তবু ভোট না দিলে আবার সমস্যা হতে পারে—এই ভয়ও আছে।”
তিনি জানান, এলাকায় আওয়ামী লীগ–সমর্থক হিসেবে পরিচিত অনেক পরিবার এখন আতঙ্কে আছে। কেউ প্রকাশ্যে দলীয় পরিচয় দিচ্ছেন না।
মাঠে নেই দল, ছড়িয়ে পড়ছে সমর্থকেরা
গোপালগঞ্জের রিকশাচালক সোলায়মান মিয়ার কথায়, “নৌকা ছাড়া নির্বাচন আমার কাছে নির্বাচন না।” তিনি ও তাঁর পরিবারের সদস্যরা ভোট না দেওয়ার সিদ্ধান্ত নিয়েছেন।
ঢাকার গুলিস্তানে আওয়ামী লীগের কেন্দ্রীয় কার্যালয়ও এখন পরিত্যক্ত। বিক্ষোভের সময় ভবনটিতে ভাঙচুর ও অগ্নিসংযোগের পর সেখানে এখন গৃহহীনদের আশ্রয়। আশপাশের হকাররা বলছেন, এলাকায় এখন প্রকাশ্যে আওয়ামী লীগের সমর্থক খুঁজে পাওয়া কঠিন।
তবে দলটির কিছু সাবেক কর্মী এখনো আশাবাদী। ছাত্রলীগের সাবেক নেতা আরমান বলেন,
“আওয়ামী লীগ কৌশলগতভাবে নীরব থাকতে পারে, কিন্তু বাংলাদেশের রাজনীতি থেকে হারিয়ে যাবে—এটা বিশ্বাস করি না।”
বিশ্লেষকদের ভিন্নমত
রাজনৈতিক বিশ্লেষক রেজাউল করিম রনি মনে করেন, দল ছাড়া নির্বাচন হয়ে গেলে আওয়ামী লীগের ভোটব্যাংক ভেঙে স্থানীয়ভাবে অন্য শক্তির সঙ্গে মিশে যেতে পারে।
“একবার সমর্থকেরা অন্য দলে মানিয়ে গেলে তাদের ফেরানো কঠিন,” বলেন তিনি।
অন্যদিকে জাহাঙ্গীরনগর বিশ্ববিদ্যালয়ের সাবেক অধ্যাপক আনু মুহাম্মদ মনে করেন, আওয়ামী লীগের সামাজিক ও সাংস্কৃতিক শিকড় গভীর। ফলে সংগঠন হিসেবে দুর্বল হলেও রাজনৈতিক সত্তা হিসেবে পুরোপুরি মুছে যাওয়া সহজ নয়।
মার্কিন গবেষণা সংস্থা আইআরআই–এর এক জরিপ অনুযায়ী, দলটির এখনো প্রায় ১১ শতাংশ জনসমর্থন রয়েছে বলে উল্লেখ করা হয়েছে। যদিও নির্বাচনী মাঠে তাদের দৃশ্যমান উপস্থিতি নেই।
প্রবাস থেকে সক্রিয় নেতৃত্ব
দলটির শীর্ষ নেতাদের অনেকে বিদেশে অবস্থান করছেন। নয়াদিল্লিতে এক অনুষ্ঠানে দেওয়া শেখ হাসিনার সাম্প্রতিক বক্তব্য বাংলাদেশের অন্তর্বর্তী সরকারের সমালোচনার মুখে পড়ে। সরকার বলেছে, এ ধরনের রাজনৈতিক কার্যক্রমে বিদেশি মঞ্চ ব্যবহারে তারা বিস্মিত।
আটলান্টিক কাউন্সিলের দক্ষিণ এশিয়া–বিষয়ক বিশ্লেষক মাইকেল কুগেলম্যানের মতে,
“দক্ষিণ এশিয়ার বড় দলগুলো সহজে বিলুপ্ত হয় না। এখন আওয়ামী লীগ কঠিন সময় পার করছে, কিন্তু ভবিষ্যতে প্রত্যাবর্তনের সম্ভাবনা একেবারে উড়িয়ে দেওয়া যায় না।”
তিনি বিএনপির অতীত দুর্দশার উদাহরণ টেনে বলেন, রাজনৈতিক সমীকরণ দ্রুত বদলাতে পারে।
তৃণমূলে অনিশ্চয়তা
তবে রাজবাড়ীর মাঝি রিপন মৃধার মতো তৃণমূল সমর্থকদের কাছে ভবিষ্যতের এই সম্ভাবনা খুব দূরের কথা।
তিনি বলেন, “বঙ্গবন্ধু হত্যার পরও আওয়ামী লীগ টিকে ছিল—এ কথা বাবার কাছে শুনেছি। কিন্তু এবার মনে হচ্ছে দলটা রাজনীতিতে প্রায় নিশ্চিহ্ন হয়ে যাচ্ছে।”
আওয়ামী লীগের ভবিষ্যৎ কোন পথে যাবে—তা নির্ভর করছে সময়, নেতৃত্বের কৌশল এবং নির্বাচনের পর দেশের রাজনৈতিক বাস্তবতার ওপর। তবে আপাতত দলটি বাংলাদেশের রাজনীতিতে এক গভীর অনিশ্চয়তার মধ্যেই রয়েছে। (আল–জাজিরার প্রতিবেদন অবলম্বনে)
