মুক্তদেশ ডেস্ক: মানবতাবিরোধী অপরাধে মৃত্যুদণ্ডপ্রাপ্ত শেখ হাসিনাকে যেকোনো মূল্যে ক্ষমতায় রাখার পাশাপাশি খালেদা জিয়াকে ক্ষমতার বাইরে রাখতে সম্ভব সবই করেছে ভারত। এমনকি মিথ্যা মামলায় বিএনপি চেয়ারপারসনকে জেলে পাঠানোর সিদ্ধান্ত দিল্লি থেকেই এসেছিল বলে কূটনৈতিক মহলের ধারণা। দিল্লির ইচ্ছাতেই চলতে হবে ঢাকাকে-ভারত সরকারের এমন মনোভাব প্রকাশ্যে এসেছিল ২০০৮ সালের সাজানো নির্বাচনের পর। তখন দেশটির সাবেক সেনাপ্রধান জেনারেল শংকর রায় চৌধুরী বিবিসিকে দেওয়া এক সাক্ষাৎকারে বলেছিলেন, ঢাকাকে আর দিল্লির রাডারের বাইরে যেতে দেওয়া হবে না। তার ওই ঘোষণা অন্তত টানা ১৫ বছর কার্যকর থাকতে দেখা গেছে। তবে জুলাই বিপ্লব সবকিছু ওলটপালট করে দিয়েছে।
হাসিনার পতনের সঙ্গে সঙ্গে বাংলাদেশের ওপর থেকে হারিয়ে যায় দিল্লির একচ্ছত্র প্রভাব। পরিবর্তিত এ পরিস্থিতিতে বাংলাদেশ নীতি নিয়ে নতুন করে ভাবতে বাধ্য হচ্ছে দিল্লি। যে খালেদা জিয়াকে কখনো বিশ্বাস করেননি দিল্লির নীতিনির্ধারকরা, তারই মৃত্যুতে শ্রদ্ধা জানাতে উড়ে আসেন ভারতের অন্যতম নীতিনির্ধারক পররাষ্ট্রমন্ত্রী এস জয়শঙ্কর। সঙ্গে আনেন প্রধানমন্ত্রী নরেন্দ্র মোদির লেখা চিঠি। মোদির চিঠিতে খালেদা জিয়ার ভূয়সী প্রশংসার পাশাপাশি রয়েছে ঢাকা-দিল্লি সম্পর্ক উন্নয়নের বিশেষ বার্তা। এদিকে বিএনপির পাশাপাশি জামায়াতে ইসলামীর সঙ্গেও নিবিড় যোগাযোগ রাখতে চাইছে দিল্লি, যা নিয়ে রাজনৈতিক ও কূটনৈতিক মহলে এখন চলছে ব্যাপক আলোচনা।
বিজ্ঞাপন
খালেদা জিয়ার প্রতি গভীর শ্রদ্ধা ও সম্মান জানানোর পাশাপাশি জামায়াত-দিল্লি ঘনিষ্ঠতার খবর প্রকাশ হওয়ার পর বাংলাদেশ-ভারত সম্পর্ক নিয়ে শুরু হয়েছে নতুন আলোচনা। ভারত কি সত্যি সত্যি সম্পর্কের উন্নয়ন চাইছে, নাকি ভারতের সামনে এই মুহূর্তে কোনো বিকল্প নেই-সে প্রশ্নে রীতিমতো দ্বিধাবিভক্ত কূটনৈতিক ও রাজনৈতিক বিশ্লেষকরা। খালেদা জিয়ার মৃত্যু উপলক্ষে দিল্লির পদক্ষেপকে যদিও রাজনৈতিক দৃষ্টিভঙ্গি থেকে না দেখার পরামর্শ দিয়েছেন পররাষ্ট্র উপদেষ্টা তৌহিদ হোসেন।
পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের সংশ্লিষ্ট কর্মকর্তা, কূটনৈতিক ও রাজনৈতিক বিশ্লেষকরা পরিবর্তিত পরিস্থিতিতে ঢাকা-দিল্লি সম্পর্ককে সতর্কতার সঙ্গে মূল্যায়নের ওপর জোর দেন। তারা বলেন, জয়শঙ্করের ঢাকা আগমন এবং দিল্লির বাংলাদেশ ভবনে রাজনাথ সিংয়ের শোকবইয়ে স্বাক্ষরের ঘটনা একটি ‘গুড জেসচার’। তবে এখনই বলা ঠিক হবে না যে, দিল্লি তার অবস্থান পাল্টাচ্ছে।
২০০৮ সালে ভারতের নীলনকশা অনুযায়ী একটি সাজানো নির্বাচনের মাধ্যমে আওয়ামী লীগ, তথা হাসিনাকে ক্ষমতায় আনা হয়েছিল। ভারতের প্রয়াত রাষ্ট্রপতি প্রণব মুখার্জি তার আত্মজীবনীতে সে সত্যই তুলে ধরেছিলেন। ২০১৪ সালের নির্বাচনেও সরাসরি হস্তক্ষেপ করে দিল্লি। ভারতের তৎকালীন পররাষ্ট্র সচিব সুজাতা সিং ঢাকায় এসে চাপ দিয়ে জাতীয় পার্টিকে ভোটে এনে একতরফা নির্বাচনের বৈধতা দিয়েছিলেন। ২০১৮ সালের রাতের ভোট এবং ২০২৪ সালের ডামি নির্বাচনেও অকুণ্ঠ সমর্থন জানিয়েছিল দিল্লি। মোটকথা, হাসিনার টানা ১৫ বছরের অপশাসনের মূল কারিগর ছিল দিল্লি। বাংলাদেশের পররাষ্ট্র নীতির পুরোটাই নিয়ন্ত্রণ করা হতো সাউথ ব্লক থেকে।
২০২৪ সালের জুলাই বিপ্লবে উৎখাত হওয়া হাসিনা ও তার সহযোগীদের শুধু আশ্রয়ই দেয়নি ভারত সরকার; বরং তাকে দিয়ে বারবার বাংলাদেশে সন্ত্রাস উসকে দেওয়ার অপচেষ্টা করেছে। তথাকথিত হিন্দু নির্যাতনের মিথ্যা অভিযোগ তুলে বাংলাদেশকে অস্থিতিশীল করতে চেয়েছে ভারত। ড. মুহাম্মদ ইউনূসের নেতৃত্বাধীন অন্তর্বর্তী সরকার এবং জুলাই বিপ্লবকে কোনোভাবেই মেনে নিতে পারেননি দিল্লির নীতিনির্ধারকরা। ইউনূস সরকারের পক্ষ থেকে দিল্লিনির্ভর পররাষ্ট্র নীতি থেকে বেরিয়ে একটি স্বাধীন ও ভারসাম্যপূর্ণ পররাষ্ট্র নীতি গ্রহণের পদক্ষেপ রীতিমতো ভাবিয়ে তুলেছে সাউথ ব্লককে।
কূটনৈতিক বিশ্লেষকরা বলছেন, পরিবর্তিত পরিস্থিতিতে ভারতের সেভেন সিস্টার্সের নিরাপত্তা ও আঞ্চলিক ভূরাজনৈতিক প্রেক্ষাপট বিবেচনায় বাংলাদেশ নীতি নিয়ে নতুন করে ভাবতে শুরু করেছে দিল্লি। যে জামায়াত ইস্যুকে কেন্দ্র করে বিএনপির সঙ্গে চরম বৈরিতা দেখিয়েছেন দিল্লির নীতিনির্ধারকরা, আজ নিজেদের প্রয়োজনে জামায়াতের সঙ্গেও ঘনিষ্ঠ সম্পর্ক গড়ে তুলতে তৎপর দিল্লি।
বিএনপির পাশাপাশি জামায়াতের সঙ্গেও দিল্লির সম্পর্ক উন্নয়নের বিষয়ে অবগত সাবেক একজন পররাষ্ট্র সচিব আমার দেশ-এর সঙ্গে আলাপে বলেন-আমি মনে করি, ভারত তার অতীতের ভুল থেকে বেরিয়ে আসতে চাইছে। তাইতো ২০২৪ সালের ৫ আগস্টের পর বিএনপির পাশাপাশি জামায়াতের সঙ্গেও তারা সম্পর্ক উন্নয়নে অগ্রসর হয়েছে। তিনি বলেন, আমার জানামতে ঢাকা ও লন্ডনে জামায়াত নেতাদের সঙ্গে ভারতীয় ঊর্ধ্বতন কর্মকর্তাদের একাধিক বৈঠক অনুষ্ঠিত হয়েছে। এসব বৈঠকের ব্যাপারে দুপক্ষেরই আগ্রহ ছিল।
পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের সংশ্লিষ্ট কর্মকর্তারা এবং ঢাকা-দিল্লি সম্পর্কের বিষয় দেখভাল করেন-এমন একজন সিনিয়র কূটনীতিক আমার দেশ-এর সঙ্গে আলাপে বলেন, দিল্লি যা কিছু করছে, তা তাদের জাতীয় স্বার্থের কথা বিবেচনায় নিয়েই করছে। তাই দিল্লি তার বাংলাদেশ নীতি পরিবর্তন করে ফেলেছে, তা ভাবার কোনো কারণ নেই। ওই সিনিয়র কূটনীতিক আরো বলেন, দিল্লি তার আগের অবস্থান থেকে পুরোপুরি সরে এসেছে-এটা ভাবলে আমরা বড় ধরনের ভুল করব। আগামী নির্বাচিত সরকারকে চাপে রেখে কীভাবে ভারত তার স্বার্থরক্ষা করবে, তা নিয়ে ইতোমধ্যেই কাজ করেছে সাউথ ব্লক। তাই আমাদের অত্যন্ত সতর্কতার সঙ্গে অগ্রসর হতে হবে।
একই ধরনের মনোভাব ব্যক্ত করেছেন পররাষ্ট্র উপদেষ্টা তৌহিদ হোসেনও। তিনি গতকাল বৃহস্পতিবার সাংবাদিকদের সঙ্গে আলাপে বলেন, খালেদা জিয়ার মৃত্যুকে কেন্দ্র করে দিল্লির পদক্ষেপ, তথা এস জয়শঙ্করের ঢাকা সফরকে রাজনৈতিক দৃষ্টিভঙ্গি থেকে না দেখাই ভালো। তিনি বলেন, দক্ষিণ এশিয়ার সব দেশের প্রতিনিধি এসেছেন, তাদের মধ্যে ভারতের পররাষ্ট্রমন্ত্রীও ছিলেন। তার সফর ছিল সংক্ষিপ্ত। কিন্তু তিনি পুরো অনুষ্ঠানটিতে অংশগ্রহণ করেন, তারপর চলে যান। এটা একটা ভালো জেসচার, এ পর্যন্তই। এর চেয়ে বেশি কিছু খুঁজতে না যাওয়াই ভালো।
জয়শঙ্করের বিষয়ে পররাষ্ট্র উপদেষ্টা আরো বলেন, আমাদের মধ্যে ওয়ান টু ওয়ান কথাবার্তা হয়নি, সে সুযোগও ছিল না। তার সঙ্গে আমার যেটুকু কথাবার্তা হয়েছে, তা একেবারেই সৌজন্যমূলক, সেখানে কোনো ধরনের রাজনীতি ছিল না।
জয়শঙ্করের সফর দুদেশের বিদ্যমান উত্তেজনা কমাবে কি না-জানতে চাইলে পররাষ্ট্র উপদেষ্টা বলেন, এর উত্তর আগামী দিনে খুঁজতে হবে। তিনি বলেন, জয়শঙ্কর এসেছিলেন খালেদা জিয়ার প্রতি শ্রদ্ধা জানাতে। খালেদা জিয়ার বাংলাদেশ তো বটেই প্রতিবেশী দেশগুলোতেও বেশ ইতিবাচক ইমেজ ছিল। দক্ষিণ এশিয়ার সবাই তাকে শ্রদ্ধা ও সম্মানের চোখে দেখেন। তার মৃত্যুতে সবাই শ্রদ্ধা জানাবেন, এটাই স্বাভাবিক।আমার দেশ
