মু. হাসান শাহ্রিয়ার :বাংলাদেশের প্রথম নারী প্রধানমন্ত্রী এবং দীর্ঘদিনের জনপ্রিয় রাজনৈতিক নেতা খালেদা জিয়া গতকাল মঙ্গলবার (৩০ ডিসেম্বর) ভোর ৬টায় রাজধানীর এভারকেয়ার হাসপাতালে তিনি ইন্তেকাল করেন। তাঁর বয়স হয়েছিল ৮০ বছর। বিএনপি মিডিয়া সেল এ তথ্য জানিয়েছে।
বিরোধী দল বাংলাদেশ জাতীয়তাবাদী দল (বিএনপি) জানিয়েছে, দীর্ঘদিনের রোগভোগের কারণেই তাঁর মৃত্যু হয়েছে। চিকিৎসকদের ভাষ্য অনুযায়ী, তিনি লিভারের সিরোসিস, আর্থ্রাইটিস, ডায়াবেটিসসহ বুকে ও হৃদ্যন্ত্রের নানা সমস্যায় ভুগছিলেন। বিএনপি চেয়ারপারসন ও সাবেক প্রধানমন্ত্রী বেগম খালেদা জিয়ার নামাজে জানাজা আজ বুধবার অনুষ্ঠিত হবে। গতকাল উপদেষ্টা পরিষদের জরম্নরি বৈঠক শেষে এ তথ্য জানানো হয়। উপদেষ্টা পরিষদের বৈঠক শেষে বিএনপি মহাসচিব মির্জা ফখরম্নল ইসলাম আলমগীরের বরাত দিয়ে আইন উপদেষ্টা আসিফ নজরম্নল জানান, বুধবার বাদ জোহর জাতীয় সংসদের দক্ষিণ প্লাজা ও এর সংলগ্ন মানিক মিয়া অ্যাভিনিউতে বেগম খালেদা জিয়ার জানাজা অনুষ্ঠিত হবে। তাকে শহীদ রাষ্ট্রপতি, বীর মুক্তিযোদ্ধা জিয়াউর রহমানের পাশে দাফন করা হবে। সভায় বেগম খালেদা জিয়ার মৃত্যুতে তিন দিনের রাষ্ট্রীয় শোক ঘোষণা এবং বুধবার এক দিনের সাধারণ ছুটির সিদ্ধাšত্ম হয়েছে। সভায় সাবেক প্রধানমন্ত্রী বেগম খালেদা জিয়ার দাফন ও জানাজা সম্পর্কিত বিষয়ে সরকার সব ধরনের সহযোগিতা করবে বলে জানিয়েছেন প্রধান উপদেষ্টা প্রফেসর ড. মুহাম্মদ ইউনূস।
খালেদা জিয়া চিকিৎসার জন্য তিনি ২০২৫ সালের শুরম্নতে লন্ডনে যান এবং প্রায় চার মাস সেখানে অবস্থান করে দেশে ফেরেন। ২০০৬ সালের পর থেকে ক্ষমতার বাইরে থাকলেও এবং একাধিকবার কারাবন্দি কিংবা গৃহবন্দি অবস্থায় কাটালেও খালেদা জিয়া ও তাঁর নেতৃত্বাধীন মধ্য-ডানপন্থী বিএনপির প্রতি জনগণের উলেস্নখযোগ্য সমর্থন ছিল।
আগামী ফেব্রম্নয়ারিতে অনুষ্ঠিত হতে যাওয়া সংসদ নির্বাচনে বিএনপিকে এগিয়ে থাকা দল হিসেবে দেখা হচ্ছে। তাঁর ছেলে ও দলের ভারপ্রাপ্ত চেয়ারম্যান তারেক রহমান (৬০) লন্ডনে প্রায় ১৭ বছরের স্বেচ্ছা নির্বাসন শেষে গত ২৫ ডিসেম্বর ২০২৫ দেশে ফেরেন এবং তাঁকে প্রধানমন্ত্রী পদের শক্তিশালী প্রার্থী হিসেবে বিবেচনা করা হচ্ছে।
২০২৪ সালের আগস্টে ছাত্র-নেতৃত্বাধীন গণঅভ্যুত্থানে শেখ হাসিনা ক্ষমতাচ্যুত হওয়ার পর থেকে বাংলাদেশ একটি অšত্মর্বর্তী সরকারের অধীনে পরিচালিত হচ্ছে। এই সরকারের প্রধান নোবেল শাšিত্ম পুরস্কারজয়ী ও ড়্গুদ্রঋণ আন্দোলনের পথিকৃৎ মুহাম্মদ ইউনূস।
গত নভেম্বরে ছাত্র আন্দোলনে দমন-পীড়নের ঘটনায় শেখ হাসিনাকে অনুপস্থিতিতে মৃত্যুদ- দেওয়া হয়।
‘খালেদা’ নামেই বেশি পরিচিত এই নেত্রীকে প্রথম জীবনে লাজুক ও পরিবারমুখী হিসেবে দেখা হতো। তাঁর স্বামী, সাবেক রাষ্ট্রপতি ও সামরিক নেতা জিয়াউর রহমান ১৯৮১ সালে এক ব্যর্থ সামরিক অভ্যুত্থানে নিহত হওয়ার পরই তিনি সক্রিয় রাজনীতিতে আসেন। তিন বছর পর তিনি বিএনপির নেতৃত্ব গ্রহণ করেন যে দলটি তাঁর স্বামী প্রতিষ্ঠা করেছিলেন এবং বাংলাদেশকে দারিদ্র্য ও অর্থনৈতিক পশ্চাৎপদতা থেকে মুক্ত করার অঙ্গীকার করেন।
১৯৯০ সালে সামরিক শাসক হুসেইন মুহাম্মদ এরশাদের পতনে গণআন্দোলনে তিনি শেখ হাসিনার সঙ্গে হাত মিলিয়েছিলেন। শেখ হাসিনা বাংলাদেশের প্রতিষ্ঠাতা রাষ্ট্রপতি শেখ মুজিবুর রহমানের কন্যা এবং আওয়ামী লীগের নেত্রী।
‘লড়াকু বেগম’ যুগ :
তবে এই ঐক্য বেশিদিন স্থায়ী হয়নি। পরবর্তী কয়েক দশক ধরে তাঁদের তীব্র রাজনৈতিক বৈরিতা বাংলাদেশের রাজনীতিকে প্রভাবিত করে। এই দুই নেত্রী পরিচিত হন ‘ব্যাটলিং বেগমস’ বা ‘লড়াকু বেগম’ নামে। সমর্থকদের কাছে খালেদা জিয়া ছিলেন মার্জিত, ঐতিহ্যবাহী অথচ রম্নচিশীল যিনি কথা বলতেন ভেবেচিšেত্ম। তবে দল ও আদর্শ রক্ষায় তিনি ছিলেন দৃঢ ও আপসহীন। অন্যদিকে শেখ হাসিনা ছিলেন বেশি সরব ও আক্রমণাত্মক। তাঁদের বিপরীত ব্যক্তিত্বই এই দীর্ঘস্থায়ী দ্বন্দ্বকে আরও তীব্র করে তোলে। ১৯৯১ সালে অনুষ্ঠিত দেশের প্রথম অবাধ নির্বাচনে খালেদা জিয়া শেখ হাসিনাকে পরাজিত করে প্রধানমন্ত্রী নির্বাচিত হন। এ সময় তিনি জামায়াতে ইসলামীসহ ইসলামী দলগুলোর সমর্থন পেয়েছিলেন। এর মধ্য দিয়ে তিনি হন বাংলাদেশের প্রথম নারী প্রধানমন্ত্রী এবং পাকি¯ত্মানের বেনজির ভুট্টোর পর মুসলিম প্রধান কোনো দেশের দ্বিতীয় নারী সরকারপ্রধান।
খালেদা জিয়া রাষ্ট্রপতি শাসনব্যবস্থা বাতিল করে সংসদীয় ব্যবস্থা চালু করেন, যাতে প্রকৃত ক্ষমতা প্রধানমন্ত্রীর হাতে থাকে। তিনি বিদেশি বিনিয়োগের ওপর নিষেধাজ্ঞা শিথিল করেন এবং প্রাথমিক শিক্ষা বাধ্যতামূলক ও বিনামূল্যে চালু করেন।
১৯৯৬ সালের নির্বাচনে তিনি শেখ হাসিনার কাছে পরাজিত হলেও পাঁচ বছর পর ভূমিধস বিজয়ের মাধ্যমে আবার ক্ষমতায় ফেরেন।
তবে তাঁর দ্বিতীয় মেয়াদে ইসলামপন্থী জঙ্গিবাদের উত্থান ও দুর্নীতির অভিযোগ বড় চ্যালেঞ্জ হয়ে দাঁড়ায়।
২০০৪ সালে শেখ হাসিনার এক জনসভায় গ্রেনেড হামলায় ২০ জনের বেশি মানুষ নিহত এবং পাঁচ শতাধিক আহত হন। শেখ হাসিনা প্রাণে বেঁচে গেলেও ওই হামলার জন্য খালেদা জিয়ার সরকার ও তাদের ইসলামপন্থী মিত্রদের দায়ী করা হয়।
২০১৮ সালে তারেক রহমানকে ওই হামলার ঘটনায় অনুপস্থিতিতে বিচার করে যাবজ্জীবন কারাদ- দেওয়া হয়। বিএনপি একে রাজনৈতিক উদ্দেশ্যপ্রণোদিত বলে দাবি করে।
আটক ও মুক্তি :
পরবর্তীকালে ইসলামপন্থী জঙ্গিগোষ্ঠীর বিরম্নদ্ধে কঠোর অবস্থান নিলেও ২০০৬ সালে রাজনৈতিক অস্থিরতা ও সহিংসতার মধ্যে সেনাসমর্থিত অšত্মর্বর্তী সরকার ক্ষমতায় এলে খালেদা জিয়ার দ্বিতীয় মেয়াদ শেষ হয়।
ওই সরকার দুর্নীতি ও ক্ষমতার অপব্যবহারের অভিযোগে খালেদা জিয়া ও শেখ হাসিনাকে প্রায় এক বছর কারাবন্দি রাখে। ২০০৮ সালের নির্বাচনের আগে দুজনই মুক্তি পান।
এরপর আর ক্ষমতায় ফিরতে পারেননি খালেদা জিয়া। বিএনপি ২০১৪ ও ২০২৪ সালের নির্বাচন বর্জন করলে শেখ হাসিনার সঙ্গে তাঁর রাজনৈতিক দ্বন্দ্ব আরও তীব্র হয়।
দুই দলের সংঘাতে প্রায়ই হরতাল, সহিংসতা ও প্রাণহানির ঘটনা ঘটে, যা প্রায় ১৭ কোটি ৫০ লাখ জনসংখ্যার বন্যাপ্রবণ ও দারিদ্র্যপীড়িত দেশের অর্থনৈতিক উন্নয়নে বাধা সৃষ্টি করে।
২০১৮ সালে একটি এতিমখানা ট্রাস্টের বিদেশি অনুদান থেকে প্রায় আড়াই লাখ ডলার আত্মসাতের মামলায় খালেদা জিয়া, তারেক রহমান ও কয়েকজন সহযোগী দোষী সাব্য¯ত্ম হন। খালেদা জিয়া বলেন, এটি তাঁকে ও তাঁর পরিবারকে রাজনীতি থেকে দূরে রাখার ষড়যন্ত্র।
তিনি কারাগারে যান, তবে স্বাস্থ্যের অবনতি হওয়ায় ২০২০ সালের মার্চে মানবিক বিবেচনায় গৃহবন্দি করা হয়।
২০২৪ সালের ৫ আগস্টে শেখ হাসিনার পতনের পর খালেদা জিয়া গৃহবন্দিত্ব থেকে মুক্তি পান।
২০২৫ সালের শুরম্নতে সুপ্রিম কোর্ট ওই দুর্নীতি মামলায় খালেদা জিয়া ও তারেক রহমানকে খালাস দেন। তারেক রহমান এক মাস আগে ২০০৪ সালের গ্রেনেড হামলা মামলাতেও খালাস পান।
গৃহবধূ থেকে যেভাবে বাংলাদেশের ইতিহাসে অন্যতম নেতা হয়ে উঠেছিলেন খালেদা জিয়া
দীর্ঘ চার দশকেরও বেশি সময় ধরে বাংলাদেশের রাজনীতিতে অন্যতম প্রধান চরিত্র খালেদা জিয়া গৃহবধূ থেকে রাজনীতিতে নেমে দশ বছরের মধ্যেই বিএনপিকে ক্ষমতায় নিয়েছিলেন। খালেদা জিয়ার নেতৃত্বে বিএনপির প্রথম মেয়াদে সরকার গঠনের সময় দেশে আবার সংসদীয় সরকার ব্যবস্থা চালু হয়েছে। তিনি মুসলিম সংখ্যাগরিষ্ঠ কোনো দেশে পাকিšত্মানের বেনজির ভুট্টোর পর দ্বিতীয় নারী গণতান্ত্রিক সরকারপ্রধান হন। ১৯৭১ সালের মুক্তিযুদ্ধের পর জিয়াউর রহমান জাতীয়ভাবে পরিচিত হয়ে ওঠেন। পরে তিনি ১৯৭৭ সালে রাষ্ট্রপতি হন এবং ১৯৭৮ সালে বিএনপি প্রতিষ্ঠা করেন। খালেদা জিয়ার রাজনৈতিক জীবনের সূচনা হয় কোনো ব্যক্তিগত উচ্চাকাঙ্ক্ষা থেকে নয়, বরং এক মর্মাšিত্মক ঘটনার মধ্য দিয়ে। ১৯৮১ সালে এক ব্যর্থ সামরিক অভ্যুত্থানে জিয়াউর রহমান নিহত হন। তখন ৩৫/৩৬ বছর বয়সী খালেদা জিয়া, বিএনপির নেতৃত্ব গ্রহণ করেন। তখন তিনি একজন সাধারণ গৃহবধূ ছিলেন। তারেক রহমান এবং আরাফাত রহমান-দুই সšত্মান নিয়েই ছিল তাঁর সংসার। সেই প্রেক্ষাপটে বিপর্য¯ত্ম বিএনপিকে টিকিয়ে রাখতে খালেদা জিয়া দলের হাল ধরেছিলেন। বিশ্লেষকরা বলেছেন, ক্ষমতার বলয়ের ভেতর থেকে তৈরি হওয়া বিএনপিকে রাজনৈতিকভাবে এগিয়ে নিয়েছিলেন খালেদা জিয়া। তবে তাঁর নেতৃত্বাধীন বিএনপির সঙ্গে জামায়াতে ইসলামীসহ ধর্মভিত্তিক বিভিন্ন দলের ঘনিষ্ঠ সম্পর্কসহ বিভিন্ন বিষয় নিয়ে সমালোচনাও ছিল।
পুতুল থেকে খালেদা জিয়া :
তার পুরো নাম ছিল খালেদা খানম। আর পরিবারের সদস্য এবং আত্মীয়-স্বজনের কাছে তাঁর ডাক নাম ছিল পুতুল। জিয়াউর রহমান ১৯৬০ সালে যখন পাকি¯ত্মান সেনাবাহিনীতে একজন ক্যাপ্টেন ছিলেন, তখন তাদের বিয়ে হয়। তিনি বিয়ের পরই তাঁর স্বামীর নামের সঙ্গে মিলিয়ে খালেদা জিয়া নাম নিয়েছিলেন বলে তাঁর বোন সেলিমা ইসলাম জানিয়েছেন। তবে রাজনীতিতে নামার পরই তিনি পরিচিত হন খালেদা জিয়া নামে। তার বড় বোন সেলিমা ইসলাম গণমাধ্যমকে বলেছেন, সে সময় খালেদা জিয়ার রাজনীতি নিয়ে কোন চিšত্মাই ছিল না। এর আগে জিয়াউর রহমান রাষ্ট্রপতি থাকার সময়ও খালেদা জিয়া কোন রাজনৈতিক কর্মকা-ে সম্পৃক্ত হননি। খালেদা জিয়ার জীবন কাহিনি নিয়ে বই প্রকাশ করেন সাংবাদিক মাহফুজ উল্লাহ। তিনি বেঁচে নেই। বইটি প্রকাশের সময় মাহফুজ উল্লাহ গণামাধ্যমকে বলেছিলেন, অল্প বয়সে বিধবা হওয়ার পর খালেদা জিয়া পুরম্নষ শাসিত সমাজে একটি রাজনৈতিক দলের নেতৃত্বে এসে যোগ্যতা দিয়ে নিজের আসন তৈরি করে নেন। দলের বিপর্যয়ে হাল ধরেছিলেন জিয়াউর রহমানের মৃত্যুর পর বিএনপিতে অভ্যšত্মরীণ কোন্দল দেখা দেয় এবং অন্যদিকে নেতাদের অনেকে তখন সামরিক শাসক জেনারেল এরশাদের সঙ্গে শরিক হন। সব মিলিয়ে দলটি চরম বিপর্যয়ের মুখে পড়ে।
সেই পরিস্থিতিতে খালেদা জিয়া বিএনপিতে যোগ দেন ১৯৮৩ সালের ৩রা জানুয়ারি। প্রথমে তিনি দলের ভাইস চেয়ারম্যান হন। এর পরের বছর ১৯৮৪ সালের ১০ই মে বিএনপির চেয়ারপার্সন নির্বাচিত হন খালেদা জিয়া। তাদের পরিবারের ঘনিষ্ঠ ছিলেন বিএনপির সাবেক নেতা অলি আহমেদ। জিয়াউর রহমান রাষ্ট্রপতি থাকার সময় তাঁর একাšত্ম সচিব ছিলেন অলি আহমেদ। তিনি বলেছেন, বিএনপিকে টিকিয়ে রাখতে তাদের অনুরোধে খালেদা জিয়া রাজনীতিতে আসেন। খালেদা জিয়ার জন্ম ১৯৪৬ সালের ১৫ই অগাস্ট তৎকালীন ব্রিটিশ ভারতের জলপাইগুড়িতে। মতাšত্মরে তৎকালীন ভারতের পূর্ববঙ্গের দিনাজপুরে, যা বর্তমানে বাংলাদেশের উত্তরাঞ্চলে অবস্থিত। তবে তাঁর জন্ম তারিখ নিয়ে রাজনৈতিক অঙ্গনে বিতর্ক রয়েছে। তাঁর বাবার নাম ইস্কান্দর মজুমদার এবং মায়ের নাম তৈয়বা মজুমদার। তাদের আদি ভিটা ছিল ফেনী জেলার ফুলগাজী উপজেলায় এবং তারা স্থায়ীভাবে বসবাস করেছেন দিনাজপুর শহরের মুদিপাড়া এলাকায়। পাঁচ ভাই বোনের মধ্যে খালেদা জিয়া হলেন তৃতীয়। তাঁর বড় দুই বোন এবং ছোট দুই ভাই। তাঁর ঘনিষ্ঠ এবং বিএনপির নেত্রী সেলিমা রহমান বলেছেন, রাজনীতি নিয়ে শত ব্য¯ত্মতার মাঝেও খালেদা জিয়া পারিবারিক কর্তব্য পালনে সক্রিয় থাকতেন।
আপোষহীন নেত্রী হিসাবে পরিচিতি:
খালেদা জিয়া সেই ১৯৮২ সালে যখন বিএনপির নেতৃত্বে আসেন, তখন জেনারেল এরশাদের সামরিক শাসন চলছিল। সেই শাসনের বিরম্নদ্ধে নয় বছরের আন্দোলনের মধ্য দিয়েই তিনি রাজনীতিতে নিজের এবং দলের অবস্থান তৈরি করেন বলে বিএনপি নেতারা মনে করেন। বিএনপির নেতৃত্ব নেয়ার পরের বছর ১৯৮৩ সালে তিনি সাত দলীয় ঐক্যজোট গঠন করে এরশাদের শাসনের বিরম্নদ্ধে আন্দোলনে নেমেছিলেন। অন্যদিকে আন্দোলন করে আওয়ামী লীগের নেতৃত্বে আট দলীয় জোট এবং বামপন্থী দলগুলোর পাঁচ দলীয় জোট। ১৯৮৬ সালে আওয়ামী লীগের জোট এরশাদ সরকারের অধীনে সংসদ নির্বাচনে অংশ নিয়েছিল। তবে বিএনপির জোট নির্বাচনে অংশ না নিয়ে নয় বছর রাজপথের আন্দোলনে থাকায় খালেদা জিয়া আপোষহীন নেত্রী হিসাবে পরিচিতি পেয়েছিলেন। এরশাদ সরকার বিরোধী আন্দোলনে খালেদা জিয়া গ্রেপ্তার হয়েছিলেন তিনবার। বিএনপি নিয়ে গবেষণাধর্মী বইয়ের লেখক মহিউদ্দিন আহমেদ বলেছেন, এরশাদ বিরোধী আন্দোলনের মাধ্যমে খালেদা জিয়া বিএনপিকে পুনরম্নজ্জীবিত করেছেন। এরশাদ সরকারের পতনের পর ১৯৯১ সালের ২৭ ফেব্রম্নয়ারি সব দলের অংশ গ্রহণে নির্বাচনের মাধ্যমে খালেদা জিয়ার নেতৃত্বে বিএনপি ক্ষমতায় আসে। তিনি বাংলাদেশের প্রথম নারী প্রধানমন্ত্রী হয়ে ইতিহাস গড়েন। নির্বাচনে খালেদা জিয়া পাঁচটি আসনে প্রতিদ্বন্দ্বিতা করে সবক’টি আসনেই নির্বাচিত হয়েছিলেন। সেই নির্বাচনের আগে এরশাদ বিরোধী আন্দোলনে থাকা তিন জোটের রূপরেখায় সংসদীয় সরকার ব্যবস্থায় ফিরিয়ে আনার অঙ্গীকার ছিল। সেই প্রেক্ষাপটে নির্বাচনের পর গঠিত পঞ্চম সংসদে সংসদ নেতা হিসাবে খালেদা জিয়া রাষ্ট্রপতি শাসিত সরকার ব্যবস্থা পাল্টিয়ে সংসদীয় পদ্ধতির সরকার প্রবর্তনের জন্য বিল উত্থাপন করেছিলেন এবং ঐকমত্যের ভিত্তিতে তা পাস হয়। তখন দীর্ঘ ১৬ বছর পর ফিরে আসে সংসদীয় সরকার। অলি আহমেদ বলেছেন, খালেদা জিয়ার এই অবদান মানুষের মাঝে বিএনপির অবস্থানকে শক্তিশালী করেছে।
প্রধানমন্ত্রী থেকে বিরোধী নেতা :
খালেদা জিয়ার নেতৃত্বে বিএনপির প্রথম সরকারের শেষদিকে সাধারণ নির্বাচন পরিচালনার জন্য তত্ত্বাবধায়ক সরকারের দাবিতে তীব্র আন্দোলন গড়ে তুলেছিল আওয়ামী লীগসহ বিভিন্ন রাজনৈতিক দল। সেই আন্দোলনের মুখে ১৯৯৬ সালের ১৫ই ফেব্রম্নয়ারি এক দলীয় নির্বাচনের মাধ্যমে ষষ্ঠ সংসদ গঠন করে খালেদা জিয়া আবার প্রধানমন্ত্রী হয়েছিলেন। এই সংসদে তত্ত্বাবধায়ক সরকার ব্যবস্থা প্রবর্তনের জন্য ষষ্ঠ সংসদে সংবিধানের ত্রয়োদশ সংশোধনী বিল পাস করা হয়। তবে সেই সংসদ টিকে ছিল মাত্র ১২দিন। সংসদ ভেঙে দিয়ে খালেদা জিয়া তত্ত্বাবধায়ক সরকারের কাছে ক্ষমতা হ¯ত্মাšত্মর করেছিলেন। এরপর ১৯৯৬ সালের নির্বাচনের মাধ্যমে তিনি সংসদে বিরোধী দলীয় নেতার আসনে বসেছিলেন। তিনি আরেকবার বিরোধীদলীয় নেতা হয়েছিলেন ২০০৮ সালের নির্বাচনে বিএনপির নেতৃত্বাধীন জোট পরাজিত হওয়ার কারণে। তবে তার আগে ২০০১ সালে যখন বিএনপি ক্ষমতায় এসেছিল তখন তিনি তৃতীয়বার প্রধানমন্ত্রী হয়েছিলেন। অলি আহমেদ বলেছেন, প্রধানমন্ত্রী হিসাবে বা দলের নেতৃত্ব দিতে গিয়ে খালেদা জিয়া অনেক সময় সিদ্ধাšত্ম নিতে বিলম্ব করতেন। তবে তাঁর মধ্যে সহনশীলতা ছিল বলে তিনি উল্লেখ করেন। আওয়ামী লীগ সরকার ২০১১ সালে তত্ত্বাবধায়ক সরকার ব্যবস্থা বাতিল করলে খালেদা জিয়া বিএনপিসহ তাদের জোটের নেতৃত্ব দিয়ে তত্ত্বাবধায়ক সরকার ব্যবস্থা ফিরিয়ে আনার দাবিতে আন্দোলনে নেমেছিলেন। তাতে সফলতা আসেনি। তখন ২০১৪ সালের নির্বাচন বর্জন করে বিএনপি সংসদে প্রতিনিধিত্ব হারিয়েছিল। এরপর দীর্ঘ সময় ক্ষমতার বাইরে থেকে তাঁকে জেলেও যেতে হয়। খালেদা জিয়া বিএনপির সাথে জামায়াতে ইসলামী সহ কয়েকটি দলকে নিয়ে চার দলীয় জোট করেছিলেন ১৯৯৭ সালে আওয়ামী লীগ সরকারের সময়ে। সেই জোট পরে ২০ দলীয় জোট পরিণত হয়। জোটে ইসলামপন্থী দলের সংখ্যা বেশি ছিল। জামায়াতে ইসলামীর সাথে বিএনপির ঘনিষ্ঠতা নিয়ে বিভিন্ন সময় অনেক সমালোচনাও হয়েছে। তবে এ ব্যাপারে খালেদা জিয়ার একক দায় নেই বলে মনে করেন লেখক মহিউদ্দিন আহমেদ।দুর্নীতির মামলায় সাজা ও অসুস্থতা ২০০৮ সালের সেপ্টেম্বরে কারাগার থেকে বেরিয়েই হাসপাতালে অসুস্থ তারেক রহমানকে দেখতে যান খালেদা জিয়া। এরশাদের শাসনামল ছাড়াও বিএনপি নেত্রী খালেদা জিয়া জেলে গিয়েছিলেন ২০০৭ সালে তত্ত্বাবধায়ক সরকারের সময়ে। আওয়ামী লীগ সরকারের সময়ে খালেদা জিয়া জেলে গিয়েছিলেন ২০১৮ সালের আটই ফেব্রম্নয়ারি। তখন তার ১৭ বছরের সাজা হয় জিয়া অরফানেজ ট্রাস্ট এবং জিয়া চ্যারিটেবল ট্রাস্ট সম্পর্কিত দুর্নীতির দু’টি মামলায়। তবে দুই বছরের বেশি সময় জেল খেটে অসুস্থতার কারণে আওয়ামী লীগ সরকারের নির্বাহী আদেশে বিভিন্ন শর্তে মুক্তির পর তিনি গুলশানের বাসায় উঠেন। শর্তগুলো ছিলো – এই সময়ে তার ঢাকায় নিজের বাসায় থাকতে হবে এবং তিনি বিদেশে যেতে পারবেন না। পরে কয়েক দফায় তার সেই মুক্তির মেয়াদ বৃদ্ধি করা হয়েছে। এরপর খালেদা জিয়া দৃশ্যমান কোন রাজনৈতিক কর্মকা-ে অংশ নেননি। গুলশানের বাসভবনে অসুস্থ হয়ে পড়লে খালেদা জিয়াকে একাধিকবার হাসপাতালে ভর্তি করা হয়েছিল। ঢাকায় নিজের বাসায় থাকা অবস্থাতেই ২০২১ সালের মে মাসে করোনায় আক্রাšত্ম হয়ে চিকিৎসা নেন তিনি। তখনো শ্বাসকষ্টে ভোগার কারণে তাকে করোনারি কেয়ার ইউনিটে থেকে চিকিৎসা নিতে হয়েছিল। একপর্যায়ে চিকিৎসকরা জানান, তিনি লিভার সিরোসিসে ভুগছেন। এছাড়া তার ডায়াবেটিস, আর্থরাইটিস, কিডনি ও হৃদরোগের জটিল সমস্যা রয়েছে।
বিদেশে উন্নত চিকিৎসার জন্য খালেদা জিয়ার পরিবারের সদস্যরা একাধিকবার আবেদন করলেও সরকারের পক্ষ থেকে বলা হয়েছে, সাজাপ্রাপ্ত আসামী হওয়ায় আইনগত কারণে এক্ষেত্রে সরকারের কিছু করার নেই। পরে ২০২৪ সালের জুনে তার হৃদপি-ে পেসমেকার বসানো হয়। তখনো তিনি মূলত হার্ট, কিডনি ও লিভারসহ বিভিন্ন ধরনের রোগে ভুগছিলেন, যা তার শারীরিক অবস্থাকে জটিল করে তুলেছিলো। এর আগে থেকেই তার হার্টে তিনটি ব্লক ছিল। আগে একটা রিংও পরানো হয়েছিল। এছাড়া ২০২৪ সালের জুনে পোর্টো সিস্টেমেটিক অ্যানেসটোমেসির মাধ্যমে খালেদা জিয়ার লিভারের চিকিৎসাও দেয়া হয়েছে বিদেশ থেকে ডাক্তার এনে।
গত বছর জুলাই গণঅভ্যুত্থানে শেখ হাসিনা সরকারের পতনের পর ২০২৪ সালের পাঁচই অগাস্টেই নির্বাহী আদেশে মুক্তি পান খালেদা জিয়া। চলতি বছরের শুরম্নতে বাংলাদেশের সুপ্রিম কোর্ট দুর্নীতির মামলায় খালেদা জিয়া ও তাঁর ছেলেকে খালাস দেন। ২০০৪ সালে শেখ হাসিনার ওপর গ্রেনেড হামলা সংক্রাšত্ম মামলাতেও খালাস পাওয়া তারেক রহমান ১৭ বছর লন্ডনে নির্বাসিত জীবনের পর গত ২৫ ডিডেম্বর ২০২৫ বাংলাদশে দেশে ফেরেন।
এরপর চলতি বছরের জানুয়ারিতে চিকিৎসার জন্য লন্ডন গিয়েছিলেন খালেদা জিয়া। তখন তাকে কাতার এয়ারওয়েজের একটি বিমানে নেয়া হয়েছিলো যাতে ভেন্টিলেটর, ডিফিব্রিলেটর, ইনফিউশন পাম্প ও উন্নত কার্ডিয়াক মনিটরসহ জরম্নর চিকিৎসার ব্যবস্থা করা ছিলো। লন্ডনে চার মাস থেকে দেশে ফেরার পরেও খালেদা জিয়াকে কয়েকবার হাসপাতালে যেতে হয়েছে। তবে শারীরিক অবস্থা স্থিতিশীল হওয়ার পর তিনি গুলশানের বাসাতেই অবস্থান করছিলেন।
পাঁচ অগাস্টের পর মুক্তি, সীমিত রাজনৈতিক কর্মকা-:
২০২৪ সালের অগাস্টে গণআন্দোলনের মুখে শেখ হাসিনা ক্ষমতাচ্যুত হয়ে ভারতে পালিয়ে যাওয়ার পর নির্বাহী আদেশে মুক্তি পান খালেদা জিয়া। এরপর তাকে সীমিত পরিসরে দলের রাজনৈতিক কর্মকা- এবং রাষ্ট্রীয় ও কূটনৈতিক অনুষ্ঠানে যোগ দিতে দেখা গেছে। সবশেষ ২১শে নভেম্বর সশস্ত্র বাহিনী দিবসের অনুষ্ঠানে যোগ দিতে রওনা দিয়ে গাড়িতে ওঠেই অস্বস্থি বোধ করছিলেন তিনি। পরে শ্বাসকষ্ট হলে ২৩শে নভেম্বর তাকে জরম্নরি ভিত্তিতে হাসপাতালে নেওয়া হয়। বিশ্লেষকেরা মনে করেন, ৯০ দশক থেকে দীর্ঘ সময় বাংলাদেশের রাজনীতি খালেদা জিয়া এবং শেখ হাসিনাকে ঘিরে আবর্তিত হয়। কারাভোগ, বয়স ও অসুস্থতার কারণে খালেদা জিয়া দীর্ঘ সময় নিস্ক্রিয় থাকলেও ২০২৪ সালের পাঁচই অগাস্ট পরবর্তী সময়ে বাংলাদেশে সক্রিয় রাজনৈতিক দলগুলোর মধ্যে আন্দোলনের ভূমিকা নিয়ে মতপার্থক্য দেখা গেলেও, আন্দোলনে যুক্ত সব পক্ষই খালেদা জিয়াকে সম্মানের চোখে দেখেছেন। দলের ভেতরে বিএনপি তাকে রাজনৈতিক অভিভাবক হিসেবেই সামনে এনেছে সব সময়। সবশেষ ত্রয়োদশ জাতীয় নির্বাচনের জন্য খালেদা জিয়াকে তিনটি আসন থেকে প্রার্থী করেছিল বিএনপি।###
Related Posts
Add A Comment
