মুক্তদেশ ডেস্ক: দেশের বিভিন্ন এলাকায় শুক্রবার (২১ নভেম্বর) সকাল ১০টা ৩৮ মিনিটে রিখটার স্কেলে ৫.৭ মাত্রার ভূমিকম্প অনুভূত হয়। উৎপত্তিস্থল ছিল রাজধানীর খুব কাছেই নরসিংদীর মাধবদীতে।
শনিবার রাজধানীসহ দেশের বিভিন্ন স্থানে ফের ভূমিকম্প অনুভূত হয়েছে। সন্ধ্যা ৬টা ৬ মিনিটের দিকে এ কম্পন অনুভূত হয়। মার্কিন ভূতাত্ত্বিক জরিপ সংস্থা (ইউএসজিএস) জানিয়েছে, এবারের ভূমিকম্পের মাত্রা ছিল ৪.৩ এবং উৎপত্তিস্থল নরসিংদীতে।
এর আগে শনিবার সকাল ১০টা ৩৬ মিনিটে নরসিংদীর পলাশে মৃদু ভূমিকম্প অনুভূত হয়, রিখটার স্কেলে এর মাত্রা ছিল ৩.৩। তবে ভূমিকম্পটি শক্তিতে ছিল অনেকটা দুর্বল। যদিও উৎপত্তিস্থল নিয়ে সকাল থেকে বিভ্রান্তি তৈরি হয়।
সাম্প্রতিক বছরে দেশে উৎপত্তি হওয়া সবচেয়ে বড় ভূমিকম্প এটি। শুক্রবারের কয়েক সেকেন্ড স্থায়ী কম্পনে দেশের বিভিন্ন স্থানে ভবন, অবকাঠামো ও সড়কে ব্যাপক ক্ষতি হয়। প্রাণ হারিয়েছেন অন্তত ১০ জন, আহত হয়েছেন কয়েকশ মানুষ।
বিশেষজ্ঞরা বলছেন, সাম্প্রতিক সময়ে দেশে যেসব ছোট ও মাঝারি ভূমিকম্প পরপর ঘটছে, তা ভবিষ্যতে আরও বড় ভূমিকম্পের পূর্বাভাস দিচ্ছে। ভৌগোলিক অবস্থানের কারণে পুরো বাংলাদেশই ঝুঁকিপূর্ণ, তবে সবচেয়ে বেশি ঝুঁকিতে রাজধানী ঢাকা। কারণ—ঢাকার বড় অংশজুড়ে ভবন নির্মাণ হয়েছে বিল্ডিং কোড অনুসরণ না করে, আর ভূমিকম্প মোকাবিলায় দীর্ঘমেয়াদি প্রস্তুতিও অত্যন্ত সীমিত।
তথ্য অনুযায়ী, গত দেড় বছরে দেশের আশপাশে ৫০টির বেশি ভূমিকম্প অনুভূত হয়েছে; গত ১৫ বছরে সংখ্যাটি ১৫০-এরও বেশি। এসব ঘটনার ধারাবাহিকতা বিশেষজ্ঞদের আরও উদ্বিগ্ন করে তুলছে।
বাংলাদেশের পূর্বাঞ্চল—সিলেট থেকে চট্টগ্রাম—প্রবল ভূমিকম্পঝুঁকির অঞ্চলে পড়ে। এছাড়া ভারতের মণিপুর ও মিজোরাম এবং মিয়ানমারের পার্বত্য এলাকাও একই ঝুঁকিতে আছে।
বিশেষজ্ঞরা জানান, কিশোরগঞ্জের হাওর এলাকা থেকে মেঘনা হয়ে বঙ্গোপসাগর পর্যন্ত যে কাল্পনিক রেখা টানা যায়, সেটি ইন্দো-বার্মা টেকটোনিক প্লেটের সংযোগরেখা। দীর্ঘ এক শতাব্দী ধরে এই অঞ্চলে বড় ধরনের ভূমিকম্প হয়নি। দুই প্লেটের মধ্যে জমে থাকা শক্তি যেকোনো সময় ৮ থেকে ৯ মাত্রার ভূমিকম্পে রূপ নিতে পারে।
বিজ্ঞানীদের আশঙ্কা, ঢাকার আশপাশে ৭ মাত্রার বা তার বেশি ভূমিকম্প হলে রাজধানীতে প্রায় দুই লাখ ভবন ধসে যেতে পারে। গ্যাস-বিদ্যুতের অপরিকল্পিত লাইন বিস্ফোরণ ও অগ্নিকাণ্ডের ঝুঁকি আরও বাড়িয়ে তুলবে। এমন পরিস্থিতিতে ঢাকা শহর মৃত্যুকূপে পরিণত হতে পারে।
বাংলাদেশ আবহাওয়া অধিদপ্তরের ভূমিকম্প পর্যবেক্ষণ কেন্দ্র বলছে, ঢাকায় বিগত কয়েক দশকের মধ্যে আজকের ভূমিকম্পই সবচেয়ে শক্তিশালী। পূর্বের অধিকাংশ ভূমিকম্পের উৎপত্তিস্থল ছিল দেশের বাইরে।
ভূতত্ত্ববিদ অধ্যাপক সৈয়দ হুমায়ুন আখতার বলেছেন, আজকের ভূমিকম্পটি ইন্দো-বার্মা প্লেটের সংযোগস্থলে হয়েছে। দীর্ঘদিন ধরে জমে থাকা শক্তির আংশিক মুক্তি ঘটেছে। ফলে পরবর্তী সময়েও ভূমিকম্প হওয়ার সম্ভাবনা রয়েছে। তিনি আরও বলেন, ঢাকার কাছাকাছি এই মাত্রার ভূমিকম্প কয়েক প্রজন্ম দেখেনি।
বুয়েটের পুরকৌশল বিভাগের অধ্যাপক মেহেদি আহমেদ আনসারী বলেন, ঢাকার সব ভবন তাৎক্ষণিকভাবে পরীক্ষা করা প্রয়োজন। সরকারের আলাদা ব্যয় না করেও রাজউক এই কাজের তদারকি করতে পারে। সঠিক পরীক্ষা ও সনদ দেওয়া হলে কোন ভবন কতটা ঝুঁকিতে আছে তা বুঝতে সুবিধা হবে।
তিনি জানান, ঢাকায় প্রায় ২১ লাখ ভবন রয়েছে। এর মধ্যে একতলা-দোতলা ভবন প্রায় ১৫ লাখ, আর চার থেকে ছয়তলা ভবন প্রায় ৬ লাখ। ঢাকার ১০০ কিলোমিটারের মধ্যে ৭ মাত্রার ভূমিকম্প হলে দুই থেকে তিন লাখ মানুষ হতাহত হতে পারে, এবং শহরের ৩৫ শতাংশ ভবন ভেঙে পড়ার আশঙ্কা রয়েছে।
