এম. হাসান :
ঝুঁকি ছাড়া লাভ নেই Ñএই প্রবাদবাক্যটি আমাদের জীবনের একটি চিরন্তন সত্য। ঝুঁকি মানেই অন্ধকারে লাফ দেওয়া নয়, বরং সুপরিকল্পিত সাহসিকতা। যারা বড় কিছু করতে চান, তারা ঝুঁকি নেন, ব্যর্থ হন, আবার উঠে দাঁড়ান। সফলতার পথ কখনোই সোজা নয়, বরং তা তৈরি হয় বাধা, ব্যর্থতা ও ঝুঁকির ওপর ভর করে। ‘ঝুঁকি ছাড়া লাভ নেই’ এই কথাটি আমরা জীবনের নানা পর্যায়ে শুনেছি, কিন্তু খুব কম মানুষই এই কথাটির গভীরতা বুঝে সেটাকে জীবনের দর্শন হিসেবে গ্রহণ করেন। এই বাক্যটি শুধু ব্যবসায় নয়, বরং জীবনের প্রতিটি ক্ষেত্রে প্রযোজ্য। হোক তা ক্যারিয়ার, শিক্ষা, ভালোবাসা, কিংবা ব্যক্তিগত উন্নয়ন কোনো বড় সাফল্যই আসে না যদি না আপনি নিজের সীমানা ছাড়িয়ে কিছু করার সাহস রাখেন। সচেতন ঝুঁকি আমাদের উন্নতির সিঁড়ি হয়ে উঠতে পারে। আমরা সবাই জীবনে কিছু পেতে চাই ভালো ক্যারিয়ার, ব্যবসায় সাফল্য, সুখের পরিবার, নিজের স্বপ্ন পূরণ। কিন্তু এইসব কিছু অর্জন করার পথে একটা বিষয় সবসময়ই বাধা হয়ে দাঁড়ায় ঝুঁকি। অনেকেই ঝুঁকি নিতে ভয় পান। ভাবেন, যদি ব্যর্থ হই? কিন্তু সত্যি কথা হলো। ঝুঁকি না নিলে আপনি কখনোই জানবেন না, আপনি কতদূর যেতে পারতেন। সুতরাং, আজ যদি আপনার সামনে একটি সুযোগ আসে, যেখানে ঝুঁকি রয়েছে মনে রাখবেন, সেটার সাথেই হয়তো আপনার সবচেয়ে বড় সাফল্যটি লুকিয়ে আছে। সাহস করুন, চিন্তা করুন, পরিকল্পনা করুন, ঝুঁকি নিন কারণ কথায় আছে নো রিস্ক নো গেইন।
ঝুঁকি কী এবং কেন?
ঝুঁকি হলো অনিশ্চয়তার সঙ্গে যুক্ত একটি পদক্ষেপ, যার ফলাফল অজানা। কোনো কাজে ঝাঁপিয়ে পড়লে তার ফলাফল সুখকরও হতে পারে, আবার হতাশাজনকও হতে পারে। তবে যদি আমরা শুধুই নিরাপদ পথে হাঁটি, তাহলে আমরা নিজেকে কখনোই বড় কিছু অর্জনের সুযোগ দিই না। আমাদের সমাজে “নিরাপদ খেলা” একটি প্রচলিত অভ্যাস অনেকেই শুধু সেই কাজগুলো করেন যার ফলাফল মোটামুটি নিশ্চিত।
কিন্তু ইতিহাস সাক্ষী, যারা বড় ঝুঁকি নিয়েছেন, তারাই বড় কিছু অর্জন করেছেন। উদাহরণস্বরূপ, থমাস এডিসন হাজারবার ব্যর্থ হয়েছেন একটি কার্যকরী বাতি আবিষ্কারের চেষ্টা করতে গিয়ে। স্টিভ জবস তার কোম্পানি থেকে ছাঁটাই হয়েছিলেন, কিন্তু আবার ফিরে এসে অ্যাপলকে বিশ্বের শীর্ষ ব্র্যান্ডে পরিণত করেন। এসব উদাহরণ প্রমাণ করে, ঝুঁকি গ্রহণ ব্যর্থতা আনতে পারে ঠিকই, তবে সে ব্যর্থতা ভবিষ্যতের সাফল্যের ভিত্তি হয়ে দাঁড়াতে পারে।
উদাহরণ: ধরুন, আপনি চাকরি ছেড়ে নিজের ছোট একটা ব্যবসা শুরু করতে চান। আপনি জানেন না ব্যবসা সফল হবে কি না। কিন্তু আপনি বিশ্বাস করেন আপনার আইডিয়া ভালো। এখানেই ঝুঁকির সৃষ্টি চাকরি ছেড়ে যদি ব্যর্থ হন, তবে আয় বন্ধ হয়ে যেতে পারে। কিন্তু যদি সফল হন, তাহলে আপনি হতে পারেন একজন সফল উদ্যোক্তা।
ব্যবসায় ঝুঁকির ভূমিকা:
ব্যবসা মানেই ঝুঁকি। একজন উদ্যোক্তা যখন একটি নতুন আইডিয়ায় বিনিয়োগ করেন, তখন তিনি নিশ্চিত জানেন না সেটি সফল হবে কি না। বাজারের চাহিদা, গ্রাহকের ব্যবহার, প্রতিযোগিতা, অর্থনৈতিক অবস্থা সবকিছু অনিশ্চিত। তবে সে ঝুঁকি না নিলে নতুন পণ্য তৈরি হতো না, নতুন চাকরির সুযোগ তৈরি হতো না, এবং সমাজ এগিয়ে যেত না।
বিশ্ববিখ্যাত কোম্পানিগুলো যেমন গুগল, অ্যামাজন বা ফেসবুক সবাই ঝুঁকি নিয়ে শুরু করেছিল। শুরুতে কেউ জানত না এই কোম্পানিগুলো একদিন বিশ্ব শাসন করবে। প্রতিষ্ঠাতারা হয়তো আরামদায়ক চাকরিতে জীবন কাটাতে পারতেন, কিন্তু তারা নিজের স্বপ্নের পেছনে ছুটে ঝুঁকি নিয়েছিলেন। আর সেই সাহসই আজ তাদের সফল করেছে।
ঝুঁকি ও ব্যর্থতা: একে অপরের পরিপূরক:
ঝুঁকি গ্রহণ মানেই সম্ভাব্য ব্যর্থতা। আর ব্যর্থতাকে আমরা সাধারণত নেতিবাচকভাবে দেখি। কিন্তু বাস্তবে ব্যর্থতা হলো শেখার শ্রেষ্ঠ মাধ্যম। একজন মানুষ যতবার ব্যর্থ হয়, সে ততবার বুঝতে পারে কীভাবে উন্নতি করা যায়। ব্যর্থতা আমাদের শেখায় ধৈর্য, সহনশীলতা ও নিজের ভুল থেকে শিক্ষা নেওয়ার মানসিকতা। যারা জীবনে সত্যিকার অর্থে সফল, তারা সবাই কমপক্ষে একবার বড় ব্যর্থতার সম্মুখীন হয়েছেন। কিন্তু তারা হাল ছাড়েননি, বারবার চেষ্টা করেছেন, এবং একদিন ঠিকই লক্ষ্যে পৌঁছেছেন।
ঝুঁকি নেওয়ার মানসিক প্রস্তুতি:
ঝুঁকি গ্রহণ করার জন্য মানসিকভাবে প্রস্তুত থাকা জরুরি। এজন্য কয়েকটি বিষয় মাথায় রাখা দরকার:
১. আত্মবিশ্বাস: আপনি যদি নিজের উপর বিশ্বাস না রাখেন, তাহলে অন্য কেউও রাখবে না। আত্মবিশ্বাস ঝুঁকি নেওয়ার প্রথম সোপান।
২. পর্যাপ্ত তথ্য ও বিশ্লেষণ ঝুঁকি নিতে হবে বুদ্ধিমত্তার সাথে। অন্ধভাবে ঝুঁকি নিলে ফলাফল নেতিবাচক হতে পারে। সঠিক তথ্য ও পরিস্থিতি বিশ্লেষণ করে সিদ্ধান্ত নিতে হবে।
৩. ব্যর্থতাকে গ্রহণ করার মানসিকতা: আপনি ব্যর্থ হতেই পারেন। তাই ব্যর্থতাকে গ্রহণ করার মতো মানসিকতা গড়ে তুলতে হবে।
৪. লক্ষ্য নির্ধারণ: ঝুঁকি যেন উদ্দেশ্যহীন না হয়। আপনাকে জানতে হবে কেন আপনি ঝুঁকি নিচ্ছেন, কী লাভ হবে, এবং কেমন পরিকল্পনা রয়েছে।
ব্যক্তিগত জীবনে ঝুঁকির প্রভাব:
শুধু ব্যবসা বা ক্যারিয়ার নয়, আমাদের ব্যক্তিগত জীবনেও ঝুঁকি নেওয়ার গুরুত্ব অপরিসীম। ধরুন আপনি কাউকে ভালোবাসেন, কিন্তু বলতে সাহস পাচ্ছেন না। আপনি যদি ঝুঁকি না নেন, হয়তো সেই মানুষটিকে সারাজীবন হারিয়ে ফেলবেন। আবার, যদি আপনি নিজের পছন্দের বিষয় পড়তে চান কিন্তু পরিবার অন্য কিছু চায় Ñ আপনি যদি নিজের জন্য না দাঁড়ান, তাহলে হয়তো সারাজীবন আফসোস করতে হবে। ঝুঁকি নেওয়া মানেই নিজেকে নিজের দায়িত্বে নেওয়া। সিদ্ধান্তে ভুল হতেই পারে, কিন্তু সেটা নিজের হবে এবং তাতেই আপনার উন্নতি হবে।
স্মার্ট ঝুঁকি কীভাবে নেবেন?:
অ্যানালাইসিস করুন: নিজের শক্তি, দুর্বলতা, সুযোগ ও হুমকি বিশ্লেষণ করুন।
ছাট শুরু করুন: বড় ঝুঁকি নেওয়ার আগে ছোট ছোট পদক্ষেপ নিন। এতে করে আপনি আস্তে আস্তে প্রস্তুত হবেন।
পরামর্শ নিন: অভিজ্ঞ মানুষদের পরামর্শ নিন। তাদের অভিজ্ঞতা থেকে শিখুন।
ব্যাকআপ প্ল্যান রাখুন: ঝুঁকি নেওয়ার আগে সব সময় একটা বিকল্প পরিকল্পনা রাখুন।
কেন ঝুঁকি নেওয়া দরকার?:
ঝুঁকি হলো এমন একটি সিদ্ধান্ত বা পদক্ষেপ, যার ফলাফল আপনি নিশ্চিতভাবে জানেন না। এটি ভালোও হতে পারে, খারাপও হতে পারে।
১. নতুন কিছু শিখতে হলে: আপনি যতক্ষণ না নতুন কিছুর চেষ্টা করবেন, ততক্ষণ শেখা সম্ভব নয়। ধরুন, আপনি কখনো জনসম্মুখে কথা বলেননি। হঠাৎ করে একটি প্রেজেন্টেশন দেওয়ার সুযোগ এল। আপনি যদি ভয়ে তা এড়িয়ে যান, তাহলে কখনোই ভালো বক্তা হতে পারবেন না।
২. সীমার বাইরে যেতে হলে: মানুষ সাধারণত পরিচিত এবং নিরাপদ জায়গার মধ্যে থাকতে পছন্দ করে। কিন্তু সফলতা আসে সেই সীমানা ছেড়ে বেরিয়ে এলে।
৩. সাফল্যের পথে এগোতে হলে: যারা জীবনে সত্যিই কিছু করেছেন, তারা প্রত্যেকেই ঝুঁকি নিয়েছেন। নিচে এমন কিছু বাস্তব উদাহরণ দেওয়া হলো।
বাস্তব উদাহরণ: সফল মানুষ ও তাদের ঝুঁকি:
১. জেকে রাউলিং: হ্যারি পটার সিরিজের লেখিকা। তিনি যখন প্রথম হ্যারি পটার বইটি লেখেন, তখন খুবই দুঃস্থ ছিলেন। বইটি প্রকাশ করার জন্য বহু প্রকাশনা সংস্থা তাকে প্রত্যাখ্যান করে। অনেকে বলেছিলেন, “এই গল্প কেউ পড়বে না।” কিন্তু তিনি হাল ছাড়েননি, ঝুঁকি নিয়েই চেষ্টা চালিয়ে যান।
ফলাফল?: আজকে হ্যারি পটার বিশ্বের অন্যতম জনপ্রিয় বই সিরিজ। তিনি এখন বিলিয়ন ডলারের মালিক।
২. ইলন মাস্ক:
টেসলা ও স্পেসএক্স প্রতিষ্ঠাতা। এক সময় তিনি নিজের সমস্ত অর্থ নতুন কোম্পানিতে বিনিয়োগ করেছিলেন। যদি ব্যর্থ হতেন, সবকিছু হারিয়ে যেত।
ফলাফল?: আজ তিনি বিশ্বের সবচেয়ে উদ্ভাবনী উদ্যোক্তাদের একজন।
৩. নাসিম (একজন গ্রাম্য কৃষক): বাংলাদেশের নাসিম একজন কৃষক। একসময় ধান চাষ করতেন। হঠাৎ করে সিদ্ধান্ত নেন মাশরুম চাষ শুরু করবেন। শুরুতে সবাই হাসাহাসি করেছিল, কারণ এলাকায় কেউ মাশরুম চিনতই না। কিন্তু সে সাহস করে ঝুঁকি নিলেন।
ফলাফল?: আজ নাসিম একজন সফল কৃষি উদ্যোক্তা। তার থেকে প্রশিক্ষণ নিচ্ছেন অনেকেই।
ঝুঁকি নেওয়ার আগে কী কী ভাবা দরকার?:
ঝুঁকি নেওয়া মানে অন্ধভাবে কিছু করে ফেলা নয়। কিছু বিষয় ভেবে ও পরিকল্পনা করে ঝুঁকি নিতে হয়। যেমন:
১. উদ্দেশ্য পরিষ্কার রাখা: আপনি কেন ঝুঁকি নিচ্ছেন? কী লাভ আশা করছেন? পরিষ্কার ধারণা থাকা দরকার।
২. পরিকল্পনা করা: যদি পরিকল্পনা ছাড়া ঝুঁকি নেন, সেটা বেশি বিপজ্জনক।
৩. তথ্য সংগ্রহ: সিদ্ধান্ত নেওয়ার আগে সেই বিষয় সম্পর্কে যতটা সম্ভব তথ্য জোগাড় করুন।
৪. বিকল্প পরিকল্পনা: যদি মূল পরিকল্পনা সফল না হয়, তাহলে কী করবেন? বিকল্প পরিকল্পনা থাকলে আপনি চাপমুক্ত থাকবেন।
ঝুঁকির ধরণ : কোনগুলো ভালো, কোনগুলো না।
সব ঝুঁকি এক নয়। কিছু ঝুঁকি হয় বুদ্ধিদীপ্ত ঝুঁকি যেগুলো সঠিকভাবে পরিকল্পনা করা হয়। আবার কিছু ঝুঁকি হয় অযৌক্তিক: যেমন না ভেবে বিনিয়োগ করা, বা কারো কথায় চালিত হয়ে কিছু করে ফেলা।
ভালো ঝুঁকি:
ক )নতুন দক্ষতা শেখার জন্য কোর্সে ভর্তি হওয়া
খ) নিজস্ব ব্যবসা শুরু করা (পরিকল্পনার সাথে)
গ) নিজের পছন্দের পেশা বেছে নেওয়া
খারাপ ঝুঁকি:
- না ভেবে টাকা লগ্নি করা
- কারো প্ররোচনায় কাজ করা
- অপরিচিত পন্থায় কনো কিছু না বুঝে হঠাৎ ঝাঁপিয়ে পড়া
ঝুঁকি নেওয়ার মানসিক বাধা কিভাবে দূর করবেন?:
১.ভয়ের মুখোমুখি হন: ভয় থাকবেই, কিন্তু তা আপনাকে থামিয়ে দিতে পারবে না যদি আপনি নিজের উপর আস্থা রাখেন।
২. ছোট ছোট পদক্ষেপ নিন: একেবারে বড় ঝুঁকি না নিয়ে, ছোট ছোট পরিবর্তন এনে শুরু করুন।
৩. সফলদের গল্প পড়ুন: যারা ঝুঁকি নিয়ে সফল হয়েছেন, তাদের গল্প পড়লে আপনি অনুপ্রাণিত হবেন।
৪. নিজেকে বলুন Ñআমি পারি এবং আমি অবশ্যই পাড়ব। আমাকে পারতেই হবে। বারবার নিজের মধ্যে ইতিবাচক বার্তা দিন।
শিক্ষার্থীদের জন্য উদাহরণ:
ধরুন একজন শিক্ষার্থী উচ্চমাধ্যমিক শেষে ইঞ্জিনিয়ারিং পড়তে চায়, কিন্তু পরিবার চায় সে মেডিকেলে পড়ুক। এখন যদি সে নিজের প্যাশনের পেছনে না যায়, তাহলে হয়তো সারাজীবন তার মনে আফসোস থেকে যাবে। এখানে ঝুঁকি হলো Ñ পরিবারকে না বলা, নিজের পথে চলা, কিন্তু পুরস্কার হলো – নিজের ভালো লাগা জিনিস নিয়ে পড়াশোনা করা এবং সফল ক্যারিয়ার গড়া। তাই পরিশেষে বলা যায় ঝুঁকি ছাড়া জীবনে বড় কিছু হয় না। নিরাপদে চলা ভালো, কিন্তু শুধু নিরাপদে চললে আপনি এক জায়গাতেই আটকে থাকবেন। সাফল্য, স্বাধীনতা, আত্মতৃপ্তি সবকিছুর পেছনে একটা ঝুঁকি থাকে।
সেই ঝুঁকি যদি আপনি পরিকল্পনা করে, সাহস নিয়ে গ্রহণ করতে পারেনÑ তাহলে ব্যর্থতা হলেও আপনি শিখবেন, আর সফলতা পেলে আপনি হবেন অনন্য। তাই Ñচষ্টা করুন, সাহস রাখুন, ঝুঁকি নিন এবং বিশ্বাস রাখুন আপনি সফল হবেনই। সব সময় মনে রাখবেন চেষ্টায় কী-না হয়।
