এম. হাসান
বর্তমান বিশ্বে ক্যারিয়ার শুধু জীবিকা অর্জনের একটি মাধ্যম নয়, এটি হয়ে উঠেছে আত্মপ্রকাশ, আত্মবিশ্বাস ও ব্যক্তিত্ব গঠনের একটি গুরুত্বপূর্ণ অংশ। প্রতিযোগিতামূলক এই যুগে সঠিক ক্যারিয়ার নির্বাচন, উন্নয়ন এবং টেকসই পরিকল্পনা তরুণ প্রজন্মের জন্য একটি বড় চ্যালেঞ্জ। প্রযুক্তি, বৈশ্বিক পরিবর্তন ও চাকরির বাজারে বৈচিত্র এনে দিয়েছে নানা সম্ভাবনা, আবার সঙ্গে এনেছে অনিশ্চয়তা।
একবিংশ শতাব্দীর কর্মসংস্থান-ভিত্তিক বাস্তবতায় ক্যারিয়ারের ধারণা প্রতিনিয়ত বদলে যাচ্ছে। তাই আজকের তরুণদের প্রয়োজন শুধুমাত্র ভালো ডিগ্রি নয়, প্রয়োজন ভবিষ্যতমুখী পরিকল্পনা, দক্ষতা অর্জনের আগ্রহ এবং নিজেকে মানিয়ে নেওয়ার ক্ষমতা। এই ফিচারটি তাদের জন্যই, যারা নিজের ভবিষ্যৎকে গড়ে তুলতে চায় সচেতনভাবে, আত্মবিশ্বাস নিয়ে।
১. ক্যারিয়ার একটি ম্যারাথন, স্প্রিন্ট নয়:
শান্ত মাথায় ভাবুন। আমরা যখন তরুণ থাকি তখন সাধারণত অধৈর্য থাকি। বয়স বাড়ার সঙ্গে সঙ্গে আপনি বুঝতে পারবেন যে আসলে কোনো তাড়াহুড়োর দরকার নেই। জীবন এবং সেই ক্যারিয়ার যা আমরা জীবন কাটাতে এবং বিল পরিশোধ করতে অনুসরণ করি, সেটিকে দীর্ঘমেয়াদী ভিত্তিতে গ্রহণ করা উচিত। যদি আপনি দৌড়াতে থাকেন তবে আপনি ক্লান্ত হয়ে পড়বেন বা এমন কাজের প্রতি বিরক্ত হয়ে যাবেন যেটি একসময় আপনি উপভোগ করতেন। নিজেকে একটু সময় দিন শ্বাস নেওয়ার এবং বেড়ে ওঠার জন্য। যদি আপনি কঠোর পরিশ্রম করেন এবং নিজেকে দক্ষ হতে সময় দেন, তবে সাফল্য ঠিকই আসবে। সবসময় তাড়াহুড়ো করলে আপনি শুধু শূন্যতা আর ক্লান্তি পাবেন। মাঝে মাঝে নিজের অনুমতি দিন ধীর গতির লেনে চলার জন্য। আপনি তখন এমন জিনিস দেখবেন যেগুলো আগে দেখেননি।
২. বেশিরভাগ সাফল্য আসে পুনরাবৃত্তি থেকে, নতুন কিছু থেকে নয়:
ম্যালকম গ্ল্যাডওয়েলের অসাধারণ বই ঙঁঃষরবৎং- এ বলা হয়েছে যে, কোনো বিষয়ে সত্যিকারের দক্ষ হতে হলে আপনাকে সেটিতে ১০,০০০ ঘণ্টা ব্যয় করতে হবে। এটি প্রযোজ্য ছিল বিটলসদের হামবুর্গ গিগস এবং বিল গেটসের ক্ষেত্রেও, যিনি একাধিক সৌভাগ্যজনক দুর্ঘটনার মাধ্যমে অন্য যেকোনো মানুষের তুলনায় অনেক বেশি সময় কম্পিউটারের সামনে কাটাতে পেরেছিলেন। এখানে শিক্ষা হলো: আপনি যতক্ষণ না কোনো বিষয়ে দক্ষ হচ্ছেন, ততক্ষণ নতুন কিছুতে যাওয়ার চেষ্টা করবেন না। প্রকৃত দক্ষতা একটি এলিট গোষ্ঠীর মধ্যে সীমাবদ্ধ। তাদের প্রায় কারোরই কোনো অতিমানবীয় ক্ষমতা নেই। তাদের থাকে ধৈর্য, সহনশীলতা এবং দীর্ঘমেয়াদী দৃষ্টিভঙ্গি। তারা তাদের কাজকে ভালোবাসে। আপনি যদি এমন কিছু খুঁজে পান, তা কখনো ছেড়ে দেবেন না।
৩. যদি কাজ এতটাই দারুণ হতো, তাহলে সব ধনী মানুষ নিজেরাই চাকরি করতো:
এটি সুপ্রতিষ্ঠিত যে মৃত্যুশয্যায় প্রায় কেউই আফসোস করে না যে সে অফিসে যথেষ্ট সময় কাটাতে পারেনি। এটা একেবারেই পরিষ্কার। কাজ গুরুত্বপূর্ণ, কিন্তু সেটাই সবকিছু নয়। খুব সহজেই আপনি দৃষ্টিভঙ্গি হারাতে পারেন এবং কিছু তুলনামূলকভাবে তুচ্ছ “জরুরি” বিষয়ে ব্যস্ত থেকে গুরুত্বপূর্ণ জীবনের ঘটনাগুলো মিস করতে পারেন। আমি এখনো মনে করতে পারি আমার বাচ্চাদের জীবনের প্রতিটি বড় মুহূর্ত যা আমি মিস করেছি। আমি কিন্তু একটিও কারণ মনে করতে পারি না যে কেন আমি সেগুলো মিস করেছিলাম।
৪. যখন আপনার সন্তানরা ছোট, তখন আপনার ক্যারিয়ারকে গৌণ করে ফেলুন:
বিশ্ব বিখ্যাত এক সফল ব্যক্তি বলেছেন, আপনার যদি দক্ষতা, অঙ্গীকার এবং আবেগ থাকে, তাহলে দীর্ঘমেয়াদে ক্যারিয়ার নিজে থেকেই সামলে যাবে। সামগ্রিকভাবে, এটা মোটেই গুরুত্বপূর্ণ নয় যে কয়েক বছর আপনার ক্যারিয়ার ধীরগতিতে চলে যদি আপনি সেই সময়টা আপনার ছোট সন্তানদের জন্য বরাদ্দ করেন। আমি আমার ছোট বাচ্চাদের পুরোনো ভিডিও দেখছিলাম, এবং আবার অনুভব করলাম, ভিডিওতে থাকা সেই ছোট্ট মানুষগুলো এখন আর নেই। তারা এখন গর্ব করার মতো প্রাপ্তবয়স্কে পরিণত হয়েছে, কিন্তু সেই বিস্ময়ভরা চোখের ছোট মানুষগুলো ছিল খুবই ক্ষণস্থায়ী। যদি আপনি সেই সময়টা ডেডলাইন আর রিপোর্ট নিয়ে মিস করেন, সেটা আর কখনো ফিরে পাবেন না। শৈশব ক্ষণিকের। যখন সেটা গঠনমূলক পর্যায়ে থাকে, আপনি সুযোগ পান একবারই। আপনি শেখার সুযোগও হারাতে পারেন। সন্তানরা আপনাকে যতটা শেখায়, আপনি তাদের ততটা শেখাতে পারেন না। তাদের চোখ দিয়ে আপনি আবার নতুনভাবে দুনিয়া দেখতে পারেন। এবং আপনি বিস্মিত হবেন যে জীবনের কোলাহলে আপনি কী কী মিস করছেন। যতদিন পারেন সেই সময়টা ধরে রাখুন। “আপনি বালির উপর একটি ঢেউকে ধরে রাখতে পারবেন না।” এবং আপনি যদি সেটা করার চেষ্টা করেন, দেখতে হাস্যকর লাগবে।
৫. কর্মজীবনে সবসময় নিজেকে ৩৫ বছর বয়সী হিসেবে উপস্থাপন করো:
কর্মস্থলে তরুণ অবস্থায় নিজেকে যেন নতুন বা নবীন মনে করবেন না। যদি আপনি বুদ্ধিমান এবং দক্ষ হন, তাহলে আপনি যা পারেন তা পরিপক্বভাবে করুন। তেমনিভাবে, যদি আপনি বয়সে প্রবীণও হন, তাহলে তেমন আচরণ করবেন না। প্রতিদিনের কাজ শুরু করুন তরুণদের মতো উদ্যম নিয়ে।
৬. ব্যবস্থাপনা হলো মানুষের, জিনিসপত্রের নয়:
আমরা সহজেই এই ভুল ধারণায় পড়ে যাই যে সব মানুষ সমান, প্রতিদিন একইভাবে আচরণ করে এবং তাদের কর্মক্ষমতা একই রকম। মানুষ তেমনভাবে তৈরি হয়নি। ব্যবসায়িক গুরু জ্যাক ওয়েলচ বলেন, কর্মী বাহিনীর মধ্যে ২০ শতাংশ মানুষ অত্যন্ত দক্ষ, ১০ শতাংশকে বাদ দেওয়া উচিত এবং ৭০ শতাংশ সাধারণ মানের কাজ করে। সমস্যা হচ্ছে এই ৭০ শতাংশকে নিয়ে। বেশিরভাগ ম্যানেজার চায় সবাই যেন সেই ২০ শতাংশে পড়ে। কিন্তু আমাদের সাবধান থাকতে হবে যেন ৭০ শতাংশকে অবমূল্যায়ন না করি। কখনও কখনও আমাদের গড়পড়তা দক্ষতারও প্রশংসা করতে হয়, শুধু সেরা পারফর্মারদের নয়। ব্যবস্থাপক হিসেবে আমরা জিনিস নয়, মানুষ পরিচালনা করি এবং তাদের যে গুণাবলী আছে, া সর্বোত্তমভাবে ব্যবহার করার চেষ্টা করি।
৭. অন্যদের সত্যিকারের কথা শোন ও শিখা :
নিজেকে সবজান্তা ভাবা খুব সহজ। কিন্তু আমরা একা সব জানি না। দলগতভাবে আমরা অনেক বেশি শক্তিশালী। আমাদের শেখা উচিত সত্যিকারের সহযোগিতা কী এবং অন্যদের মতামত কীভাবে গুরুত্ব দিয়ে শোনা যায়। এবং আমাদের উচিত প্রথমে নিজেদের কর্মীদের কথাই শোনা। অনেক ম্যানেজার ও প্রতিষ্ঠান বাইরের কাউকে প্রশ্ন করে সমাধান খোঁজে, তারপর সেই সুপারিশগুলো বাস্তবায়ন করতে চায় অভ্যন্তরীণ কর্মীদের সম্মতি ছাড়াই। অথচ প্রায় সব ক্ষেত্রেই, আমাদের নিজেদের মানুষজনই সমস্যার সমাধান জানে। পরিচিতজনদের মূল্যায়নে ব্যর্থ হলে আমরা চারপাশে থাকা প্রতিভাকে হারিয়ে ফেলি।
৮. খারাপ বসদের অধীনে কখনো কাজ কোরবেন না:
জীবন খুবই ছোট। তাই খারাপ বস সহ্য করবেন না। যদি দেখেন আপনার বস একজন বাজে মানুষ, তাহলে নতুন চাকরির খোঁজে নামুন। সঙ্গে সঙ্গেই। এভাবেই সেই খারাপ বসকে আপনার জীবন থেকে ‘ছাঁটাই’ করুন চাকরি ছেড়ে দিয়ে। নতুন চাকরি পেয়ে সেই খারাপ বসকে ছাটাইয়ের ব্যবস্থা করুন।
৯. বুঝতে শিখুন যে কর্মীরাও মানুষ এবং তাদের আবেগগত ক্ষমতা সীমিত:
মানুষের আবেগগত সহনশীলতা সীমিত। যদি তাদের ব্যক্তিগত জীবনে কোনো চ্যালেঞ্জ থাকে, তাহলে কর্মক্ষেত্রের চাপ নেওয়ার তাদের ক্ষমতা কমে যায়। যতবারই কর্মীদের হঠাৎ কর্মদক্ষতা হ্রাস পেতে দেখলে, প্রায় সবক্ষেত্রেই সেটা কর্মস্থলের কারণে নয়। যখন ভালো মানুষদের ব্যক্তিগত সমস্যা হয়, তখন তাদের পাশে থাকা উচিত। এটা হওয়া উচিত আমাদের ব্যক্তিগত দায়িত্ব। আমরা যদি মানুষকে তাদের দুর্বল সময়ে সহায়তা করি, তাহলে আমরা একটি শক্তিশালী সমাজ গড়ে তুলতে পারি এবং তাদের এমনভাবে ক্ষমতায়িত করতে পারি যা তরুণ বয়সে কল্পনা করাও কঠিন। একজন ভেঙে পড়া কিন্তু নতুন উদ্যমে ফিরিয়ে আনা কর্মী একটি প্রতিষ্ঠানের সবচেয়ে শক্তিশালী সম্পদে পরিণত হতে পারে। এটা এনার্জি ডিঙ্কের মতো কাজ করবে।
১০. শুধু নিজের বয়সীদের সঙ্গে নয়, সকল বয়সীদের সঙ্গে নেটওয়ার্ক গড়ে তুলুন:
‘হুইজ কিড’ বা তরুণ প্রতিভাদের প্রবণতা হলো তাদের মতো অন্য তরুণদের সঙ্গে গ্রুপ তৈরি করা এবং একে অন্যের থেকে অনুপ্রাণিত হওয়া। বয়স্কদের দৃষ্টিতে তারা “উজ্জ্বল তরুণ” হিসেবে বিবেচিত হয়, যা ভবিষ্যতের জন্য আশাবাদী করে তোলে। আরে বাবা! কতবার শুনেছেন এমন কথা? কিন্তু এই ধরনের তরুণ গোষ্ঠী আসলে সীমাবদ্ধ। স্মার্ট ২০-এর দশকের মানুষদের উচিত বয়স্কদের সঙ্গেও নেটওয়ার্ক গড়ে তোলা। আসলে, তাদের নেটওয়ার্কিংয়ের মূল উদ্দেশ্য হওয়া উচিত মেন্টর এবং ক্যারিয়ার গাইড খোঁজা যারা দরজা খুলে দিতে পারবে এবং ক্যারিয়ারকে ত্বরান্বিত করতে পারবে। একইভাবে, অভিজ্ঞ ও সফল বয়স্কদের উচিত নয় শুধু পুরোনো ক্লাবে বসে ১৯৭০-এর গল্প বলা। তাদেরও উচিত স্মার্ট তরুণদের সন্ধান করা, যারা তাদের চিন্তার জগৎ ভাঙতে সাহায্য করবে।
১১. কর্মক্ষেত্রে সংস্কৃতিগত ভিন্নতাকে উদযাপন করুন:
আমরা অধিাকাংশ মানুষই প্রায়ই একটি বড় ভুল করি, তা হলো বিদেশি অভিজ্ঞতা ও বিভিন্ন সংস্কৃতির মানুষদের যথাযথ মূল্যায়ন না করা। বৈচিত্র আমাদের কর্মক্ষেত্রে একটি গভীর সমৃদ্ধি নিয়ে আসে যা আমাদের সবাইকে উপকৃত করে। বিদেশি অভিজ্ঞতা মানেই বাস্তব অভিজ্ঞতা। আমাদের উচিত প্রতিটি সুযোগ কাজে লাগানো যাতে নতুন চিন্তা-ভাবনা কর্মক্ষেত্রে প্রবেশ করতে পারে। এখান থেকেই শুরু হয় জাদু।
১২. সময় দিন বোঝার জন্য যে আপনার প্রতিষ্ঠান আসলে কী করে:
খুব পছন্দের একটি গল্প। সেই গল্পটা যেখানে মার্কিন প্রেসিডেন্ট জন এফ কেনেডি নাসা পরিদর্শনে গিয়ে একজন ঝাড়ুদারকে জিজ্ঞেস করেছিলেন, তোমার কাজ কী? সে উত্তর দিয়েছিল, ‘আমি চাঁদে রকেট পাঠাই। আমাদের প্রত্যেকের উচিত নিজেকে প্রতিষ্ঠানটির অংশ হিসেবে দেখা এবং সংস্থার মূল লক্ষ্য ও উদ্দেশ্যের সঙ্গে নিজেকে যুক্ত রাখা।
১৩. বিদেশে কাজ করার ইচ্ছা থাকলে দেরি করবেন না:
ভৌগোলিক সীমা এখন তেমন গুরুত্বপূর্ণ নয়। আমরা সবাই এখন বৈশ্বিক নাগরিক। প্রেসিডেন্ট ওবামা ইউনিভার্সিটি অফ কুইন্সল্যান্ডে বলেছিলেন যে, বিশ্ব আরও ছোট হয়ে যাচ্ছে, এমনকি প্রশান্ত মহাসাগর এখন শুধুই একটা হ্রদের মতো। যদি বিদেশে কাজ করার সুযোগ আসে এবং আপনি সেটা চান, তাহলে সুযোগটা নিয়ে নিন। দেরি করবেন না যে আরও পরে যাব। পরে করব। কখনোই “ঠিক সময়” আসবে না। আর আমরা সাধারণত যেসব কাজ করি না, সেগুলো নিয়েই সবচেয়ে বেশি আফসোস করি।
১৪. পছন্দের কাজ করে পছন্দের মানুষদের সঙ্গে করার চেষ্টা করুন :
আপনি কাজের জায়গায় অনেক সময় কাটাবে। তাই এমন লোকজনের সঙ্গে কাজ করুন যাদের আপনি পছন্দ করেন। অনেকে ভাবেনÑকর্মী সন্তুষ্টি জরিপে ‘আপনার কি কর্মস্থলে কোনো ‘সেরা বন্ধু’ আছে?’ এই প্রশ্নটা নিরর্থক। আদতে বাস্তবতা এই যে, কাজ অনেক বেশি আনন্দদায়ক হয় যদি সেটা বন্ধুদের সঙ্গে করা যায়। সবচেয়ে খুশি মানুষ তারা, যারা তাদের পছন্দের কাজ করে পছন্দের লোকদের সঙ্গে। এর পাশাপাশি, যদি বুঝেন যে আপনি একটা চাকরি নিয়ে ফেলেছেন যেটা আপনি ঘৃণা করেতেন তা হলে সেটা দ্রুত ছেড়ে দিন। কিছু ভুল পথে চলা বা ছোটখাটো ভুল আপনার ক্যারিয়ার নষ্ট করবে না।
১৫. কখনোই নিজের নৈতিকতা কাজের কারণে বিসর্জন দিবেন না:
কর্মক্ষেত্রে সুখের মূল চাবিকাঠি হলো ব্যক্তিগত মূল্যবোধের সঙ্গে প্রতিষ্ঠানের মানসিক মিল। যদি এমন জায়গায় কাজ করেন যেখানে অপনার নৈতিকতা ও মূল্যবোধের সঙ্গে সংঘর্ষ হয়, তাহলে যত তাড়াতাড়ি সম্ভব সেখান থেকে বেরিয়ে আসুন। ভালো মানুষ সবসময়ই অস্বস্তি অনুভব করে যখন কিছু “ঠিক” না মনে হয়। যদি মনে হয় কিছু ঠিক নয়, তাহলে সেটা সম্ভবত সত্যিই ঠিক নয়। খারাপ জিনিস তখনই ঘটতে থাকে যখন ভালো মানুষরা কিছু বলে না।
১৬. বুঝে নিন যে ব্যর্থতা মানেই হার নয়, এটা শেখার অংশ:
অদ্ভুত শোনালেও, ব্যর্থ হওয়া মানেই ব্যর্থতা নয়। গবেষকরা মনে করেনÑ ব্যর্থতা আসলে একটি প্রক্রিয়া, যার মাধ্যমে অকার্যকর বিকল্পগুলো বাদ দেওয়া হয়। টয় স্টোরির উডিকে ভুলভাবে উদ্ধৃত করলে বলা যায় কিছু ভুল করলে আমরা হারছি না। জীবনে আমরা প্রত্যেকে কমবেশি ব্যর্থতার মুখোমুখি হই। ছোট একটি পরীক্ষায় ফেল করা থেকে শুরু করে কোনো চাকরির ইন্টারভিউতে সফল না হওয়া, ব্যবসায় ক্ষতি, কিংবা ব্যক্তিগত জীবনের ভাঙন এসবই আমাদের জীবনের বাস্তবতা। তবে প্রশ্ন হলো, আমরা ব্যর্থতাকে কীভাবে দেখি? অনেকেই ব্যর্থতাকে চূড়ান্ত পরাজয় হিসেবে দেখে হতাশ হয়ে পড়েন। কিন্তু প্রকৃত সত্য হলো Ñব্যর্থতা কখনোই শেষ নয়, এটি শেখার একটি অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ ধাপ।
শেখার প্রক্রিয়ায় ব্যর্থতা একটি স্বাভাবিক ও প্রাকৃতিক অংশ। একটি শিশু হাঁটতে শেখার সময় কতবার পড়ে যায়! তবুও সে চেষ্টা চালিয়ে যায়, কারণ সে জানে না যে পড়ে যাওয়া খারাপ কিছু। বরং সে ধীরে ধীরে শিখে ফেলে কীভাবে নিজেকে ভারসাম্য রাখতে হয়। আমাদের বড় হয়ে যাওয়ার পর, সমাজ আমাদের শেখায় যে ব্যর্থতা মানেই ব্যর্থ মানুষ। অথচ এই ধারণাই আমাদের আত্মবিশ্বাস ধ্বংস করে দেয়।
ব্যর্থতা আসলে আমাদের চোখে আঙুল দিয়ে দেখিয়ে দেয় কোথায় আমাদের দুর্বলতা আছে, কোথায় উন্নতির প্রয়োজন। এটা হলো একটি আয়নার মতো, যা আমাদের সঠিক প্রতিফলন দেখায়। উদাহরণ হিসেবে বলা যায় থমাস এডিসনের কথা, যিনি হাজারো বার ব্যর্থ হওয়ার পর বৈদ্যুতিক বাতি আবিষ্কার করেছিলেন। তিনি বলেছিলেন, “আমি ব্যর্থ হইনি। আমি শুধু ১০,০০০টি পদ্ধতি খুঁজে পেয়েছি যেগুলো কাজ করে না।” এই মনোভাবই সফলতা অর্জনের চাবিকাঠি। ব্যর্থতা আমাদের বিনয়ী করে তোলে। এটি আমাদের শেখায় যে আমরা সবকিছু জানি না এবং আমাদের আরও শেখার প্রয়োজন আছে। এটি আমাদের আত্মবিশ্লেষণ করতে বাধ্য করে এবং নিজেদের দুর্বলতা ও সীমাবদ্ধতা চিনতে সাহায্য করে। একজন প্রকৃত শিক্ষার্থী কখনোই ব্যর্থতা থেকে পালায় না, বরং সেটিকে গ্রহণ করে এবং পরবর্তীবার ভালো করার জন্য প্রস্তুতি নেয়।
আরও গুরুত্বপূর্ণ বিষয় হলো ব্যর্থতা আমাদের মানসিক শক্তি বৃদ্ধি করে। আমরা যখন কোনো চ্যালেঞ্জে হেরে যাই, তখন আমাদের সামনে দুটি পথ থাকে: এক, হাল ছেড়ে দেওয়া; দুই, নতুন উদ্যমে উঠে দাঁড়ানো। যারা দ্বিতীয় পথ বেছে নেয়, তারাই ভবিষ্যতে সফল হয়। বিশ্বজুড়ে যত সফল উদ্যোক্তা, নেতা, বিজ্ঞানী, শিল্পী রয়েছেন, তাদের জীবনের গল্পে আপনি বারবার ব্যর্থতার ছায়া দেখতে পাবেন। কিন্তু তারা একবারও থেমে যাননি।
শক্ষা ও কর্মজীবনেও ব্যর্থতা একটি বড় শিক্ষক। একজন ছাত্র যদি কোনো বিষয়ে খারাপ ফল করে, সেটি যদি সে বিশ্লেষণ করে এবং ভবিষ্যতে কীভাবে উন্নতি করা যায় তা ঠিক করে নেয়, তবে সেটি তার জন্য একটি শেখার সুযোগ হয়ে দাঁড়ায়। আবার চাকরির ইন্টারভিউতে ব্যর্থ হলে কেউ যদি বুঝতে পারে কোথায় তার প্রস্তুতির ঘাটতি ছিল, তাহলে সে ভবিষ্যতে আরও ভালো করতে পারবে।
ব্যর্থতা একটি সুযোগ, যা আমাদের নতুন করে ভাবতে শেখায়। এটি সৃজনশীলতাকে উস্কে দেয়, নতুন পথ খুঁজে বের করতে বাধ্য করে। আমরা তখন একঘেয়ে পথ ছেড়ে বিকল্প সমাধানের দিকে চোখ ফেরাই। অনেক সময়, ব্যর্থতার কারণেই আমরা এমন কিছু সৃষ্টি করি, যা হয়তো সফল হলে হতো না। সবশেষে বলা যায়, ব্যর্থতাকে ভয় পাওয়ার কিছু নেই। বরং এটি হলো সেই সিঁড়ি, যার ধাপে ধাপে উঠেই আমরা সফলতার চূড়ায় পৌঁছাই। যদি আমরা ব্যর্থতাকে শুধুই হতাশার প্রতীক হিসেবে দেখি, তাহলে আমরা তার অন্তর্নিহিত শিক্ষাটুকু হারিয়ে ফেলি। কিন্তু যদি আমরা এটিকে গ্রহণ করি, বুঝতে পারি, এবং তা থেকে শিখি, তাহলে ব্যর্থতাই হয়ে ওঠে আমাদের সবচেয়ে বড় শক্তি। তাই এক কথায় বলা যায় ‘ব্যর্থ হওয়া মানেই থেমে যাওয়া নয়; বরং শেখা, বেড়ে ওঠা এবং আবার নতুনভাবে শুরু করার সুযোগ।’
