মুক্তদেশ ডেস্ক: পার্শ্ববর্তী দেশগুলো থেকে বাংলাদেশে গবাদিপশুর অনিয়ন্ত্রিত প্রবেশের পাশাপাশি যথাযথ ভ্যাকসিন পরিবহন এবং কুলচেইন অবকাঠামোর সঠিক ব্যবস্থাপনা হচ্ছে না। এতে ভ্যাকসিনের কার্যকারিতা কমার ঝুঁকি তৈরি হচ্ছে। মানসম্মত এফএমডি ভ্যাকসিন কিনতে না পারলে দেশে নতুন ধরনের এফএমডি ভাইরাস ছড়িয়ে পড়ার আশঙ্কা রয়েছে বলে মনে করছে সরকারের বাস্তবায়ন পরিবীক্ষণ ও মূল্যায়ন বিভাগ (আইএমইডি)। প্রতিষ্ঠানটি সম্প্রতি পিপিআর রোগ নির্মূল এবং ক্ষুরারোগ নিয়ন্ত্রণ প্রকল্পের ওপর প্রতিবেদন
প্রকাশ করে। এতে দেখা যায়, আগে ও পরে ভ্যাকসিনের মূল্যায়ন না করা; ইউনিয়ন পর্যায়ে নিয়মিতভাবে ভ্যাকসিনেটর না থাকা; সার্বক্ষণিক তদারকির জন্য জনবলের অপর্যাপ্ততা; প্রকল্প বাস্তবায়নে দীর্ঘসূত্রতা এবং প্রকল্প গ্রহণের পূর্বে কারিগরি দিকসমূহ সঠিকভাবে অন্তর্ভুক্ত না রাখা এ প্রকল্পের অন্যতম দুর্বল দিক।
প্রকল্প বাস্তবায়নকারী প্রতিষ্ঠান প্রাণিসম্পদ অধিদপ্তর বলছে, প্রাণিসম্পদ বাংলাদেশের কৃষি অর্থনীতির একটি গুরুত্বপূর্ণ উপাদান। দেশের ৭৫ শতাংশের বেশি কৃষক ক্ষুদ্র ও প্রান্তিক ভূমি মালিক হওয়ায় তারা জীবিকা নির্বাহের জন্য সম্পূরক আয় বাড়াতে গবাদিপ্রাণীর ওপর ব্যাপকভাবে নির্ভরশীল। অধিকাংশ গবাদিপ্রাণী বিভিন্ন রোগের প্রবণতার প্রতি সংবেদনশীল। রোগের সংক্রমণ ও পুনঃসংক্রমণ হওয়া পশুপালনের জন্য একটি প্রধান উদ্বেগের বিষয়। প্রতিবছর প্রায়
১৫ শতাংশ পশু বিভিন্ন রোগে মারা যায়। এতে পশু পালনকারীদের ব্যাপক অর্থনৈতিক ক্ষতি হয়। এ রোগগুলোর মধ্যে পেস্টে ডি পেটিস রুমিন্যান্টস (পিপিআর) এবং এফএমডি অর্থনৈতিক দিক থেকে মারাত্মক রোগ। এ জন্য মৎস্য ও প্রাণিসম্পদ মন্ত্রণালয়ের অধীনে প্রাণিসম্পদ অধিদপ্তর ‘পিপিআর রোগ নির্মূল এবং ক্ষুরারোগ নিয়ন্ত্রণ প্রকল্প’ হাতে নেয়। ৩৪৫ কোটি ২ লাখ ৯৯ হাজার টাকা প্রাক্কলিত ব্যয়ে ২০১৯ সালের ১ জানুয়ারি থেকে ২০২২ সালের ডিসেম্বর পর্যন্ত মেয়াদে বাস্তবায়নের জন্য ২০১৯ সালের এপ্রিলে একনেক এটি অনুমোদন দেয়। এর পর প্রকল্পটিতে দুইবার সংশোধন করা হয়।
প্রকল্পের উদ্দেশ্য, দেশব্যাপী ভ্যাকসিন সরবরাহ ও ব্যবহার নিশ্চিতের মাধ্যমে পিপিআর রোগটি নির্মূল করা, পিপিআর ভ্যাকসিন উৎপাদনে প্রাণিসম্পদ গবেষণা প্রতিষ্ঠানের (এলআরআই) সক্ষমতা বৃদ্ধি, নির্বাচিত এলাকায় এফএমডি ভ্যাকসিন সরবরাহ ও ব্যবস্থাপনার মাধ্যমে এফএমডি ফ্রি জোন তৈরি করে গবাদিপ্রাণীর ক্ষুরারোগ নিয়ন্ত্রণ এবং প্রাপ্ত ফলাফলের ভিত্তিতে পরে রোগটি নিয়ন্ত্রণে দেশব্যাপী কার্যক্রম গ্রহণ করা।
সার্বিক বিষয় জানতে চাইলে প্রকল্প পরিচালক ডা. অমর জ্যোতি চাকমা কথা বলতে রাজি হননি।
আইএমইডি বলছে, চলমান প্রকল্পের নিবিড় পরিবীক্ষণ সমীক্ষার জন্য দুই ধরনের নমুনা সংগ্রহ পদ্ধতি; সংখ্যাগত ও গুণগত বিশ্লেষণ পদ্ধতি ব্যবহৃত হয়েছে। সংখ্যাগত বিশ্লেষণের উদ্দেশ্যে ৬৪ জেলা হতে ৯৬০ জন উপকারভোগীর সরাসরি সাক্ষাৎকার গ্রহণ করা হয়েছে। গুণগত বিশ্লেষণের অংশ হিসেবে ১৬টি এফজিডি, ৪৫ জন মুখ্য ব্যক্তির সাক্ষাৎকার এবং ৮টি কেস স্টাডি করা হয়েছে। নিবিড় পরিবীক্ষণ সমীক্ষার অধীনে প্রকল্প পরিচালকের সহায়তায় সিডিআইএলের মাধ্যমে দেশের ৪টি অঞ্চল থেকে (ঢাকা-২১, বান্দরবান-২০, রাজশাহী-২২ ও যশোর-২১) মোট ৮৪টি নমুনার (নমুনা এলাকা থেকে সংগৃহীত ছাগল ও ভেড়ার রক্তের নমুনা) সেরোলজিক্যাল টেস্ট (রোগপ্রতিরোধ ক্ষমতা পরীক্ষা) করা হয়।
অর্থবছরভিত্তিক প্রকল্পের আর্থিক বরাদ্দ, অর্থ ছাড় ও ব্যয় পর্যালোচনা করে দেখা যায়, বছরভিত্তিক এডিপির বরাদ্দ অনুযায়ী অর্থ ছাড় করা হয়েছে। এপ্রিল-২০২৫ পর্যন্ত প্রকল্পটিতে মোট ব্যয় হয়েছে ১৮১ কোটি ২৭ লাখ ৪৩ হাজার টাকা। অন্যদিকে প্রকল্পের ভৌত কার্যক্রমের অগ্রগতি হয়েছে প্রায় ৫৭.৫০ শতাংশ। প্রকল্পের ক্রয় কার্যক্রম পর্যালোচনায় দেখা যায়, মোট ১৭টি প্যাকেজের মাধ্যমে পণ্য, ২টি প্যাকেজের মাধ্যমে কার্য এবং ৩টি প্যাকেজের মাধ্যমে সেবা ক্রয় কার্যক্রম শেষ হয়েছে। প্রকল্পের শুরু থেকে নিবিড় পরিবীক্ষণ সমীক্ষা পর্যন্ত মোট তিন অর্থবছরে অডিট শেষ হয়েছে, যেখানে মোট ৭টি অডিট আপত্তি রয়েছে। আপত্তিগুলোর কোনোটাই নিবিড় পরিবীক্ষণ সমীক্ষা পর্যন্ত নিষ্পত্তি করা হয়নি।
প্রকল্পের সবল দিকগুলোর মধ্যে উল্লেখযোগ্য হচ্ছে- ভ্যাকসিন সংগ্রহ, সংরক্ষণ, বিতরণ ও দেওয়ার জন্য অবকাঠামোর উন্নয়ন; গবাদিপ্রাণীত পিপিআর এবং ক্ষুরারোগের প্রাদুর্ভাব হ্রাস পাওয়া; গবাদিপ্রাণী থেকে খামারিদের আয় বৃদ্ধি; এলআরআইয়ে পিপিআরের ভ্যাকসিন উৎপাদনের সক্ষমতা বৃদ্ধি এবং স্থানীয় পর্যায়ে ব্যাপক প্রচার।
প্রকল্পের কার্যক্রমের ফলে সৃষ্ট সুযোগগুলো হচ্ছে- ছাগল, ভেড়া, গরু ও মহিষের খামারের সংখ্যা বৃদ্ধির সুযোগ; এলআরআইয়ের সক্ষমতা বৃদ্ধির মাধ্যমে পিপিআর ভ্যাকসিন উৎপাদনের সুযোগ সৃষ্টি এবং এলআরআইয়ের সক্ষমতা বৃদ্ধির মাধ্যমে এফএমডি ভ্যাকসিন উৎপাদনের সম্ভাবনা রয়েছে। প্রকল্পের জন্য ঝুঁকিপূর্ণ দিকসমূহ হলো- পার্শ্ববর্তী দেশগুলো থেকে গবাদিপ্রাণীর অনিয়ন্ত্রিত প্রবেশ; যথাযথ ভ্যাকসিন পরিবহন এবং কুলচেইন অবকাঠামো সঠিকভাবে ব্যবস্থাপনা না করলে ভ্যাকসিনের কার্যকারিতা কমার ঝুঁকি এবং মানসম্মত এফএমডি ভ্যাকসিন কিনতে না পারলে নতুন ধরনের এফএমডি ভাইরাস দেশে ছড়িয়ে পড়ার শঙ্কা রয়েছে।
প্রকল্পটি দেশব্যাপী ছাগল ও ভেড়ায় পিপিআর ভ্যাকসিনেশন এবং ভোলা, মানিকগঞ্জ, সিরাজগঞ্জ ও পাবনা জেলায় গরু-মহিষে এফএমডি ভ্যাকসিন দেওয়ার মাধ্যমে প্রাণিসম্পদের উৎপাদন বৃদ্ধির লক্ষ্যে বাস্তবায়িত হচ্ছে। প্রকল্পের ৫৭.৫০ শতাংশ অগ্রগতি অর্জিত হলেও এফএমডি ভ্যাকসিন ক্রয়ে বিলম্ব, ফ্রিজড্রায়ার ক্রয় না করা, গবেষণা প্রতিষ্ঠান বিএলআরআইয়ের সঙ্গে সমন্বয়হীনতা এবং প্রি-পোস্ট ভ্যাকসিন মূল্যায়নের ব্যবস্থা না থাকায় চ্যালেঞ্জ সৃষ্টি হয়েছে। প্রকল্পের সাফল্য হিসেবে এলআরআইয়ের বার্ষিক পিপিআর ভ্যাকসিন উৎপাদন ক্ষমতা ৩৫ লাখ থেকে ১ কোটিতে উন্নীত হয়েছে এবং প্রাণী মৃত্যুহার শূন্যের কাছাকাছি পৌঁছানোয় খামারিদের আয় উল্লেখযোগ্য হারে বৃদ্ধি পেয়েছে। তবে এফএমডি ভ্যাকসিনের ৪টি ডোজ অবশিষ্ট থাকায় এবং আবহাওয়ার প্রতিকূলতার কারণে প্রকল্প মেয়াদ বৃদ্ধির প্রয়োজনীয়তা দেখা দিয়েছে। ভলান্টিয়ার ভ্যাকসিনেটরদের নিয়মিত তদারকি ও টেকসই পরিকল্পনা বাস্তবায়নই এ প্রকল্পের টেকসই সাফল্য নিশ্চিত করবে।
প্রকল্পের সফল বাস্তবায়নের জন্য বেশকিছু প্রস্তাব দিয়েছে আইএমইডি। এর মধ্যে রয়েছে- পিপিআর রোগ নির্মূলের লক্ষ্যে ২০৩০ সাল পর্যন্ত নিয়মিত ভ্যাকসিনেশন কার্যক্রম চালু রাখার পাশাপাশি নিবিড় তদারকির মাধ্যমে ভ্যাকসিনের কার্যকারিতা ও রোগের প্রাদুর্ভাব পর্যবেক্ষণ করতে হবে। বিদেশি ভ্যাকসিনের ওপর নির্ভরতা কমাতে দেশেই পিপিআর ও এফএমডি ভ্যাকসিন উৎপাদনের সক্ষমতা বৃদ্ধি করতে হবে, যা বৈদেশিক মুদ্রা সাশ্রয় করবে। দেশীয় ও আন্তঃসীমান্ত প্রাণী চলাচল নিয়ন্ত্রণে কঠোর পদক্ষেপ গ্রহণ করতে হবে, যাতে রোগের পুনঃপ্রবেশ রোধ করা যায়। প্রকল্পের ৫৭.৫০ শতাংশ অগ্রগতির পর অবশিষ্ট ৪২.৫০ শতাংশ কাজ দ্রুত শেষ করতে হবে, বিশেষ করে এফএমডি ভ্যাকসিনের অবশিষ্ট ৪ ডোজ দ্রুত ক্রয় ও প্রয়োগের ব্যবস্থা নিতে হবে। ভ্যাকসিনেশন কার্যক্রমের গুণগত মান নিশ্চিত করতে ইউনিয়ন পর্যায়ে প্রশিক্ষিত ভলান্টিয়ার ভ্যাকসিনেটরের সংখ্যা বৃদ্ধি এবং তাদের বহুমুখী প্রশিক্ষণ প্রদান করতে হবে। প্রকল্পের অডিট আপত্তিগুলো দ্রুত নিষ্পত্তি করতে হবে।
এ ছাড়া পিপিআর ও এফএমডি ভ্যাকসিনের কার্যকারিতা মূল্যায়নের জন্য নিয়মিত নমুনা সংগ্রহ ও পরীক্ষার ব্যবস্থা করতে হবে এবং রোগের প্রাদুর্ভাবসংক্রান্ত তথ্য পদ্ধতিগতভাবে সংরক্ষণ করতে হবে। সর্বোপরি, প্রকল্পের টেকসই সাফল্য নিশ্চিতে সংশ্লিষ্ট সব প্রতিষ্ঠানের মধ্যে সমন্বয় বৃদ্ধি এবং প্রয়োজনে প্রকল্প মেয়াদ বাড়ানোর বিষয়টি বিবেচনায় নিতে হবে। আমাদের সময়
