এম. হাসান
একটি নির্দিষ্ট সময় বরাদ্দ করুন। সেই সময়টিকে একটি স্পষ্ট ও নির্ধারিত লক্ষ্য পূরণের জন্য নিজেকে সম্পূর্ণভাবে উৎসর্গ করুন। প্রথম পদক্ষেপ নিন, তারপর পরবর্তীটি। নিরবচ্ছিন্নভাবে এগিয়ে যান যতক্ষণ না নির্ধারিত সময় শেষ হয়। বিভ্রান্তির হাতছানি উপেক্ষা করুন। মনোযোগ ধরে রাখাকে নিজের কর্তব্য বলে মনে করুন। চাপ বা জোর করে কিছু করার অনুভূতি থেকে নিজেকে মুক্ত করুন। কেবল শান্তভাবে মনোযোগ ধরে রেখে, একটির পর একটি কাজ সম্পন্ন করুন। এইভাবেই আপনি একটি ফলপ্রসূ এবং আনন্দদায়ক ‘ফ্লো’ অবস্থায় প্রবেশ করবেন। এইভাবেই আপনি ধারাবাহিক ও বাস্তব অগ্রগতি অর্জন করবেন আপনার লক্ষ্যপানে। নিজের মনোযোগ, দক্ষতা ও উৎকর্ষতার সামর্থ্যে ভয় পাবেন না। বরং সঠিক পরিবেশ তৈরি করুন, তা ধরে রাখার প্রতিশ্রুতি দিন তাহলেই সাফল্য আসবেই।
এখনও সুযোগ আছে:
আপনার জীবনটা এক দারুণ সুযোগ। এর প্রতিটি মুহূর্তই নতুন সম্ভাবনা নিয়ে আসে। প্রতিটি মুহূর্তেই আপনি চাইলে কিছু ভালো এবং টেকসই করে যেতে পারেন। আর পরের মুহূর্তটা দেয় সেই সাফল্যের ওপর নতুন কিছু গড়ার সুযোগ। মুহূর্তগুলো খুব দ্রুত চলে যায়, কিন্তু এর প্রতিটির প্রভাব একসঙ্গে জমে বড় কিছু হয়ে ওঠে। আপনি চাইলে সময়গুলোকে শুধু পার করে দিতে পারেন, আবার চাইলে প্রতিটি মুহূর্তকে কাজে লাগিয়ে এগিয়ে যেতে পারেন। আপনি হয়তো এখন ক্লান্ত, হতাশ বা অস্বস্তিতে আছেন। তবুও, আপনার সবচেয়ে ভালো সিদ্ধান্ত হবে ইতিবাচকভাবে সামনে এগিয়ে যাওয়া। আগের ব্যর্থতা ধরে রাখলে তা শুধু আপনাকে আটকে রাখবে। নিজেকে দুর্ভাগা মনে করে সান্ত্বনা খুঁজলে আসলে তা কোনো সত্যিকারের শান্তি দেবে না। ঝুঁকি না নিয়ে নিরাপদে থাকাটা যতটা সহজ মনে হয়, সেটাই আসলে সবচেয়ে বিপজ্জনক কারণ এতে কিছুই অর্জন করা সম্ভব হয় না। আপনার স্বপ্নগুলো আসে আপনার হৃদয়ের গভীরে থাকা বিশ্বাস আর মূল্যবোধ থেকে। এই বিশ্বাসগুলো আপনার মধ্যেই আছে কারণ, এগুলোর মাধ্যমেই আপনি আপনার জীবনের আসল উদ্দেশ্য পূরণ করতে পারেন। আপনার জীবনটা খুবই গুরুত্বপূর্ণ। এটি কারও মতো নয়, আর কাউকে দিয়ে একে বদলানো বা নকল করাও যাবে না। কেবল আপনিই এই জীবনটা বাঁচাতে পারবেন। আপনিই পারেন এটিকে সার্থক, মহৎ ও অর্থবহ করে তুলতে। জীবনে বাধা আসবেই। আসবে হতাশাও। কিন্তু সামনে এগিয়ে যাওয়ার জন্য দরকার পরিশ্রম, সাহস আর দৃঢ় সংকল্প। ভয় লাগতেই পারে, কিন্তু সাহস মানে ভয় না থাকা নয় সাহস মানে হলো ভয়কে বুঝে, তার কাছ থেকে শিক্ষা নিয়ে, সেই ভয় নিয়েই সামনে এগিয়ে যাওয়া। আপনার ভেতরে সংকল্প আছে। আপনি জানেন আপনি কী চান, কেন চান। এই বিষয়গুলো মনে রাখলেই মনোবল ধরে রাখা সহজ হবে। বিষয়টা জটিল নয় সবই আপনার নাগালের মধ্যে আছে। চলুন, মনে করুন আপনার ভয়কে সংকল্পে বদলে ফেলাটা কতটা সহজ হতে পারে। যেই শক্তিটা আপনার ভেতরে আগে থেকেই আছে, সেটিকে ভালো কিছুর জন্য কাজে লাগান। আপনার অভিজ্ঞতা অমূল্য। জীবনে যা কিছু শিখেছেন, করেছেন, দেখেছেন, সহ্য করেছে সব মিলিয়ে আজ আপনি যিনি, তার ভিত গড়ে উঠেছে। সেই অভিজ্ঞতা ফেলে দেওয়ার কিছু নেই। বরং এখন সময় সেই অভিজ্ঞতার ওপর দাঁড়িয়ে আরও কিছু গড়ার, আরও কিছু শেখার, আরও কিছু করার। এই মুহূর্তটা কাজে লাগান। আপনার অভিজ্ঞতাকে কাজে লাগিয়ে কিছু ফলপ্রসূ কাজ করুন তাহলেই আপনার অতীতের সব মুহূর্ত আরও মূল্যবান হয়ে উঠবে। আপনি অতীতে ফিরে যেতে পারবেন না, কিন্তু অতীত থেকে পাওয়া শিক্ষা দিয়ে আজকের দিনটাকে আরও সমৃদ্ধ করতে পারবেন। আজকের কাজে যদি আপনি আপনার অভিজ্ঞতার মূল্য যোগ করেন, তাহলে তার ফল আপনি এখনই পেতে শুরু করবেন। আপনি সেরাটা পাওয়ার যোগ্য। আপনি যোগ্য, আপনি সক্ষম। আপনার সামনে রয়েছে এক পূর্ণ জীবন যেটি এখনো ভরে উঠেনি। অতীতে যা-ই হোক না কেন, তা কোনোভাবেই আপনাকে থামাতে পারে না। এখনই আপনার হাতে সময় আপনার ইচ্ছেমতো ভরে নেওয়ার সময়। এই মুহূর্তটা একান্ত আপনার। এখনই সিদ্ধান্ত নেওয়ার সময়। সিদ্ধান্ত নিন আপনার সম্ভাবনাগুলোর দিকে মনোযোগ দেবেন। সামনে তাকান। উপরের দিকে তাকান। মুখে একটু হাসি আনুন। উঠে দাঁড়ান, নিজেকে ঝেড়ে ফেলুন, এবং আত্মবিশ্বাস নিয়ে এগিয়ে যান। আপনার স্বপ্নের দিকে এগিয়ে যান হ্যাঁ, ঠিক আপনার সেই স্বপ্নগুলোর দিকে। আপনি নিজেই নিজের কাছে, আর পুরো দুনিয়ার কাছেও দায়বদ্ধ আপনার স্বপ্নগুলোকে বাস্তবে রূপ দেওয়ার। এই দিনটা আপনার। এই সুযোগটা আপনার। এই জীবনটা আপনার। আর এই মুহূর্তটাই হলো সময় আপনার জীবনে অর্থ আর উদ্দেশ্যের আলো জ্বালানোর।
মাকড়সা থেকে নেওয়া জীবনের পাঠ:
সূর্য যখন মেঘের আড়াল থেকে বেরিয়ে এল, হঠাৎ একটা নরম আলো চোখে পড়ল। তাকিয়ে দেখি, সামান্য দূরে একটা মাকড়সার জাল এতটাই পাতলা যে সূর্যের আলো পড়ার আগে তা বোঝাই যায়নি। জালের মাঝখানে বসে আছে ছোট্ট এক মাকড়সা। কয়েকটি পোকা, যেগুলো মাকড়সার চেয়েও বড়, জালে আটকে গেছে। আমি ভাবলাম এই তো মাকড়সার খাবার। সে পরিশ্রম করে জাল তৈরি করেছে, ধৈর্য ধরে অপেক্ষা করেছে, আর অবশেষে প্রকৃতি তাকে খাবার দিয়েছে। পোকাগুলো তো আগে থেকেই আকাশে ওড়াফেরা করছিল। মাকড়সা তাদের সৃষ্টি করেনি। সে শুধু নিজের প্রস্তুতি নিয়েছে জাল তৈরি করে রেখেছে। যদি কিছুই না করত, তাহলে পোকাগুলো থাকত ঠিকই, কিন্তু কোনোটা তার ধরাছোঁয়ার মধ্যে আসত না। পোকামাকড় যেমন সর্বত্রই আছে, জীবনের সম্ভাবনাও তেমনি সর্বত্র ছড়িয়ে আছে। কিন্তু শুধু সেই প্রাচুর্য থাকলেই হবে না, তা কাজে লাগাতে হলে আমাদের উদ্যোগ নিতে হবে। মাকড়সার জন্য তা মানে জাল তৈরি করা কারণ খাবার তার জন্য সবচেয়ে দরকারি জিনিস।
জাল তৈরি করে মাকড়সা প্রাকৃতিক প্রাচুর্যকে কাজে লাগায়। আমাদের জীবনেও ঠিক তেমনই, আমরা যেটা চাই বা যেটা আমাদের জন্য অর্থবহ, সেটা এই বিশাল জীবনের মধ্যেই কোথাও আছে। কিন্তু সেটা শুধু চাওয়ার মাধ্যমে পাওয়া যায় না। সেটার জন্য আমাদের কিছু করতে হয় কাজের মাধ্যমে, জীবনের মাধ্যমে সেই চাওয়াকে প্রকাশ করতে হয়। এইটাই আসল। মাকড়সা যেমন জাল তৈরি করে, আমি হয়তো একটি ওয়েবসাইট বানাতে পারি, কেউ বই লিখতে পারে, কেউ বিজ্ঞান পড়ে গবেষক হতে চায় বা কেউ প্রশিক্ষক হতে পারে।
সবাইকেই জীবনে একটা না একটা ‘জাল’ তৈরি করতে হয়। সেই জাল নতুন কিছু সৃষ্টি করে না, বরং আমাদের জীবনের প্রাচুর্যের সঙ্গে সংযুক্ত করে। আর এই সংযোগ যত গভীর হয়, জীবনের প্রাচুর্য তত বেশি করে আমাদের কাছে ধরা দেয়। এক সময় হঠাৎ একটা জোর বাতাস এসে মাকড়সার জাল ভেঙে দিল। আমি ভাবলাম মাকড়সার কি খারাপ লাগছে? পরে বুঝলাম, ও কী ভাবছে তা নয়, আসল বিষয় হলো সে আবার নতুন করে জাল তৈরি করবে কি না।
ঠিক তেমনি জীবনের প্রাচুর্য কখনো ফুরায় না। তবে জীবনের সঙ্গে আমাদের সংযোগগুলো ভেঙে যেতে পারে। যদি আমরা শুধু হারিয়ে যাওয়া জিনিস নিয়ে দুঃখ করি, তাহলে নতুন কিছু গড়ে তোলার সুযোগগুলো হারিয়ে ফেলি। একটা জিনিস আমরা তার জন্য ভালোবাসি না, বরং তার মাধ্যমে যে সুযোগগুলো আসে, সেই প্রাচুর্যের জন্য ভালোবাসি। যদি পোকাই না থাকত, তাহলে মাকড়সার জন্য জাল তৈরি করার কোনো মানেই থাকত না।
মাকড়সা জানে পোকা সবসময়ই থাকবে। তাই যদি তার জাল ভেঙে যায়, তাহলে আবার একটা নতুন জাল তৈরি করাই বুদ্ধিমানের কাজ। হ্যাঁ, এতে সময় লাগে, পরিশ্রমও হয়। পুরনো জাল নষ্ট হয়ে যাওয়া কষ্টেরও বটে। কিন্তু প্রাচুর্য তো এখনো আছে শুধু নতুন করে তা ধরার উপায় গড়ে তুলতে হবে। আমরাও অনেক সময় জীবনে কোনো কিছু হারাই—কোনো সংযোগ, কোনো সুযোগ বা কোনো পথ। কিন্তু জীবন আমাদের সামনে নতুন পথের সুযোগ ঠিকই রাখে। যদি আমরা নতুনভাবে চেষ্টা করি, তবে আগের চেয়ে আরও বড়, আরও দৃঢ় কিছু তৈরি করা সম্ভব। আর তখন প্রাচুর্য আরও প্রবলভাবে আমাদের দিকে ফিরে আসে। শেষে দেখলাম, মাকড়সা তার সব শিকার খেয়ে ফেলেছে। এখন সে আবার জালের ভেতরে ঘুরে বেড়াচ্ছে, কিছু অংশ মেরামত করছে আরও শক্তভাবে নিজের জীবনকে জীবনের প্রাচুর্যের সঙ্গে যুক্ত করছে। জীবন সংগ্রাম সম্পর্কে এভাবেই তার অনুভুতি ব্যক্ত করেছেন একজন বিশ্ব বিখ্যাত মুটিভেশনাল রাইটার ও ইস্পিকার।
