মুক্তদেশ ডেস্ক: ক্ষমতাচ্যুত প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা, তার বোন শেখ রেহানা ও পরিবারের অন্য সদস্যদের বিরুদ্ধে দুর্নীতি ও অনিয়মের অভিযোগে ২১টি মামলা ও অভিযোগ নিয়ে কাজ করছে দুর্নীতি দমন কমিশন (দুদক)। এর মধ্যে ছয়টি মামলায় আদালতে চার্জশিট দাখিল করতে সক্ষম হয়েছে দুর্নীতিবিরোধী সংস্থাটি। তিনটি মামলা তদন্তাধীন। এ ছাড়া দুর্নীতির আরও অন্তত এক ডজন অভিযোগের অনুসন্ধান চালিয়ে যাচ্ছে দুদক।
দুদক সূত্রে জানা গেছে, শেখ হাসিনা ও তার ছেলে সজীব ওয়াজেদ জয়ের বিরুদ্ধে বাংলাদেশ থেকে ৩০০ মিলিয়ন ডলার যুক্তরাষ্ট্রে পাচারের অভিযোগে অনুসন্ধান চলছে। এ ছাড়া রূপপুর পারমাণবিক বিদ্যুৎ প্রকল্পসহ বিভিন্ন প্রকল্পে প্রায় ৮০ হাজার কোটি টাকার দুর্নীতির অভিযোগ খতিয়ে দেখছে কমিশন। এসব বিষয়ে তথ্য-প্রমাণ সংগ্রহের জন্য যুক্তরাষ্ট্রসহ কয়েকটি দেশে মিউচুয়াল লিগ্যাল অ্যাসিস্ট্যান্স রিকোয়েস্ট (এমএলএআর) পাঠানো হলেও প্রয়োজনীয় তথ্য এখনও আসেনি।
দুদকের মহাপরিচালক মো. আক্তার হোসেন গণমাধ্যমকে জানান, অনুসন্ধান কর্মকর্তারা নির্ধারিত সময়সূচি অনুসরণ করেই অনুসন্ধান ও তদন্তকাজ এগিয়ে নিচ্ছেন। তবে দেশের বাইরে থেকে প্রমাণ সংগ্রহে বিলম্বের কারণে কিছু অনুসন্ধান পিছিয়ে যাচ্ছে। সংশ্লিষ্ট দেশগুলো থেকে দালিলিক প্রমাণাদি হাতে এলেই অনুসন্ধান ও তদন্ত কর্মকর্তারা প্রতিবেদন জমা দেবেন।
দুর্নীতিবিরোধী জাতীয় সমন্বয় কমিটির যুগ্ম সাধারণ সম্পাদক ড. মো. শাহজাহান সাজু গণমাধ্যমকে বলেন, প্রতিটি অনুসন্ধান ও মামলার আলাদা আলাদা বিষয় থাকে। যে সকল অনুসন্ধান বা তদন্তে কিছু সিস্টেমের ব্যাপার থাকে, অনেক সময় বিদেশিদের কাছে চিঠি পাঠিয়ে
তথ্য-উপাত্ত সংগ্রহ করতে হয়। অনেক সময় দেখা যায়, চিঠিপত্র পাঠানোর পরও তথ্য-প্রমাণ আসছে না। তখন পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয় এবং দুর্নীতিবিরোধী বিভাগের মাধ্যমে সংশ্লিষ্ট দেশে বারবার চিঠি, ই-মেইল পাঠালে এক পর্যায়ে তারা তথ্য দিয়ে থাকে। এ ছাড়া আমাদের দেশের রাষ্ট্রদূতের মাধ্যমেও ওই দেশের কর্তৃপক্ষের সঙ্গে যোগাযোগ করে তথ্য-প্রমাণ পাওয়ার চেষ্টা অব্যাহত রাখতে হবে।
শাহজাহান সাজু বলেন, অনেক দেশে করাপশন বিভাগে জনবল কম থাকে। তখন তাদের ইচ্ছা থাকলেও চাহিদা অনুযায়ী তথ্য-প্রমাণ সরবরাহ করতে পারে না। আমাদের সরকারের পক্ষ থেকে যদি একাধিকবার যোগাযোগ করা হয়, আমার বিশ^াস তারা তথ্য-উপাত্ত দিয়ে সহযোগিতা করবে।
চলমান অনুসন্ধান : সাবেক প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা এবং তার ছেলে সজীব ওয়াজেদ জয়ের বিষয়ে আমেরিকার গোয়েন্দা সংস্থা এফবিআই একটি প্রাথমিক তদন্ত করলে জয়ের গুরুতর আর্থিক কেলেঙ্কারির বিষয়টি উন্মোচিত হয়। বাংলাদেশ থেকে ৩০০ মিলিয়ন ডলার যুক্তরাষ্ট্রের বিভিন্ন ব্যাংক হিসাবে জমা করার অভিযোগে গত ডিসেম্বরে অনুসন্ধানের সিদ্ধান্ত নেয় দুদক। দুদকের অনুসন্ধান টিমের এক কর্মকর্তা জানান, অনুসন্ধানের অংশ হিসেবে তথ্য-উপাত্ত চেয়ে কয়েকটি দেশে এমএলএআর পাঠানো হয়েছে। এখনও তথ্য-উপাত্ত পাওয়া যায়নি।
এর আগে গত ১৭ ডিসেম্বর শেখ হাসিনাসহ সংশ্লিষ্টদের বিরুদ্ধে রূপপুর পারমাণবিক বিদ্যুৎকেন্দ্র প্রকল্পসহ অন্যান্য প্রকল্পে ৮০ হাজার কোটি টাকা দুর্নীতির অভিযোগ অনুসন্ধানের সিদ্ধান্ত নেয় দুদক। এ অনুসন্ধান এখনও চলামান। এ ছাড়া আশ্রয়ণসহ আটটি সরকারি প্রকল্পে দুর্নীতির তথ্য আমলে নেওয়া হয়েছে। প্রকল্পগুলোতে ২১ হাজার কোটি টাকার দুর্নীতির অভিযোগ রয়েছে।
শেখ হাসিনা পরিবারের বিরুদ্ধে সূচনা ফাউন্ডেশনে সিএসআর ফান্ডের অর্থ গ্রহণ, সরকারি আশ্রয়ণসহ আটটি বড় প্রকল্পে দুর্নীতি, সেন্টার ফর রিসার্চ অ্যান্ড ইনফরমেশন- সিআরআইয়ের মাধ্যমে রাজনৈতিক এজেন্ডা বাস্তবায়নের নামে রাষ্ট্রীয় অর্থের ক্ষতিসাধনের অভিযোগ অনুসন্ধান করছে দুদকের আলাদা টিম।
জানা গেছে, শেখ পরিবারের নিয়ন্ত্রণে থাকা সূচনা ফাউন্ডেশন দান-অনুদানের নামে ৯৩০ কোটি চাঁদাবাজির অভিযোগ এসেছে দুদকে। সিআরআইয়ের আওয়ামী লীগের রাজনৈতিক এজেন্ডা বাস্তবায়নের মাধ্যমে রাষ্ট্রীয় অর্থের ক্ষতিসাধনের অভিযোগেরও অনুসন্ধান চলছে।
এ ছাড়া একাদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচনে দিনের ভোট রাতে করা, ভোটে ব্যাপক আর্থিক লেনদেনের অভিযোগেও দুদক অনুসন্ধান চালিয়ে যাচ্ছে। ওই নির্বাচনে ভোট কারচুপির অভিযোগে গত ২২ জানুয়ারি অনুসন্ধান শুরু করে দুদক। এ ছাড়া সাবেক প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা, তার বোন শেখ রেহানা, ছেলে সজীব ওয়াজেদ জয়, মেয়ে সায়মা ওয়াজেদ পুতুল ও ভাগ্নি টিউলিপ সিদ্দিকের নামে জ্ঞাত আয়বহির্ভূত সম্পদ অর্জনের অভিযোগ অনুসন্ধান করছে দুদক। এর বাইরে এই পরিবারের সদস্যদের নামে থাকা ঢাকা, গোপালগঞ্জ, গাজীপুর, খুলনাসহ বিভিন্ন এলাকায় থাকা বিপুল পরিমাণ সম্পদ জব্দের পাশাপাশি তাদের স্বার্থসংশ্লিষ্ট ব্যাংক হিসাব জব্দ করা হয়েছে।
তদন্তাধীন তিন মামলা : শেখ হাসিনার মেয়ে সায়মা ওয়াজেদ পুতুলের বিরুদ্ধে গত ২০ মার্চ দুটি মামলা করে দুদক। একটি মামলার অভিযোগ, ব্যাংকগুলোর সিএসআর ফান্ড থেকে সূচনা ফাউন্ডেশনে ৩৩ কোটি ৫ লাখ টাকা গ্রহণ করেন তিনি। তার বিরুদ্ধে অপর মামলায় জালিয়াতির মাধ্যমে বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিব মেডিক্যাল বিশ্ববিদ্যালয়ের নামে শিক্ষা ম্যানুয়েল তৈরি করে বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থার দক্ষিণ-পূর্ব এশীয় আঞ্চলিক পরিচালক পদে নিয়োগ লাভের অভিযোগ উঠেছে। এ ছাড়া ১৫ এপ্রিল ‘ঘুষ’ হিসেবে গুলশানে ইষ্টার্ন হাউজিং লিমিটেড থেকে একটি ফ্ল্যাট নিজের নামে লিখে নেওয়ার অভিযোগে টিউলিপ সিদ্দিকের বিরুদ্ধে মামলা করে দুদক। এ মামলাটির তদন্ত শেষ পর্যায়ে রয়েছে।
বিচারের অপেক্ষায় ছয় মামলা : পূর্বাচল নতুন শহর প্রকল্পে ৬০ কাঠার ৬টি প্লট বরাদ্দ নেওয়ার অভিযোগে সাবেক প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা, তার বোন শেখ রেহানা ও পরিবারের অন্য সদস্য ছাড়াও সরকারের ১৪ কর্মকর্তার বিরুদ্ধে ছয়টি মামলায় চার্জশিট দাখিল করেছে দুর্নীতি দমন কমিশন (দুদক)। শেখ হাসিনা ও শেখ রেহানা ছাড়া সজীব ওয়াজেদ জয়, রাদওয়ান মুজিব সিদ্দিক, টিউলিপ সিদ্দিক, পুতুল ও আজমিনা সিদ্দিকসহ অন্যদের আসামি করে ১২ থেকে ১৪ জানুয়ারির মধ্যে মামলাগুলো করা হয়। পরে দুদকে গত ১০ মার্চ মামলাগুলোর চার্জশিট জমা দেওয়া হয়।
আইনজীবীর বক্তব্য : ঢাকা বিচারিক আদালতে দায়িত্বরত দুদকের আইনজীবী মাহমুদ হোসেন জাহাঙ্গীর জানান, এ মামলাগুলোর আসামিদের আদালতে হাজির হতে গত ৩ জুলাই গেজেট প্রকাশ করা হয়েছে। মামলাগুলো ট্রান্সফারের জন্য আগামী ২০ জুলাই দিন ধার্য রয়েছে। এরপর অভিযোগ গঠন ও বিচার কার্যক্রম শুরু হবে। সূত্র: আমাদের সময়
