মুুুক্তদেশ ডেস্ক: পতিত ও কার্যক্রম নিষিদ্ধ ঘোষিত আওয়ামী লীগকে কেন্দ্র করে দেশের বর্তমান ক্ষমতাসীন দল বিএনপি এবং প্রধান বিরোধী দল জামায়াতে ইসলামীসহ বিরোধী জোটের মধ্যে শুরু হয়েছে তীব্র পাল্টাপাল্টি ব্লেম গেম বা দোষারোপের রাজনীতি। একে অপরের বিরুদ্ধে নিষিদ্ধ এই দলটির সাথে গোপন সমঝোতা, আঁতাত ও সখ্যের অভিযোগ তুলছে উভয় পক্ষই। দীর্ঘ দেড় দশক স্বৈরাচারী শাসনের বিরুদ্ধে রাজপথে আন্দোলন করা দুই পুরোনো রাজনৈতিক সহযাত্রী এখন পরস্পরকে রাজনৈতিক ও সামাজিকভাবে ঘায়েল করতে ‘আওয়ামী কার্ড’ ব্যবহার করছে।
সরকারি ও বিরোধী দলের মুখোমুখি অবস্থান
সরকারি দলের পক্ষ থেকে দাবি করা হচ্ছে, দেশ ও শিল্পাঞ্চলগুলোতে অস্থিরতা তৈরি করতে বিরোধী দল পেছন থেকে আওয়ামী লীগকে ইন্ধন দিচ্ছে। বিপরীতে বিরোধী দলের অভিযোগ, তাদের রাজনৈতিকভাবে চাপে রাখতে ও মত দমনে সরকার পরিকল্পিতভাবে ‘আওয়ামী জুজু’র ভয় দেখাচ্ছে।
বিএনপি সরকার গঠনের পর প্রধান বিরোধী দল জামায়াত নেতৃত্বাধীন ঐক্য প্রথম দিকে সহযোগিতার আশ্বাস দিলেও ‘জুলাই সনদ’, জ্বালানি সংকট, দ্রব্যমূল্যের ঊর্ধ্বগতি ও আইনশৃঙ্খলা পরিস্থিতি নিয়ে সরকারের বিরুদ্ধে সোচ্চার হয়ে ওঠে। সরকারের মেয়াদ সাত মাস পূর্ণ হওয়ার আগেই লংমার্চ ও বিভাগীয় সমাবেশের মতো কর্মসূচির পাশাপাশি সরকার পতনের হুমকিও এসেছে। বিরোধীদলীয় নেতা ডা. শফিকুর রহমান স্পষ্ট জানিয়েছেন, সরকারকে আর কোনো সহযোগিতা করা হবে না।
এরই পাশাপাশি সাম্প্রতিক শ্রমিক আন্দোলন, বকেয়া বেতন দাবি এবং শেখ হাসিনার তথাকথিত দেশে ফেরার বার্তার পর ঝটিকা মিছিল ও অগ্নিসংযোগের ঘটনা পরিস্থিতিকে আরও ঘোলাটে করেছে। সরকারের দাবি, শিল্পাঞ্চলে শ্রমিক আন্দোলনকে চাঙা করতে বিরোধী দল নিষিদ্ধ আওয়ামী লীগের সাথে হাত মিলিয়েছে। অন্য দিকে বিরোধী দলের দাবি, বিএনপি ও আওয়ামী লীগ একজোট হয়ে বিরোধী দলকে কোণঠাসা করার চেষ্টা করছে এবং কারাবন্দি আওয়ামী নেতাদের জামিন ও দলীয় কার্যালয় খোলার সুযোগ দিচ্ছে।
শীর্ষ নেতাদের বক্তব্য ও অভিযোগের তীর
সম্প্রতি রাজশাহীতে এক অনুষ্ঠানে প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমান বলেন, তাদের কাছে সুনির্দিষ্ট গোয়েন্দা তথ্য রয়েছে যে, সীমান্ত পার থেকে পলাতক স্বৈরাচার অর্থ সরবরাহ করছে এবং দেশের ভেতরের একটি রাজনৈতিক দল তাদের সহায়তায় অস্থিতিশীলতা তৈরির চেষ্টা করছে।
প্রধানমন্ত্রীর এই বক্তব্যের কড়া জবাব দিয়েছেন জামায়াতের সেক্রেটারি জেনারেল মিয়া গোলাম পরওয়ার। তিনি অভিযোগ করেন, ক্ষমতাসীন বিএনপি দিল্লির সাথে যোগাযোগের মাধ্যমে আওয়ামী লীগের সাথে আঁতাত করছে এবং তাদের রাজনীতির সুযোগ করে দিচ্ছে।
অন্যদিকে বিএনপির ভারপ্রাপ্ত মহাসচিব রুহুল কবির রিজভী জামায়াতের দিকে ইঙ্গিত করে দাবি করেন, নিষিদ্ধ আওয়ামী লীগ এবং একটি গুপ্ত দল যৌথভাবে অপপ্রচারে লিপ্ত হয়েছে। পরাজিত শক্তির সাথে ওই দলের আচরণ ও কথাবার্তার মিল রয়েছে বলেও তিনি মন্তব্য করেন।
রাজনৈতিক বিশ্লেষকদের উদ্বেগ ও পরামর্শ
সরকার ও বিরোধী দলের এই মুখোমুখি অবস্থান এবং কাদা ছোড়াছুড়ির রাজনীতি দেশের ভবিষ্যৎ রাজনৈতিক স্থিতিশীলতার জন্য বড় হুমকি বলে মনে করছেন রাজনৈতিক বিশ্লেষকরা।
শাহজালাল বিজ্ঞান ও প্রযুক্তি বিশ্ববিদ্যালয়ের পলিটিক্যাল স্টাডিজ বিভাগের অধ্যাপক সাহাবুল হক বলেন, সরকারপ্রধান যখন দায়িত্বশীল জায়গা থেকে গোয়েন্দা তথ্যের কথা বলছেন, তখন তার উপযুক্ত প্রমাণ তুলে ধরা উচিত। একইভাবে বিরোধী দলেরও তাদের ওপর আনা অভিযোগের স্পষ্ট ব্যাখ্যা দেওয়া দরকার। তা না হলে এই অনৈক্যের সুযোগ নিয়ে পতিত আওয়ামী লীগ নতুন করে ষড়যন্ত্রের পথ খুঁজবে, যা দেশের উন্নয়ন কাজ ব্যাহত করবে।
রাজশাহী বিশ্ববিদ্যালয়ের রাষ্ট্রবিজ্ঞান বিভাগের অধ্যাপক তারেক ফজল মন্তব্য করেন, এই অভিযোগগুলো সুনির্দিষ্ট তথ্যপ্রমাণের চেয়ে রাজনৈতিক সুবিধা নেওয়ার উদ্দেশ্যে বেশি করা হচ্ছে। তিনি সতর্ক করে দিয়ে বলেন, এভাবে দোষারোপের রাজনীতি চলতে থাকলে বিতাড়িত ও পতিত গোষ্ঠীই দিনশেষে রাজনৈতিকভাবে লাভবান হবে। পরিস্থিতি আরও ভয়ংকর রূপ নেওয়ার আগেই উভয় পক্ষকে সংযত ও দায়িত্বশীল ভূমিকা পালনের আহ্বান জানান তিনি।
