মুক্তদেশ ডেস্ক :‘সেভিং প্রাইভেট রায়ান’ সিনেমার সেই দৃশ্যটির কথা মনে আছে? প্রাইভেট রায়ানকে খুঁজতে বের হয়ে অধীন সঙ্গীদের একটি কথা বলেছিলেন ক্যাপ্টেন জন এইচ মিলার। রায়ানকে তিনি চেনেন না। তবু ছেলেটিকে নিরাপদে বাড়ি ফেরাতে পারলে মিলারও যেন নিজের পরিবারের কাছে ফিরে যাওয়ার অধিকার অর্জন করবেন। সেটিই তাঁর মিশন।
পৃথিবীর সব মানুষের জীবনেই বোধ হয় এমন একটি মিশন থাকে। সেই মিশনের টানে কেউ কেউ বাড়ি ছাড়েন—ফিরে আসার অধিকার অর্জন করার জন্য।
লিওনেল মেসিও বাড়ি ছেড়েছিলেন ১৩ বছর বয়সে। কিংবদন্তির বাড়ি ফেরার সময় হলো ৩৯ বছর বয়সে। মাঝের ২৬ বছরের গল্পটি যেন কোনো বাঙালি মধ্যবিত্ত সন্তানের জীবনকাহিনি—পড়াশোনার জন্য বাড়ি ছেড়ে যাওয়া, তারপর কর্মজীবনের ব্যস্ততায় দূরে থাকা, একদিন দীর্ঘ পথ পেরিয়ে নিজের ঠিকানায় ফিরে আসা।
বুয়েনস এইরেসের মনুমেন্তালে মেসিও যেন তেমনই এক কীর্তিমান জীবনের যতি টেনে বাড়ি ফেরার অধিকার অর্জন করলেন।
সেই বাড়ির নাম আর্জেন্টিনা। পরিবার আর্জেন্টাইন জনতা। আর পড়শি—গোটা দুনিয়া।
পাশের বাড়ির সফল সন্তান বাড়ি ফিরলে পড়শিরা যেমন জানালা দিয়ে উঁকি মেরে দেখেন, গত কয়েক দিন গোটা পৃথিবীও তেমনই চোখ রেখেছিল সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমের জানালায়। মেসি কী করছেন, কী বলছেন, কেমন আছেন—সবকিছুর দিকে তাকিয়ে ছিল পৃথিবী।
অথচ বাড়ি ছাড়ার সময় এই দৃষ্টি এতটা মমতামাখা ছিল না।
চারপাশে তাকিয়ে দেখুন। আমাদেরই কোনো সন্তান বাড়ি ছেড়ে শহরে গেল। পড়াশোনা শেষ করল। চাকরি হলো না, বিসিএস হলো না, ভালো কোনো প্রতিষ্ঠানে জায়গা হলো না—তখন আমরা কী বলি?
‘নাহ, পরিবারের প্রতি ওর কোনো দায়িত্ববোধ নেই!’
২০২১ সালের আগের মেসিকেও কি তাঁর বাড়ি, তাঁর জনতা, তাঁর পড়শিরা সেই চোখে দেখেনি?
সাফল্য যা ক্লাব ফুটবলে। জাতীয় দলের জার্সিতে ব্যর্থতা। জাতীয় সংগীতের সময় তাঁর অনুভূতি নিয়েও প্রশ্ন। আর্জেন্টিনার জার্সির প্রতি নাকি কোনো মায়া নেই—এমন হাজারো সমালোচনার তীর আমরা যে যেখান থেকে পেরেছি ছুড়েছি।
কিন্তু ক্যাপ্টেন মিলারের মতো মেসিও অটল ছিলেন নিজের মিশনে।
বাড়ি ফেরার অধিকার তাঁকে অর্জন করতেই হবে।
ক্লাব ফুটবলে একের পর এক সাফল্য ছিল সেই মিশনের প্রস্তুতি। তারপর একদিন দেখা দিল আশার আলো। ২০২১ কোপা আমেরিকা জয়কে যদি ধরা হয় নন-ক্যাডার সাফল্য, তবে ২০২২ বিশ্বকাপ জয় ছিল ক্যাডার!
চিরকালের সরকারি চাকরিপ্রেমী বাঙালির ভাষায়—বিসিএস ক্যাডার!
আর্জেন্টাইন ফুটবলের ভাষায়—‘এল পিবে দে ওরো’।
আর্জেন্টিনার ফুটবলে ‘এল পিবে দে ওরো’ যেন এক কল্পিত সোনার ছেলে—যে বল পায়ে দৌড়ে দেশের মানুষের সব দুঃখের অবসান ঘটাবে, নতুন দিনের স্বপ্ন দেখাবে। ১৯৮৬ সালে দিয়েগো ম্যারাডোনা যেটা দেখিয়েছিলেন, পরে সেটাই দেখালেন মেসি।
তবে এই দুই ‘এল পিবে’র মধ্যে পার্থক্য আছে। আর্জেন্টিনার জার্সি তুলে রাখার সময় প্রথমজনের মতো দ্বিতীয়জনের কপালে এতটা ভালোবাসা ও সম্মান জোটেনি—এ কথা বললে অবশ্য ইতিহাসের প্রতি অন্যায়ই হবে।
আকাশি-সাদায় জীবনের শেষ ম্যাচটি খেলতে টিমবাসে করে মনুমেন্তালে যাচ্ছিলেন মেসি। বুয়েনস এইরেসের রাস্তায় তখন লাখো জনতা।
কেউ কাঁদছেন। কেউ হাসছেন। কেউ মোবাইল তুলে ধরে শেষবারের মতো মানুষটিকে ক্যামেরাবন্দী করছেন। কারও হাতে আর্জেন্টিনার পতাকা, কারও গায়ে মেসির ১০ নম্বর জার্সি। কেউ চিৎকার করে নাম ডাকছেন, কেউ শুধু দাঁড়িয়ে আছেন নিঃশব্দে।
চারপাশে এক অদ্ভুত বিপন্ন বিস্ময়।
সবাই জানে, সময়ের কাছে একদিন সবাইকে হার মানতে হয়। এই দিনটাও আসবে—তা সবাই জানত। তবু মানুষটি এতটাই প্রিয় যে সেই নির্মম বাস্তবতার মুখোমুখি দাঁড়িয়েও চিৎকার করে বলতে ইচ্ছে করে—
‘যেতে নাহি দিব হায়!’
বছর দশেক আগে মেসির জার্সি কেনার টাকা ছিল না বলে খোলা পিঠে ১০ নম্বর আর ‘মেসি’ লিখে ফুটবল খেলে সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে ভাইরাল হওয়া সেই পুঁচকে ছেলেটি এখন নিশ্চয়ই অনেক বড় হয়েছে।
মেসিকে দেখতে দেখতে বড় হয়ে ওঠা জীবন তো আমাদের অনেকেরই।
শৈশবের টেলিভিশন, কৈশোরের মাঠ, রাত জেগে দেখা ম্যাচ, পরীক্ষার আগের রাতে লুকিয়ে দেখা গোল, প্রিয় দলের জয়ে উল্লাস—এক জীবনের কত অধ্যায়ের সঙ্গে মিশে আছেন এই মানুষটি!
সেই মানুষটি যখন তাঁর মিশন শেষ করে বাড়ি ফিরছেন, তখন ঠিক কেমন লাগে?
পাঁজরের ভেতর ভাঙনের যে শব্দ, তার কি কোনো ভাষা আছে?
সম্ভবত নেই।
সেই ভেতর নদীতে তখন শুধু পাড় ভাঙে। আর চোখের দুই কূল উপচে পড়ে জল।
টিমবাসে যাওয়ার পথে মানুষের কান্না দেখে মেসির চোখও শুকনো থাকেনি। রাখা যায় না। যে ছেলেটিকে হরমোনের সমস্যার কারণে বলা হয়েছিল, ঠিকমতো বেড়ে উঠতে পারবে না, ফুটবল সেই ছেলেটিকেই এমন এক উচ্চতায় পৌঁছে দিয়েছে, যেখান থেকে তাঁর নেমে আসার সময় নীল আকাশকেও আর শুধু নীল মনে হয় না—আকাশি-সাদা হয়ে যায়।
না, মেসি ফুটবল থেকে অবসর নেননি। শুধু যে কাজটি ছিল তাঁর ধ্যানজ্ঞান—১৯৮৬ বিশ্বকাপের পর আর্জেন্টিনার জার্সিকে আবারও বিশ্বসেরার মর্যাদায় ফিরিয়ে দেওয়া—সেটি তিনি করে ফেলেছেন।
হয়তো আরও কিছুদিন খেলবেন। আরও গোল করবেন। আরও কিছু রেকর্ড লিখবেন নিজের নামে।
বাঙালির চোখে সেটা অনেকটা বিসিএস ক্যাডার হওয়ার পর অবসরজীবনে খণ্ডকালীন কাজ করার মতো।
কিন্তু কারও কারও কাছে কাজই ধর্ম।
ফুটবল মেসির কাছে তেমনই।
নইলে ম্যাচ শুরুর আগে আর্জেন্টিনার জাতীয় সংগীত বাজার সময় ৩৯ বছরের মানুষটিকে অমন জবুথবু হয়ে দাঁড়িয়ে থাকতে দেখা যাবে কেন?
সেটি আসলে শোক।
বিচ্ছেদকে মেনে নেওয়ার শোক।
প্রাণখুলে কাঁদতেও পারছিলেন না। অথচ মাঠে নামার পর আবার সেই চিরযুবা মেসি।
কারণ, বলের সঙ্গে তাঁর সম্পর্কটা বয়স মানে না।
আকাশি-সাদায় শেষ মিলনে বলটিও যেন সেজেছিল গায়ে ১০ নম্বর লিখে। শেষ ম্যাচে একটি গোল আর দুটি অ্যাসিস্ট দিয়ে বলটাও যেন বলে দিল—
‘যত গ্রহণ করেছ আমাকে, ততই ঋণী করে গেছ।’
মেসির কাছে এই ঋণ কি শুধু একটি ফুটবলের?
নাকি কয়েক প্রজন্মের মানুষেরও?
সম্ভবত দুটোই।
তাই ম্যাচ শেষে মেসির চোখে যখন অশ্রুর বান নামে, তখন আর সেটিকে শুধু একজন ফুটবলারের কান্না মনে হয় না। আবেগের বাঁধ ভেঙে তিনি বলে বসেন—
‘আমি যেতে চাই না। এই মাঠ ছাড়তে চাই না।’
পৃথিবীতে এমন কোনো হৃদয় আছে, যা সেই মুহূর্তে ভিজে ওঠেনি?
এই একজন মানুষের কাছে পৃথিবীর কত মানুষের অদৃশ্য ঋণ! জীবনের কঠিন সময়ে মেসির সহজ পাঠের খেলা দেখে কত মানুষ সাহস পেয়েছেন, অনুপ্রেরণা পেয়েছেন—তার কোনো পরিসংখ্যান নেই।
সেই মানুষটির ক্যারিয়ারে যখন আসে ‘সবচেয়ে দুঃখের দিন’, তখন মেসির শেষ ম্যাচটি আর উপভোগ করা হয়ে ওঠে না।
অথচ গত কয়েক দিন ধরে ‘উপভোগ’ শব্দটিই সবচেয়ে বেশি উচ্চারিত হয়েছে।
কিন্তু ভালোবাসার মানুষের চলে যাওয়াকে উপভোগ করা যায় কীভাবে?
তাই পথ ছিল একটাই—
চোখে হাসি, মুখে কান্না।
অথবা মুখে হাসি, চোখে কান্না।
পৃথিবীর মুখটাও কি আজ তেমন নয়?
হাসি-কান্নার মিশেলে এক বিপন্ন বিস্ময়ে ছেয়ে গেছে আকাশ।
কারণ, আকাশি-সাদার সেই জমিন থেকে সবচেয়ে বড় তারাটিই আজ টুপ করে খসে পড়েছে।
তাই সবার চোখেই কী যেন পড়েছে।
কেউ স্বীকার করছে না।
কিন্তু সবাই জানে—এই বিচ্ছেদ নিজের অন্তর হারিয়ে বসার চেয়ে কিছু কম নয়।
সবাই তো এভাবে বাড়ি ফিরতে পারে না।
কিংবা কেউ কেউ বাড়ি ফিরেও থেকে যেতে চান।
যেমন লিওনেল আন্দ্রেস মেসি।
অন্য ভাষায়—মেসিই ফুটবল।
মেসি বিসিএস ক্যাডার হওয়ার পর, থুক্কু, ২০২২ বিশ্বকাপ জেতার পর অনেকেই বলেছিলেন, তাঁদের ফুটবল আজ পূর্ণতা পেয়েছে।
তাহলে আজ কী হলো?
পূর্ণ কলস খালি হয়ে গেলে একটু আঘাতেই ঝনঝন করে ওঠে।
হ্যাঁ, কান পাতলেই কান্নার শব্দ আসছে।
পৃথিবী কাঁদছে।
