মুক্তদেশ ডেস্ক: বর্ষা শেষ হয়েছে দেড় মাস আগে। কিন্তু পানি নামেনি যশোরের ভবদহ অঞ্চলের অন্তত ২০০ গ্রাম থেকে। তিন মাস ধরে পানিবন্দী এসব গ্রামের লক্ষাধিক মানুষ। অনেক পরিবার ঘরবাড়ি ছেড়ে উঁচু সড়কের পাশে আশ্রয় নিয়েছে। জলাবদ্ধতার কারণে ফসলের মাঠ, বাড়িঘর ও শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান পানিতে তলিয়ে আছে। কোথাও কোথাও বিদ্যালয়ের সামনে জমেছে কচুরিপানা। ব্যাহত হচ্ছে স্বাভাবিক শিক্ষা কার্যক্রম।
দীর্ঘ চার দশক ধরে ভবদহ অঞ্চলের এই জলাবদ্ধতা চলছে। একের পর এক প্রকল্প নেওয়া হলেও স্থায়ী সমাধান হয়নি। এবারও দীর্ঘস্থায়ী জলাবদ্ধতার কারণে দুর্ভোগে থাকা মানুষ স্থায়ী সমাধানের দাবিতে আন্দোলনে নেমেছে। আগামী ৫ অক্টোবর ‘ভবদহ দিবস’ উপলক্ষে পদযাত্রা ও সমাবেশের কর্মসূচি ঘোষণা করেছে ভবদহ পানি নিষ্কাশন সংগ্রাম কমিটি।
সম্প্রতি যশোর শহরের ভোলা ট্যাংক রোডে সংগঠনটির অস্থায়ী কার্যালয়ে সংবাদ সম্মেলনে কর্মসূচি ঘোষণা করা হয়। সংগঠনের ভারপ্রাপ্ত আহ্বায়ক গাজী আবদুল হামিদ এ কর্মসূচি ঘোষণা করেন। তিনি ভবদহ অঞ্চলের স্থায়ী জলাবদ্ধতা নিরসনে আগামী মাঘী পূর্ণিমার আগেই কার্যকর জোয়ারাধার ব্যবস্থাপনা (টিআরএম) চালুর দাবি জানান।
ভবদহ অঞ্চল যশোরের অভয়নগর, মনিরামপুর ও কেশবপুর উপজেলা এবং খুলনার ডুমুরিয়া ও ফুলতলা উপজেলার নিম্নাঞ্চলের অংশ নিয়ে গঠিত। অভয়নগরের ভবানীপুর গ্রামে শ্রী নদীর ওপর নির্মিত ভবদহ স্লুইসগেট দিয়ে ৫৪টি বিলের পানি নিষ্কাশিত হয়।
স্থানীয় নদীগুলোতে দীর্ঘদিন ধরে পলি জমে নাব্যতা কমে যাওয়ায় পানি নিষ্কাশন ব্যবস্থা বাধাগ্রস্ত হচ্ছে। মুক্তেশ্বরী, টেকা, শ্রী ও হরি নদীসহ বিভিন্ন নদ-নদীর নাব্যতা কমে যাওয়ায় বৃষ্টির পানি দ্রুত বের হতে পারে না। ফলে বর্ষার পানি জমে বিল উপচে আশপাশের গ্রামগুলো প্লাবিত হয়।
গত জুলাই মাসে টানা বৃষ্টির পর ভবদহ অঞ্চলের অভয়নগর, মনিরামপুর ও কেশবপুর উপজেলার অন্তত ২০০টি গ্রাম প্লাবিত হয় বলে সংবাদ সম্মেলনে জানানো হয়। এরপর তিন মাস পেরিয়ে গেলেও পানি পুরোপুরি নামেনি।
দীর্ঘদিনের জলাবদ্ধতার প্রভাব পড়েছে শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানেও। অভয়নগরের সুন্দলী ইউনিয়নের ডহর মশিয়াহাটী সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়ের সামনে এখনো পানি জমে আছে। একই অবস্থা ডহর মশিয়াহাটী নিম্নমাধ্যমিক বিদ্যালয়ের সামনেও।
মনিরামপুরের কুলটিয়া ইউনিয়নের বাজে কুলটিয়া সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়ের সামনেও পানি জমে আছে। সেখানে জন্মেছে কচুরিপানা। দীর্ঘদিন পানি জমে থাকায় বিদ্যালয়গুলোয় শিক্ষার্থীদের যাতায়াত ব্যাহত হচ্ছে।
শুধু শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান নয়, পানির নিচে তলিয়ে আছে বিস্তীর্ণ ফসলি জমি, বাড়িঘর ও উপাসনালয়। দীর্ঘদিন পানিবন্দী থাকায় অনেক পরিবার খাদ্য ও অন্যান্য প্রয়োজনীয় সামগ্রীর সংকটে পড়েছে বলে জানিয়েছে ভবদহ পানি নিষ্কাশন সংগ্রাম কমিটি।
ভবদহের জলাবদ্ধতা নিরসনে জোয়ারাধার ব্যবস্থাপনা বা টিআরএম চালুর দাবি দীর্ঘদিনের। নদীর নাব্যতা ফিরিয়ে আনতে জোয়ারের পানির প্রবাহ কাজে লাগিয়ে বিলের মধ্যে পলি জমার প্রক্রিয়াকে কাজে লাগানোই টিআরএমের মূল ধারণা।
গাজী আবদুল হামিদ বলেন, সেনাবাহিনীর মাধ্যমে প্রায় ১৪০ কোটি টাকা ব্যয়ে ৮১ কিলোমিটার নদী সংস্কারের কাজ চলছে। কিন্তু টিআরএম চালু না হওয়ায় এই অর্থ ব্যয় করেও কাঙ্ক্ষিত সুফল না পাওয়ার আশঙ্কা রয়েছে। নদী খননের পর আবার পলি জমে দ্রুত ভরাট হয়ে যাচ্ছে।
ইনস্টিটিউট অব ওয়াটার মডেলিংয়ের (আইডব্লিউএম) প্রস্তাবনা অনুযায়ী আগামী মাঘী পূর্ণিমার আগেই একটি বিলে টিআরএম চালু করার দাবি জানান তিনি। একই সঙ্গে আমডাঙ্গা খাল দ্রুত প্রশস্ত ও পুনঃখননের দাবি জানান।
ভবদহ পানি নিষ্কাশন সংগ্রাম কমিটির পক্ষ থেকে নদী-খাল থেকে কচুরিপানা, নেট-পাটা ও কৃত্রিম বাঁধ অপসারণেরও দাবি জানানো হয়েছে। পাশাপাশি আমডাঙ্গা খালের পুনঃখনন, প্রশস্তকরণ ও জমি অধিগ্রহণের জটিলতা দূর করার দাবি রয়েছে।
২০১৬ সালের ৫ অক্টোবর টিআরএমবিরোধীদের চক্রান্তে পানিবন্দী মানুষের আন্দোলন কর্মসূচিতে পুলিশের হামলা ও নির্যাতনের অভিযোগেরও বিচার দাবি করেছে সংগঠনটি। ওই দিনটিকে স্মরণ করে প্রতিবছর ৫ অক্টোবর ‘ভবদহ দিবস’ পালন করা হয়।
পানি উন্নয়ন বোর্ডের (পাউবো) যশোরের নির্বাহী প্রকৌশলী পলাশ কুমার ব্যানার্জী বলেন, ছয়টি নদীর ৮১ দশমিক ৫ কিলোমিটার পুনঃখননের কাজ চলছে। এবার ভবদহ বিলে পানি প্রায় তিন ফুট বেড়েছিল। তিনি বলেন, ২১ ভেন্টের ভবদহ স্লুইসগেটের সব কটি কপাট খোলা রয়েছে। কপাট দিয়ে পানি বের হচ্ছে। খুব দ্রুত পানি নেমে যাবে বলে আশা করা হচ্ছে।
তবে পানি দ্রুত নেমে যাওয়ার অপেক্ষায় থাকা ভবদহের মানুষের কাছে এটি নতুন কোনো অভিজ্ঞতা নয়। বছরের পর বছর বর্ষা এলেই জলাবদ্ধতা, পানি নামার অপেক্ষা এবং স্থায়ী সমাধানের দাবিতে আন্দোলন—এই চক্রের মধ্যেই কাটছে তাঁদের জীবন। চার দশক ধরে চলা এই সংকটের স্থায়ী সমাধান কবে হবে, সেটিই এখন তাঁদের প্রধান প্রশ্ন।
Add A Comment
