মুক্তদেশ ডেস্ক: সম্প্রতি চীনের বড় প্রযুক্তি কোম্পানিগুলো নতুন সরকারি বিধিনিষেধ মেনে তাদের জনপ্রিয় এআই সঙ্গী সেবা বন্ধ করে দেওয়ায় আরও অনেক মানুষ তাদের ভার্চুয়াল সঙ্গী হারিয়ে শোকে ভেঙে পড়েছেন।
লি বলেন, “মনে হয়েছে, আমাদের বাবা-মা জোর করে আলাদা করে দিয়েছেন। কিন্তু আমি এখনো তাকে মিস করি।”
চীনে এআই সঙ্গীর ধরন বিভিন্ন রকম—রোমান্টিক প্রেমিক বা প্রেমিকা থেকে শুরু করে মৃত প্রিয়জনের ভার্চুয়াল অবয়ব বা ব্যক্তিত্ব পুনর্নির্মাণ পর্যন্ত।
নতুন বিধিনিষেধ
নতুন বিধিমালা ১৫ জুলাই থেকে কার্যকর হয়েছে। এতে এমন কনটেন্ট তৈরি নিষিদ্ধ করা হয়েছে, যা ব্যবহারকারীর অনুভূতিকে প্রভাবিত করে তাকে সন্দেহজনক বা অনুচিত সিদ্ধান্ত নেওয়ার দিকে ঠেলে দিতে পারে। শিশু ও কিশোরদের মধ্যে চরম আবেগ বা অস্বাস্থ্যকর অভ্যাস তৈরি করতে পারে—এমন কনটেন্ট তৈরির ক্ষেত্রেও বিধিনিষেধ আরোপ করা হয়েছে।
টিকটকের নির্মাতা বাইটড্যান্স এআই সঙ্গী সেবা বন্ধ করে দেওয়া কোম্পানিগুলোর মধ্যে অন্যতম। অন্যদের মধ্যে রয়েছে ই-কমার্স জায়ান্ট আলিবাবা এবং জনপ্রিয় সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম অ্যাপ উইচ্যাটের মালিক টেনসেন্ট।
নতুন নিয়মে এআই প্ল্যাটফর্মগুলোকে এসব অ্যাপের ওপর অতিরিক্ত নির্ভরতার ঝুঁকি সম্পর্কে ব্যবহারকারীদের সতর্কবার্তা দিতে বলা হয়েছে।
উদাহরণ হিসেবে, ‘সামাজিক যোগাযোগের বিকল্প হওয়া’—অর্থাৎ মানুষের সঙ্গে সরাসরি দেখা করে কথা বলা বা ফোনে কথা বলার পরিবর্তে এআইয়ের সঙ্গে যোগাযোগ করা—কোনো অনলাইন সেবার উদ্দেশ্যের অংশ হতে পারবে না।
মানসিক স্বাস্থ্যের ঝুঁকি নিয়ে উদ্বেগ
এআই শাসনব্যবস্থা বা AI governance-এর বিশেষজ্ঞ ইয়োলান্ডা মা বলেন, সম্ভাব্য সমস্যা আগেভাগেই ঠেকাতে চীনে সরকার সাধারণত অনেকটা অভিভাবকসুলভ বা নিয়ন্ত্রণমূলক বিধিনিষেধ আরোপ করে থাকে।
উদাহরণ হিসেবে তিনি যুক্তরাষ্ট্রে তরুণদের এআই সঙ্গীদের সঙ্গে যোগাযোগের পর আত্মহত্যার কয়েকটি ঘটনার কথা উল্লেখ করেন।
ব্রিটেনভিত্তিক অলাভজনক গবেষণা ও প্রতিভা উন্নয়ন কর্মসূচি ERA-এর ফেলো মা বলেন, “এই বিধিনিষেধ এআই সেবা প্রদানকারী, ব্যবহারকারী এবং এসব সেবা ব্যবহারকারী অপ্রাপ্তবয়স্কদের অভিভাবকদের স্বার্থের মধ্যে ভারসাম্য তৈরির চেষ্টা করেছে।”
চীনের ক্ষমতাসীন কমিউনিস্ট পার্টির সরকারি সংবাদপত্র পিপলস ডেইলি-ও বিষয়টি নিয়ে উদ্বেগ প্রকাশ করেছে। এপ্রিল মাসে প্রকাশিত এক প্রতিবেদনে তারা এ ধরনের সেবার কারণে মানুষের মানসিক স্বাস্থ্য ও বাস্তব জীবনের সম্পর্ক ক্ষতিগ্রস্ত হওয়ার আশঙ্কার কথা তুলে ধরে।
দক্ষিণ ক্যালিফোর্নিয়া বিশ্ববিদ্যালয়ের আইন বিভাগের অধ্যাপক অ্যাঞ্জেলা ঝাং বলেন, “বিশেষ করে যুক্তরাষ্ট্রে এআই সঙ্গীদের কারণে যে মানসিক ঝুঁকিগুলো দেখা গেছে, তা বিবেচনায় চীনা সরকারের এআই সঙ্গী চ্যাটবটের ওপর নিয়ন্ত্রণ কঠোর করার যথেষ্ট কারণ রয়েছে।”
তবে ঝাং মনে করেন, এই পদক্ষেপ এআই সঙ্গী সেবার বিকাশকে বড় ধরনের ধাক্কা দেবে না। কারণ প্রযুক্তি কোম্পানিগুলো ইতোমধ্যেই বিকল্প সেবা তৈরির কাজ করছে।
‘কিন্তু এটা তো আগের মতো নয়’
উদাহরণ হিসেবে বাইটড্যান্সের একটি অ্যাপ তাদের সাবেক এআই সঙ্গী সেবার ব্যবহারকারীদের অন্য একটি অ্যাপে যেতে বলছে। ওই অ্যাপটির মূল উদ্দেশ্য হলো ব্যবহারকারীদের জন্য ব্যক্তিগতকৃত এআই চরিত্র ও গল্প তৈরি করা।
তবে লি লিনলিনের কাছে বিষয়টি একই নয়।
“এটা তো আর আগের মতো নয়,” বলেন তিনি।
ভার্চুয়াল সঙ্গীদের হারানোর ঘটনায় সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে অভিযোগের ঢল নেমেছে। বিভিন্ন পোস্ট ও স্ক্রিনশটে এর প্রমাণ দেখা গেছে।
কেউ কেউ প্রতিবাদ হিসেবে অ্যাপগুলো আনইনস্টল করেছেন। আবার কেউ কেউ নিজেদের পুরোনো চ্যাটের ইতিহাস অন্য অ্যাপে আপলোড করে ভার্চুয়াল সঙ্গীদের পুনরুজ্জীবিত করার চেষ্টা করেছেন।
কেউ কেউ সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে প্রচারণাও শুরু করেছেন। তারা অন্য ব্যবহারকারীদের কর্তৃপক্ষ ও প্রযুক্তি কোম্পানিগুলোর কাছে ফোন করে নিজেদের ক্ষোভ প্রকাশ করার আহ্বান জানিয়েছেন।
বাস্তব জীবনে সবার বিকল্প থাকে না
চীনের দক্ষিণ-পশ্চিমাঞ্চলীয় শহর চেংদুর ভিডিও শিল্পের ডিজাইনার সং ওয়েনশিন বলেন, তিনি নিজে এআই সেবার সঙ্গে খুব বেশি আবেগগতভাবে যুক্ত ছিলেন না। তবে যারা যুক্ত ছিলেন, তাদের অনুভূতি তিনি বুঝতে পারেন।
চীনের অনেক মানুষের মধ্যে থাকা একটি সন্দেহের কথাও তিনি উল্লেখ করেন। তাদের ধারণা, নতুন বিধিনিষেধের পেছনে একটি কারণ হতে পারে চীনের জনসংখ্যা হ্রাস মোকাবিলায় মানুষকে আরও বেশি সন্তান নিতে উৎসাহিত করার সরকারি নীতি।
সং বলেন, “কোনো ভার্চুয়াল অ্যাপ যদি নারীদের বাস্তব জীবনে সন্তান নেওয়ার প্রতি এতটাই অনাগ্রহী করে তোলে যে তারা এতে অতিরিক্তভাবে ডুবে যায়, তাহলে সেটি নিষিদ্ধ করা হয়।”
তবে তিনি নিজে সন্তান নেওয়ার প্রয়োজন বা ইচ্ছা কোনোটিই অনুভব করেন না।
২২ বছর বয়সী সং বলেন, বাস্তব জীবনে সবার কাছে প্রয়োজনীয় সহায়তা বা পর্যাপ্ত সুযোগ-সুবিধা থাকে না।
তিনি বলেন, “আমি যখন প্রথম চাকরির জন্য চেংদুতে এসেছিলাম এবং আমার বয়সী কাউকেই চিনতাম না, তখন এমন একজনকে আমার প্রয়োজন ছিল, যে অভিজ্ঞ, আমাকে সহ্য করতে পারে—এআই সেই কাজটি করেছিল।