মুুক্তদেশ ডেস্ক: চিকিৎসক সংকটের কারণে অনেক উপজেলা স্বাস্থ্যকেন্দ্রে রোগীদের চিকিৎসা দেওয়া কঠিন হয়ে পড়ে। অথচ বিপুলসংখ্যক রোগী উপজেলা স্বাস্থ্য কমপ্লেক্সে আসেন চিকিৎসা নিতে। অনেক রোগী প্রয়োজনীয় চিকিৎসক না পেয়ে জেলা হাসপাতাল বা রাজধানীমুখী হন। উপজেলা পর্যায়ে চিকিৎসক সংকট কাটাতে বিশেষ বিসিএস পরীক্ষার মাধ্যমে ৫ হাজার চিকিৎসক নিয়োগের উদ্যোগ নিয়েছে বর্তমান সরকার। এর মধ্যে সহকারী সার্জন বা সমমানের মেডিক্যাল অফিসারের ৪ হাজার ৭০০টি এবং সহকারী ডেন্টাল সার্জনের ৩০০টি পদ রয়েছে। নতুন এসব পদ সৃষ্টি ও চিকিৎসক নিয়োগে সরকারের শুধু বেতন-ভাতা খাতে বছরে ব্যয় হবে প্রায় ২৮৭ কোটি ৬৬ লাখ টাকা। এর বাইরে পদ সৃষ্টির প্রশাসনিক ব্যয়, কর্মস্থল পরিচালনা এবং আনুষঙ্গিক ব্যয়ও রয়েছে।
স্বাস্থ্যসেবা বিভাগের প্রস্তাবটি জনপ্রশাসন মন্ত্রণালয়ের মাধ্যমে অর্থ মন্ত্রণালয়ে পাঠানো হয়েছে। ইতোমধ্যে এ সংক্রান্ত সারসংক্ষেপে সই করেছেন অর্থ ও পরিকল্পনামন্ত্রী আমির খসরু মাহমুদ চৌধুরী এবং অর্থ সচিব ড. মো. খায়েরুজ্জামান মজুমদার। অর্থ বিভাগের সম্মতির পর সরকারের প্রয়োজনীয় প্রশাসনিক অনুমোদন মিললে নতুন ৫ হাজার পদ সৃষ্টির পথ খুলবে। এরপর বিশেষ বিসিএসের মাধ্যমে চিকিৎসক নিয়োগের উদ্যোগ নেওয়া হবে বলে সংশ্লিষ্ট সূত্র জানিয়েছে।
এ উদ্যোগ বাস্তবায়িত হলে উপজেলা পর্যায়ে চিকিৎসক সংকট কিছুটা কমবে বলে আশা করা হচ্ছে। বিশেষ করে জরুরি বিভাগ, বহির্বিভাগ ও অন্তর্বিভাগে চিকিৎসকের উপস্থিতি বাড়ানোর পাশাপাশি উপজেলা স্বাস্থ্য কমপ্লেক্সগুলোতে সার্বক্ষণিক চিকিৎসাসেবা নিশ্চিত করার পরিকল্পনা রয়েছে। চিকিৎসকসহ প্রায় সব সরকারি চাকরিজীবীর বিরুদ্ধেই প্রধান অভিযোগ, তারা গ্রামাঞ্চলে থাকতে চান না। তাদের পছন্দের শীর্ষে ঢাকা ও তার আশপাশের
জেলা শহর। তাই গ্রামাঞ্চলে বেশি মানুষ বাস করা সত্ত্বেও সেখানে চিকিৎসক ও নার্সের ঘাটতি রয়েছে। সিংহভাগ উপজেলা কমপ্লেক্সগুলোয় চিকিৎসকের অনেক পদ শূন্য পড়ে আছে। গ্রামাঞ্চলের রোগীদের অভিযোগ, জুনিয়র চিকিৎসকরা অনেক সময় সাধারণ চিকিৎসার জন্যও রোগীদের জেলা সদর হাসপাতাল কিংবা মেডিক্যাল কলেজ হাসপাতালে পাঠিয়ে দেন।
‘বাংলাদেশ হেলথ ওয়ার্কফোর্স স্ট্র্যাটেজি ২০২৪’-এ প্রকাশিত তথ্যে দেখা গেছে, দেশের মোট জনসংখ্যার ৩৮ শতাংশ মানুষ শহরাঞ্চলে বসবাস করে। গ্রাম ও প্রত্যন্ত অঞ্চলে বসবাস ৬২ শতাংশের। অথচ মোট চিকিৎসকের ৭৫ শতাংশ শহরাঞ্চলে এবং ২৫ শতাংশ গ্রাম ও প্রত্যন্ত অঞ্চলে কর্মরত। আর ডেন্টিস্টদের ৫৮ শতাংশ শহরাঞ্চলে ও ৪২ শতাংশ গ্রামে সেবা দেন।
৪৩০ উপজেলা স্বাস্থ্য কমপ্লেক্সে নতুন চিকিৎসক : স্বাস্থ্যসেবা বিভাগের প্রস্তাব অনুযায়ী, দেশের ৪৩০টি উপজেলা স্বাস্থ্য কমপ্লেক্সের প্রয়োজন বিবেচনায় নতুন এসব পদ সৃষ্টি করা হচ্ছে। এর মধ্যে ৩১ শয্যার ৪৮টি, ৫০ শয্যার ৩৭৩টি এবং ১০০ শয্যার ৯টি উপজেলা স্বাস্থ্য কমপ্লেক্স রয়েছে। দেশের বিভিন্ন উপজেলা স্বাস্থ্য কমপ্লেক্সে শয্যা ও অবকাঠামো বাড়লেও সে তুলনায় চিকিৎসক এবং অন্যান্য জনবল বাড়েনি। অনেক স্বাস্থ্যকেন্দ্রে অনুমোদিত পদের তুলনায় কর্মরত চিকিৎসকের সংখ্যা কম। কোথাও কোথাও একজন চিকিৎসককে বহির্বিভাগে রোগী দেখা, জরুরি বিভাগে দায়িত্ব পালন এবং আন্তঃবিভাগের রোগীদের চিকিৎসা একসঙ্গে সামলাতে হয়। ফলে রোগীর চাপ বাড়লে উপজেলা স্বাস্থ্য কমপ্লেক্সগুলোতে সেবা প্রদান কঠিন হয়ে পড়ে। রাতের জরুরি সেবা, ছুটির দিনের চিকিৎসা এবং হাসপাতালে ভর্তি রোগীদের সার্বক্ষণিক তদারকির ক্ষেত্রেও চিকিৎসক সংকট বড় সমস্যা হয়ে ওঠে। এই অবস্থায় উপজেলা পর্যায়ে চিকিৎসক সংখ্যা বাড়াতে ৪ হাজার ৭০০ সহকারী সার্জন বা সমমানের মেডিক্যাল অফিসার এবং ৩০০ সহকারী ডেন্টাল সার্জনের পদ সৃষ্টির প্রস্তাব করা হয়েছে।
উপজেলা পর্যায়ে মানসম্মত স্বাস্থ্যসেবা নিশ্চিত করতে বিএনপি নেতৃত্বাধীন সরকার নতুন করে প্রাথমিক ও মাধ্যমিক পর্যায়ের সরকারি স্বাস্থ্যসেবা ব্যবস্থার দিকে মনোযোগ দিয়েছে। সরকারের পরিকল্পনায় উপজেলা স্বাস্থ্য কমপ্লেক্সের আন্তঃবিভাগে ভর্তি রোগীদের জন্য সার্বক্ষণিক চিকিৎসক উপস্থিতি নিশ্চিত করার বিষয়টিও গুরুত্ব পাচ্ছে। নতুন চিকিৎসক নিয়োগের মাধ্যমে এ ব্যবস্থার বাস্তবায়ন সহজ হবে বলে মনে করছেন সংশ্লিষ্টরা।
গতকাল চট্টগ্রামের বাঁশখালীতে এক জনসভায় প্রতিটি উপজেলা স্বাস্থ্য কমপ্লেক্সকে ১০০ শয্যায় উন্নীত করার ঘোষণা দিয়েছেন প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমান। তিনি বলেন, উপজেলা স্বাস্থ্য কমপ্লেক্সে যে ৫০টি শয্যা রয়েছে, তার ৩০টি শয্যা করেছিলেন শহীদ রাষ্ট্রপতি জিয়াউর রহমান। ২০টি করেছিলেন সাবেক প্রধানমন্ত্রী খালেদা জিয়া। অল্প সময়ের মধ্যে এই হাসপাতালকে ১০০ শয্যায় উন্নীত করার পরিকল্পনা নেওয়া হবে।
বিশেষ বিসিএস পরীক্ষার মাধ্যমে ৫ হাজার চিকিৎসক নিয়োগের ব্যাপারে ডক্টরস অ্যাসোসিয়েশন অব বাংলাদেশের (ড্যাব) মহাসচিব ডা. জহিরুল ইসলাম শাকিল আমাদের সময়কে বলেন, চিকিৎসক সংকট কাটাতে এটি যুগান্তকারী পদক্ষেপ। বর্তমান সরকারের এ সিদ্ধান্তে জনগণ বিরাট সুবিধা পাবে। প্রত্যন্ত অঞ্চলেরও চিকিৎসাসেবা নিশ্চিত হবে। চিকিৎসকদের চাকরিতে প্রবেশের বয়সসীমা আরও দুই বছর বৃদ্ধি করা জরুরি। কারণ চিকিৎসকদের পড়াশোনায় বেশি সময় লাগে। তা ছাড়া মেডিক্যাল কলেজের শিক্ষকদের অবসরের বয়স ৬৫ নির্ধারণ করা দরকার।
শুধু বেতনেই ব্যয় ২৮৮ কোটি টাকা : নতুন ৫ হাজার পদ সৃষ্টি হলে সরকারের রাজস্ব ব্যয় উল্লেখযোগ্যভাবে বাড়বে। প্রস্তাব অনুযায়ী, এসব পদে চিকিৎসক নিয়োগের পর শুধু বেতন-ভাতা বাবদ বছরে সরকারের ব্যয় হবে প্রায় ২৮৭ কোটি ৬৬ লাখ টাকা।
করোনায় সামনে এসেছিল স্বাস্থ্যব্যবস্থার দুর্বলতা : দেশের সরকারি স্বাস্থ্যসেবার সীমাবদ্ধতা সবচেয়ে স্পষ্টভাবে সামনে আসে করোনাভাইরাস মহামারীর সময়। তখন রাজধানীর বাইরের হাসপাতালগুলোতে চিকিৎসক, নার্স, চিকিৎসা সরঞ্জাম এবং বিশেষায়িত সেবার ঘাটতি নিয়ে ব্যাপক আলোচনা হয়। করোনা পরিস্থিতি মোকাবিলায় ২০১৯-২০ অর্থবছরে শুধু স্বাস্থ্যসেবা বিভাগেই ১৫ হাজার ৩৮৮টি নতুন পদ সৃষ্টি করা হয়েছিল। এর মধ্যে ৬ হাজার সহকারী সার্জন বা সমমানের পদ এবং ৪ হাজার সিনিয়র স্টাফ নার্সের পদ ছিল উল্লেখযোগ্য। মহামারীর সময় স্বাস্থ্য খাতের জনবল বাড়ানোর এ উদ্যোগের পরও দেশের বিভিন্ন উপজেলা ও প্রান্তিক পর্যায়ে চিকিৎসক সংকট পুরোপুরি কাটেনি। কারণ পদ সৃষ্টি ও নিয়োগের পাশাপাশি চিকিৎসকদের কর্মস্থলে উপস্থিতি, বদলি, উচ্চশিক্ষা এবং অন্যান্য প্রশাসনিক কারণে বিভিন্ন এলাকায় চিকিৎসক সংকট তৈরি হয়। করোনা মহামারীর সেই অভিজ্ঞতা পুরোপুরি কাটিয়ে ওঠার মধ্যেই ডেঙ্গু ও হামসহ বিভিন্ন সংক্রামক রোগের প্রাদুর্ভাব আবার স্বাস্থ্যব্যবস্থার ওপর চাপ বাড়িয়েছে।
চলতি অর্থবছরেই ১৫ হাজার ৮২০ নতুন পদ : স্বাস্থ্য খাতে নতুন কর্মসংস্থান সৃষ্টির বৃহত্তর পরিকল্পনার অংশ হিসেবেও চিকিৎসকের নতুন পদ তৈরির উদ্যোগ নেওয়া হয়েছে। চলতি অর্থবছরে শুধু স্বাস্থ্য খাতেই পদ সৃষ্টি করে ১৫ হাজার ৮২০ জনকে নিয়োগ দেওয়ার পরিকল্পনা রয়েছে। এর মধ্যে ৭১০২টি সুপারনিউমারারি পদ, ৩৪৮০টি সিনিয়র স্টাফ নার্স, ৯৭৪টি মিডওয়াইফ এবং ৩৫০০টি সহকারী সার্জন/সমমানের পদ রয়েছে।
বিশেষ বিসিএসের মাধ্যমে দ্রুত নিয়োগ : সরকারের পরিকল্পনা অনুযায়ী, নতুন পদগুলো অনুমোদিত হলে বিশেষ বিসিএস পরীক্ষার মাধ্যমে চিকিৎসক নিয়োগের উদ্যোগ নেওয়া হবে। সাধারণ বিসিএসের দীর্ঘ প্রক্রিয়ার তুলনায় বিশেষ বিসিএসের মাধ্যমে চিকিৎসক নিয়োগ দ্রুত সম্পন্ন করার সুযোগ রয়েছে। নতুন নিয়োগপ্রাপ্ত চিকিৎসকদের উপজেলা পর্যায়ের হাসপাতালগুলোতে পদায়নকে অগ্রাধিকার দেওয়া হতে পারে। তবে পদ সৃষ্টি হলেই নিয়োগ সম্পন্ন হবে না। নতুন পদে নিয়োগের জন্য সরকারকে কয়েকটি প্রশাসনিক ও আর্থিক প্রক্রিয়া সম্পন্ন করতে হবে। এর মধ্যে অর্থ বিভাগের সম্মতি, প্রয়োজনীয় প্রশাসনিক অনুমোদন, পদগুলোর বেতনস্কেল নির্ধারণ এবং সংশ্লিষ্ট বিধিবিধানের সঙ্গে সামঞ্জস্য আনার বিষয় রয়েছে। প্রশাসনিক উন্নয়নসংক্রান্ত সচিব কমিটির সুপারিশ এবং সরকারের চূড়ান্ত অনুমোদনও এ প্রক্রিয়ার অংশ হতে পারে।
চিকিৎসক ধরে রাখাও চ্যালেঞ্জ : শুধু নিয়োগ দিয়েই চিকিৎসক সংকটের স্থায়ী সমাধান সম্ভব হবে না বলে মনে করছেন সংশ্লিষ্টরা। কারণ উপজেলা পর্যায়ে চিকিৎসকদের ধরে রাখা একটি চ্যালেঞ্জ। অনেক চিকিৎসক প্রত্যন্ত অঞ্চলে নিয়োগ পেলেও পরবর্তী সময়ে উচ্চশিক্ষা, বদলি বা বিভিন্ন প্রশাসনিক কারণে কর্মস্থল পরিবর্তন করেন। এ কারণে চিকিৎসকদের জন্য কর্মস্থলে নিরাপদ ও মানসম্মত আবাসন, প্রয়োজনীয় চিকিৎসা সরঞ্জাম, সহায়ক জনবল এবং কাজের উপযোগী পরিবেশ নিশ্চিত করার প্রয়োজন রয়েছে। উপজেলা স্বাস্থ্য কমপ্লেক্সে শুধু চিকিৎসক থাকলেই সেবা নিশ্চিত হবে না। রোগ নির্ণয়ের জন্য ল্যাবরেটরি, ওষুধ, অ্যাম্বুলেন্স, নার্স, মেডিক্যাল টেকনোলজিস্ট এবং অন্যান্য সহায়ক জনবলের সমন্বিত ব্যবস্থা প্রয়োজন। আমাদের সময়
