মুক্তদেশ ডেস্ক: কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা (এআই) শুধু সফটওয়্যার বা চিপের চাহিদাই বাড়াচ্ছে না, বরং সেগুলো পরিচালনার জন্য প্রয়োজনীয় বিশাল অবকাঠামোর চাহিদাও দ্রুত বাড়ছে। এই সুযোগ কাজে লাগাতে চায় কানাডার ভ্যাঙ্কুভারভিত্তিক প্রযুক্তি প্রতিষ্ঠান জেনাটেক (ZenaTech)। প্রতিষ্ঠানটি ZenaWorx নামে একটি নতুন প্ল্যাটফর্ম তৈরি করছে, যা ড্রোন, LiDAR এবং ডিজিটাল টুইন প্রযুক্তি ব্যবহার করে বড় আকারের এআই ডেটা সেন্টারের নির্মাণকাজ পর্যবেক্ষণে সহায়তা করবে।
ঘোষণার পর বিনিয়োগকারীরা ইতিবাচক প্রতিক্রিয়া দেখিয়েছেন। ওই দিন জেনাটেকের শেয়ারের দাম প্রায় ১৪ শতাংশ বেড়ে যায়। এটি এআই অবকাঠামো ও নির্মাণপ্রযুক্তি-সংশ্লিষ্ট কোম্পানিগুলোর প্রতি বিনিয়োগকারীদের বাড়তি আগ্রহের প্রতিফলন।
ZenaWorx কীভাবে কাজ করে
ZenaWorx-এর মূল ধারণা সহজ হলেও এর প্রযুক্তি অত্যন্ত উন্নত। জেনাটেকের ড্রোন নির্মাণাধীন প্রকল্পের ওপর দিয়ে উড়ে LiDAR তথ্য সংগ্রহ করে। LiDAR হলো লেজারভিত্তিক মানচিত্র তৈরির প্রযুক্তি, যা জরিপ ও স্বয়ংচালিত যানবাহনে ব্যাপকভাবে ব্যবহৃত হয়।
সংগৃহীত তথ্য থেকে নির্মাণস্থলের একটি অত্যন্ত নিখুঁত ত্রিমাত্রিক (৩ডি) ডিজিটাল মানচিত্র বা ডিজিটাল টুইন তৈরি করা হয়। এরপর সেটিকে স্থাপত্য নকশার সঙ্গে তুলনা করে কোথায় নির্মাণকাজ পরিকল্পনার চেয়ে এগিয়ে, কোথায় পিছিয়ে বা কোথায় নকশা থেকে বিচ্যুতি ঘটেছে—তা দ্রুত শনাক্ত করা যায়।
এআই ডেটা সেন্টার নির্মাণে সাধারণত ১২ থেকে ৩৬ মাস সময় লাগে এবং এতে শত শত মিলিয়ন ডলার ব্যয় হয়। ফলে সামান্য বিলম্ব বা পুনর্নির্মাণও বড় ধরনের আর্থিক ক্ষতির কারণ হতে পারে। প্রচলিতভাবে নির্মাণ অগ্রগতি পর্যবেক্ষণে সরেজমিন পরিদর্শন ও পর্যায়ক্রমিক আলোকচিত্রের ওপর নির্ভর করা হয়। জেনাটেকের দাবি, নিয়মিত ড্রোন উড্ডয়ন এবং স্বয়ংক্রিয় ৩ডি বিশ্লেষণের মাধ্যমে একই কাজ আরও দ্রুত ও কম খরচে করা সম্ভব।
এই সফটওয়্যার বাজারজাত করবে জেনাটেকের দুটি বাণিজ্যিক বিভাগ—
- Drone as a Service (DaaS) বিভাগ, যার মাধ্যমে উত্তর আমেরিকাজুড়ে অধিগ্রহণ করা ২০টির বেশি জরিপ ও পরিদর্শন প্রতিষ্ঠান পরিচালিত হচ্ছে।
- Enterprise SaaS বিভাগ, যা সরকারি ও করপোরেট গ্রাহকদের সাবস্ক্রিপশনভিত্তিক সফটওয়্যার সরবরাহ করে।
বিদ্যমান বিক্রয় নেটওয়ার্কের মাধ্যমেই নতুন এই সেবা দেওয়ার পরিকল্পনা করেছে প্রতিষ্ঠানটি।
জেনাটেকের প্রধান নির্বাহী কর্মকর্তা শন প্যাসলি বলেন, ZenaWorx প্রকল্প পরিচালনাকারীদের নির্মাণের পুরো সময়জুড়ে আরও স্পষ্ট নজরদারি ও ব্যয় নিয়ন্ত্রণের সুযোগ করে দেবে।
এআই অবকাঠামো আরও দক্ষভাবে নির্মাণের লক্ষ্য
তবে ZenaWorx বর্তমানে বাজারে বাণিজ্যিকভাবে চালু হওয়া কোনো পণ্য নয়। জেনাটেক জানিয়েছে, সফটওয়্যারটি এখনো প্রাথমিক উন্নয়ন পর্যায়ে রয়েছে।
প্রতিষ্ঠানটি একটি সম্ভাব্য বেটা গ্রাহক চিহ্নিত করেছে, যারা কয়েকশ একরজুড়ে একটি এআই ডেটা সেন্টার নির্মাণের প্রস্তুতি নিচ্ছে। সেই প্রকল্পেই প্রথমবারের মতো প্রযুক্তিটি পরীক্ষামূলকভাবে ব্যবহারের আশা করছে জেনাটেক।
অর্থাৎ, শেয়ারের দাম বৃদ্ধি বিদ্যমান আয়ের প্রতিফলন নয়; বরং ভবিষ্যতের সম্ভাবনাকে ঘিরে বিনিয়োগকারীদের আশাবাদের বহিঃপ্রকাশ।
জেনাটেকের মতে, উত্তর আমেরিকায় এআই ডেটা সেন্টার নির্মাণ বাজার ২০৩০ সাল পর্যন্ত বছরে প্রায় ৩০ শতাংশ হারে বাড়তে পারে। ক্লাউড সেবা ও এআই কোম্পানিগুলোর ক্রমবর্ধমান কম্পিউটিং সক্ষমতার চাহিদাই এই প্রবৃদ্ধির মূল চালিকা শক্তি।
২০২৫ সাল থেকে ২০টির বেশি প্রতিষ্ঠান অধিগ্রহণের মাধ্যমে ভূমি জরিপ, ভূ-স্থানিক মানচিত্রায়ন ও অবকাঠামো পরিদর্শনে নিজেদের সক্ষমতা বাড়িয়েছে জেনাটেক। তবে এই বাজারে আগে থেকেই শক্তিশালী প্রতিযোগী রয়েছে। তাই নতুন প্রতিষ্ঠান হিসেবে সফল হতে হলে স্পষ্ট দক্ষতা ও খরচ সাশ্রয়ের সুবিধা দেখাতে হবে।
জেনাটেকের কৌশলের সঙ্গে ZenaWorx-এর সম্পর্ক
ZenaWorx কোনো বিচ্ছিন্ন উদ্যোগ নয়। গত এক বছরে জেনাটেক “Drone as a Service” কৌশলের আওতায় বিভিন্ন প্রতিষ্ঠিত ভূমি জরিপ ও পরিদর্শন প্রতিষ্ঠান অধিগ্রহণ করে সেগুলোকে নিজেদের ড্রোন ও সফটওয়্যার প্ল্যাটফর্মে একীভূত করেছে।
২০২৬ সালের প্রথম প্রান্তিকে কোম্পানির আয় দাঁড়ায় ৮.৪ মিলিয়ন ডলার, যা আগের বছরের একই সময়ের তুলনায় ৬৪০ শতাংশ বেশি। এর মধ্যে মোট আয়ের প্রায় ৯৩ শতাংশ এসেছে Drone as a Service বিভাগ থেকে।
ZenaWorx এই ব্যবসায়িক মডেলকেই আরও এগিয়ে নিয়ে যাচ্ছে—যেখানে ড্রোন হার্ডওয়্যারের সঙ্গে পুনরাবৃত্ত সফটওয়্যার আয় যুক্ত হবে।
এ ছাড়া জেনাটেক জরিপ, অবকাঠামো পরিদর্শন, কৃষি, গুদাম ব্যবস্থাপনা ও প্রতিরক্ষা খাতের জন্যও ড্রোন তৈরি করছে। কোম্পানিটি তাইওয়ান, দক্ষিণ কোরিয়া ও সংযুক্ত আরব আমিরাতসহ এশিয়া ও মধ্যপ্রাচ্যের বিভিন্ন দেশেও কার্যক্রম সম্প্রসারণ করেছে।
জাপানও বর্তমানে ক্লাউড কম্পিউটিং ও জেনারেটিভ এআইয়ের বাড়তি চাহিদা মেটাতে একাধিক বৃহৎ ডেটা সেন্টার নির্মাণে বিনিয়োগ করছে। ফলে নির্মাণকাজকে আরও দক্ষ করার প্রযুক্তির গুরুত্ব ভবিষ্যতে আরও বাড়তে পারে।
সামনে কী
স্বল্পমেয়াদে ZenaWorx-এর সবচেয়ে বড় পরীক্ষা হবে—বেটা পর্যায়ের সম্ভাব্য গ্রাহকের সঙ্গে পরীক্ষামূলক সম্পর্কটি পূর্ণাঙ্গ বাণিজ্যিক চুক্তিতে রূপ নেয় কি না এবং বাস্তব প্রকল্পে ব্যবহারের পর এটি সময়সূচি ও ব্যয় নিয়ন্ত্রণে বাস্তব সাশ্রয় দেখাতে পারে কি না।
জেনাটেক এখন পর্যন্ত অধিগ্রহণ ও দ্রুত রাজস্ব বৃদ্ধির ওপর জোর দিলেও এখনও লাভজনক হতে পারেনি। প্রথম প্রান্তিকে রাজস্ব বাড়লেও কোম্পানির নিট লোকসানও বেড়েছে।
ZenaWorx তাৎক্ষণিকভাবে সেই পরিস্থিতি বদলে দেবে না। তবে বৈশ্বিক এআই অবকাঠামো বিনিয়োগ বাড়তে থাকায় এটি জেনাটেককে একটি স্বতন্ত্র সফটওয়্যার পণ্য হিসেবে নতুন সুযোগ এনে দিতে পারে।
সবশেষে, ZenaWorx-এর সাফল্য নির্ভর করবে পরীক্ষামূলক প্রকল্প থেকে পূর্ণাঙ্গ বাণিজ্যিক ব্যবহারে যেতে পারা এবং জটিল এআই অবকাঠামো নির্মাণে প্রকৃত অর্থে সময় ও ব্যয় সাশ্রয়ের প্রমাণ দিতে পারার ওপর।
