মুক্তদেশ ডেস্ক: রাষ্ট্রপতি মো. সাহাবুদ্দিনের পদত্যাগের মধ্য দিয়ে দেশের সর্বোচ্চ সাংবিধানিক পদে সৃষ্টি হয়েছে শূন্যতা। সংবিধান অনুযায়ী নির্ধারিত সময়ের মধ্যেই নতুন রাষ্ট্রপতি নির্বাচন করতে হবে। তবে এটি কেবল একটি সাংবিধানিক আনুষ্ঠানিকতা নয়; বরং দেশের বর্তমান রাজনৈতিক বাস্তবতায় এটি হয়ে উঠেছে ক্ষমতাসীন বিএনপির জন্য গুরুত্বপূর্ণ রাজনৈতিক পরীক্ষা। সংসদে সংখ্যাগরিষ্ঠতা থাকায় রাষ্ট্রপতি নির্বাচনে বিএনপির প্রার্থী জয়ী হওয়ার পথ তুলনামূলক সহজ হলেও, সেই প্রার্থী কে হবেন- দলীয় রাজনীতির অভিজ্ঞ কোনো নেতা, নাকি সর্বমহলে গ্রহণযোগ্য অরাজনৈতিক ব্যক্তিত্ব; এই প্রশ্ন ঘিরেই তৈরি হয়েছে নানামুখী আলোচনা, হিসাব-নিকাশ ও চাপ।
রাষ্ট্রপতি নির্বাচনে সামনে রেখে একদিকে যেমন বিএনপির অভ্যন্তরে মতামত ও পছন্দ-অপছন্দের সমীকরণ রয়েছে, অন্যদিকে বিরোধী রাজনৈতিক দল, নাগরিক সমাজ, আন্তর্জাতিক অংশীদার এবং সাধারণ মানুষের প্রত্যাশাও বিবেচনায় নিতে হচ্ছে সরকারকে। রাজনৈতিক বিশ্লেষকদের মতে, সাম্প্রতিক রাজনৈতিক পরিবর্তনের পর দেশের গণতান্ত্রিক প্রতিষ্ঠানগুলোর প্রতি আস্থা পুনর্গঠনের যে চ্যালেঞ্জ সামনে এসেছে, সেখানে নতুন রাষ্ট্রপতির ব্যক্তিত্ব, গ্রহণযোগ্যতা, সাংবিধানিক নিরপেক্ষতা ও সংকট মোকাবিলার সক্ষমতা বিশেষ গুরুত্ব বহন করবে। ফলে রাষ্ট্রপতি নির্বাচন এবার কেবল একটি সাংবিধানিক প্রক্রিয়াই নয়, বরং সরকারের রাজনৈতিক বার্তা, ভবিষ্যৎ রাষ্ট্র পরিচালনার দর্শন এবং গণতান্ত্রিক অঙ্গীকারেরও গুরুত্বপূর্ণ সূচক হিসেবে বিবেচিত হচ্ছে।
স্থানীয় সরকার, পল্লী উন্নয়ন ও সমবায়মন্ত্রী এবং বিএনপি মহাসচিব মির্জা ফখরুল ইসলাম আলমগীর বলেন, আগামীতে দেশের নতুন রাষ্ট্রপতি কে হবেন বিএনপির দলীয় নাকি বাইরের কেউ, তা নির্ধারণ করা হবে দলের নীতিনির্ধারণী ফোরামের বৈঠকে। সংবিধান ও প্রয়োজনীয় আইন মেনে দলের স্থায়ী কমিটির বৈঠকে আলোচনা শেষে এ বিষয়ে চূড়ান্ত সিদ্ধান্ত জানা যাবে।
রাষ্ট্রপতি পদত্যাগ করার পর বিএনপির পক্ষে কাকে মনোনয়ন দেওয়া হতে পারে এমন প্রশ্নে মির্জা ফখরুল বলেন, বিএনপি সভা করবে, স্ট্যান্ডিং কমিটির মিটিং হবে। আমাদের তো কোনো মিটিংই হয়নি এখনও। বৈঠকের পরই বিএনপির চূড়ান্ত সিদ্ধান্ত জানা যাবে।
গতকাল বিএনপির গুরুত্বপূর্ণ দুই নেতা আমাদের সময়কে বলেন, রাষ্ট্রপতি নিয়োগ ইস্যুতে দ্রুতই দলের জাতীয় স্থায়ী কমিটির বৈঠক ডেকে একটা সিদ্ধান্তে পৌঁছাতে হবে। তা না হলে রাষ্ট্রপতি নিয়োগ ইস্যুতে দলের মধ্যে মতপার্থক্য দেখা দিতে পারে। এ কারণে লাগামহীন বক্তব্যও কোনো কোনো নেতা দিতে পারেন- যা বিএনপি ও দলীয় প্রধানকে বিব্রতকর পরিস্থিতির মুখোমুখি দাঁড় করাতে পারে। এ ছাড়া এই সুযোগে প্রধান বিরোধী দল জামায়াতসহ মাঠে থাকা রাজনৈতিক দল ফায়দা নিয়ে সরকারের ওপর নতুন চাপ তৈরি করতে পারে। সবদিক বিবেচনা করে দ্রুত সিদ্ধান্ত নিতে হবে।
রাজনৈতিক বিশ্লেষকরা মনে করেন, রাষ্ট্রপতি মোঃ সাহাবুদ্দিনের পদত্যাগ এবং নতুন রাষ্ট্রপতি নির্বাচন ঘিরে দলের অভ্যন্তরে জটিলতা হওয়া স্বাভাবিক। কারণ সবারই পছন্দ-অপছন্দ আছে। এই অবস্থায় দলের অভ্যন্তরে রাজনৈতিক ঐকমত্য তৈরি করাই হবে ক্ষমতাসীন বিএনপির প্রধান চ্যালেঞ্জ। রাষ্ট্রপতি নির্বাচন ইস্যুতে নিজ দলের বাইরেও বিভিন্ন রাজনৈতিক দল ও জনগণের মনোভাব বিবেচনায় নেবে- এমন প্রত্যাশাও করেন রাজনৈতিক বিশ্লেষকরা। সুশাসনের জন্য নাগরিকের (সুজন) সম্পাদক বদিউল আলম মজুমদার আমাদের সময়কে বলেন, নতুন রাষ্ট্রপতি নিয়োগে দেশি-বিদেশি চাপ থাকতে পারে। তবে তার প্রত্যাশা নতুন রাষ্ট্রপতি নির্বাচনে দেশের জনগণ ও দেশের স্বার্থকে প্রাধান্য দেবে ক্ষমতাসীন দল বিএনপি ও তার সরকার। যেহেতু আমরা ইতিহাসের সবচেয়ে কলঙ্কিত রাষ্ট্রপতি থেকে সম্প্রতি মুক্তি পেয়েছি।
সরকার সংশ্লিষ্ট দায়িত্বশীলরা বলছেন, রাষ্ট্রপতি মোঃ সাহাবুদ্দিনের পদত্যাগের পর সাংবিধানিক ধারাবাহিকতার পাশাপাশি দেশি-বিদেশি বহুমাত্রিক রাজনৈতিক চাপ ও অর্থনৈতিক সংকট মোকাবিলায় সরকারকে বিভিন্ন দিক বিবেচনায় নিতে হচ্ছে। বিশেষ করে দেশের রাজনৈতিক স্থিতিশীলতা রক্ষা, সংবিধানের বিধান প্রতিপালন এবং বহুমুখী গুজব ও দেশি-বিদেশি রাষ্ট্র ও সংস্থার চাপ মোকাবিলায় সরকার নানামুখী চ্যালেঞ্জের মুখোমুখি হতে পারে। এর মধ্যে দলের ভেতরে-বাইরে রাজনৈতিক ভিন্ন ভিন্ন প্রতিক্রিয়াও অন্যতম।
রাজনৈতিক বিশ্লেষকরা বলছেন, যেহেতু সংবিধানের ১২৩ অনুচ্ছেদ অনুযায়ী পরবর্তী ৯০ দিনের মধ্যে নতুন রাষ্ট্রপতি নির্বাচন সম্পন্ন করতে হবে। তাই ক্ষমতাসীন দলের সংখ্যাগরিষ্ঠতা থাকলেও ভবিষ্যতের কথা বিবেচনায় সবার কাছে গ্রহণযোগ্য ব্যক্তিত্ব খুঁজে নিতে সরকারকে এই মুহূর্তে বড় ধরনের চ্যালেঞ্জের মুখোমুখি হতে হচ্ছে। লক্ষ্য রাখতে হবে সংসদের বিরোধী দলসহ অন্য রাজনৈতিক দলের সঙ্গে সমন্বয় সাধন এবং রাষ্ট্রপতি নির্বাচনকে কেন্দ্র করে দেশে যেন কোনো ধরনের রাজনৈতিক অস্থিরতা না হয়; বরং গণতান্ত্রিক ধারাকে সমুন্নত রাখা। বিশেষ করে প্রতিবেশী ভারতের সঙ্গে সম্পর্কের টানাপড়েন নিরসনসহ আন্তর্জাতিক ও আঞ্চলিক সহযোগিতার ক্ষেত্রে দেশের স্বার্থ রক্ষা করাও গুরুত্বপূর্ণ বলে বিবেচনা করা হচ্ছে। তারা বলছেন, বর্তমান প্রেক্ষাপট একটি ছাত্র-জনতার অভ্যুত্থানের ফসল। কিন্তু পরবর্তী নির্বাচন বিএনপির কাছে আরও বেশি গুরুত্ব বহন করে। সেই বিবেচনায় বিএনপি হয়তো ক্ষমতাচ্যুত আওয়ামী লীগের মতো দলীয় ব্যক্তিকে রাষ্ট্রপতি নিয়োগ দিয়ে ভবিষ্যতের পথে হাঁটবে না। ফলে দেশি-বিদেশি চাপের চেয়ে বিএনপি দেশ ও দলের স্বার্থ প্রাধান্য দেবে।
এদিকে, জাতীয় সংসদের আগামী অধিবেশনে নতুন রাষ্ট্রপতি নির্বাচিত হবেন বলে আশা প্রকাশ করেন আইনমন্ত্রী মো. আসাদুজ্জামান। তিনি বলেন, ‘সংবিধানের ১২৩ এর (২) অনুচ্ছেদ অনুসারে পদত্যাগের ৯০ দিনের মধ্যে নতুন রাষ্ট্রপতি নির্বাচন করতে হবে। ২৪ অক্টোবর পর্যন্ত সময় আছে। সুতরাং বিশেষ অধিবেশন ডাকার মতো কোনো পরিস্থিতি এখন তৈরি হয়নি। যেহেতু ১৫ জুলাই থেকে ৬০ দিনের মধ্যে আমাদের পরবর্তী অধিবেশন হওয়ার কথা সাংবিধানিকভাবে; আশা করি, সেই অধিবেশনে এটা করা সম্ভব হবে।’
রাষ্ট্রবিজ্ঞানী ড. মাহবুব উল্লাহ আমাদের সময়কে বলেন, সরকার পরিচালনায় প্রতিটি ক্ষেত্রে নানা ধরনের চাপ থাকে। তবে রাষ্ট্রপতি নিয়োগ কিংবা বাছাইয়ে খুব একটা চাপ থাকে না। রাষ্ট্রপতি পদত্যাগ করেছেন এখন যারা সংখ্যাগরিষ্ঠতা নিয়ে সরকারে আছে তাদের সমর্থনেই পরবর্তী রাষ্ট্রপতি নিয়োগ পাবে। সেক্ষেত্রে দলীয় নাকি দলের বাইরের কেউ রাষ্ট্রপতি হচ্ছেন সেটাও তারা দলীয় ফোরামে সিদ্ধান্ত নিয়ে সংসদে সেই সিদ্ধান্ত বাস্তবায়ন করা হবে বলে মনে করছি। তিনি বলেন, সংসদ সদস্যদের ভোটে রাষ্ট্রপতি নির্বাচিত হন, তাই ক্ষমতাসীন দলের সংখ্যাগরিষ্ঠতার কারণে প্রার্থীর ওপর দলীয় আনুগত্যের একটি অদৃশ্য চাপ থাকে। তবে অতীতে রাষ্ট্রপতির পদ নিয়ে রাজনৈতিক বিতর্ক ও মেরুকরণ তৈরি হওয়ার ইতিহাস থাকায় নতুন রাষ্ট্রপতি নিয়োগে প্রতিটি সিদ্ধান্ত জনসমক্ষে স্বচ্ছ হওয়া জরুরি। কেননা দেশের বর্তমান রাজনৈতিক পরিস্থিতিতে বিরোধী দল ও বিভিন্ন জোটের পক্ষ থেকে সাংবিধানিক পদগুলোয় স্বচ্ছতা ও জবাবদিহিতার কড়া দাবি রয়েছে।
গত শুক্রবার রাষ্ট্রপতি মোঃ সাহাবুদ্দিন পদত্যাগের পর থেকে নতুন রাষ্ট্রপতি কে হচ্ছেন- এই নিয়ে সম্ভাব্যদের তালিকা বড় হচ্ছে। দলের মহাসচিব মির্জা ফখরুল ইসলাম আলমগীর, জাতীয় স্থায়ী কমিটির সদস্য ড. খন্দকার মোশাররফ হোসেন, গয়েশ^রচন্দ্র রায়, ড. আবদুল মঈন খান, নজরুল ইসলাম খান ও বেগম সেলিমা রহমানের নামও আলোচনায় এসেছে। আলোচনায় এসেছে ভারপ্রাপ্ত রাষ্ট্রপতি হাফিজ উদ্দিন আহমদের নামও।
আলোচনায় যুক্ত হয়েছে, সদ্য বিদায়ী অন্তর্বর্তীকালীন সরকারের প্রধান উপদেষ্টা ড. মুহাম্মদ ইউনূস, ঢাকা বিশ^বিদ্যালয়ের সাবেক অধ্যাপক মাহবুবউল্লাহ এবং কেবিনেট সেক্রেটারি নাসিমুল গনি ও সাবেক প্রধান বিচারপতি সৈয়দ রেফাত আহমদ। তবে এর বাইরে সম্প্রতি জাতিসংঘে বাংলাদেশের স্থায়ী প্রতিনিধি ও রাষ্ট্রদূত হিসেবে নিয়োগ পাওয়া আইরিন খানের নামও শোনা যাচ্ছে বিএনপির নেতাকর্মীদের আলোচনায়।
বিএনপির জাতীয় স্থায়ী কমিটির একজন সদস্য বলেন, দলের মধ্যে দুই ধরনের ব্যক্তিদের নিয়ে আলোচনা চলছে। একটা হচ্ছে রাজনীতিবিদ, অপরটি রাজনীতির বাইরের অন্য কেউ। সেক্ষেত্রে দলের বেশির ভাগের অবস্থান রাজনীতিবিদদের দিকে। কারণ বিগত দিনে দেখা গেছে, যখনই কোনো জটিল পরিস্থিতির তৈরি হয়েছে রাজনীতিবিদ রাষ্ট্রপতি পরিস্থিতি ভালোভাবে মোকাবিলা করতে পেরেছেন।
বিএনপি চেয়ারম্যানের উপদেষ্টা সৈয়দ মোয়াজ্জেম হোসেন আলাল বলেন, রাজনৈতিক ও অরাজনৈতিক রাষ্ট্রপতি নির্বাচন করার অভিজ্ঞতা বিএনপির আছে এবং তিনি মনে করেন দলের শীর্ষ নেতৃত্ব নিশ্চয়ই সেসব অভিজ্ঞতা বিবেচনায় নেবে। রাজনৈতিক ব্যক্তিত্ব আব্দুর রহমান বিশ্বাস জেনারেল নাসিমের ক্যু ঠেকিয়ে দিয়ে গণতন্ত্রকে সমুন্নত রেখে প্রশংসিত হয়েছিলেন, অন্যদিকে ইয়াজউদ্দিন আহম্মেদের পর ওয়ান ইলেভেন এসেছিল। এসব চিন্তা করলে রাজনৈতিক ব্যক্তিত্বরাই এ পদের জন্য শ্রেয় হবেন।
বিএনপির সিনিয়র যুগ্ম মহাসচিব রুহুল কবির রিজভী আমাদের সময়কে বলেন, ‘বিভিন্ন রাজনৈতিক দল ও সামাজিক সংগঠনের পক্ষ থেকে সাবেক রাষ্ট্রপতির পদত্যাগ, আইনি পদক্ষেপ বা গ্রেপ্তারের দাবি ঘিরে তৈরি হওয়া ভিন্ন ভিন্ন রাজনৈতিক অবস্থান গুরুত্ব সহকারে আমলে নেবে সরকার। এ ছাড়া রাষ্ট্রপতি ইস্যুকে কেন্দ্র করে গণমাধ্যমসহ চারপাশের নানা গুঞ্জন ও অপ্রচার রোধ করে জনমনে স্বস্তি বজায় রাখতেও সরকারের চ্যালেঞ্জ আছে। সেক্ষেত্রে রাষ্ট্রের গুরুত্বপূর্ণ প্রতিষ্ঠানগুলোর কার্যকারিতা বজায় রাখা এবং প্রশাসনিক শৃঙ্খলা রক্ষা করাও অন্যতম। একই সঙ্গে নতুন রাষ্ট্রপতি নির্বাচন ও রাজনৈতিক রূপান্তরে ক্ষমতার ভারসাম্য রক্ষা এবং সাংবিধানিক নিরপেক্ষতা বজায় রাখাও সরকারের অন্যতম চ্যালেঞ্জ বলে অভিহিত করেন তিনি।
এক প্রশ্নে রিজভী বলেন, পরবর্তী রাষ্ট্রপতি কে হবেন, সে বিষয়ে এখনই কোনো চূড়ান্ত সিদ্ধান্ত হয়নি। বিষয়টি নিয়ে দলের উচ্চপর্যায়ে আলোচনা ও সিদ্ধান্ত নেওয়া হবে।
বিএনপির গুরুত্বপূর্ণ একজন নেতা বলেন, রাষ্ট্রপতি নির্বাচন ইস্যুতে পরিস্থিতি জটিল হলে শেষ পর্যন্ত হাফিজ উদ্দিন আহমদকেই বিএনপি রাষ্ট্রপতি হিসেবে বেছে নিতে পারে। আমাদের সময়
