মুক্তদেশ ডেস্ক: বিশ্বকাপের আলো-ছায়া
আলোচিত-সমালোচিত ও বিতর্কিত ১৫ ঘটনা
২০২৬ বিশ্বকাপ শুধু স্পেনের শিরোপা জয় কিংবা লিওনেল মেসির শেষ বিশ্বকাপের গল্প নয়। ৩৪ দিনের এই মহাযজ্ঞে যেমন জন্ম হয়েছে অসংখ্য রূপকথার; তেমনি বিতর্ক, সমালোচনা আর প্রশ্নবিদ্ধ সিদ্ধান্তও ছায়া ফেলেছে পুরো আসরে। কেপ ভার্দের অবিশ্বাস্য যাত্রা, নরওয়ের ইতিহাস গড়া, এমিলিয়ানো মার্টিনেজের দুর্দান্ত গোলকিপিং কিংবা লামিনে ইয়ামালের উত্থান যেমন কোটি দর্শককে মুগ্ধ করেছে; ঠিক তেমনি টিকিটের আকাশছোঁয়া দাম, ভিএআর বিতর্ক, রাজনৈতিক প্রভাবের অভিযোগ, ফাইনালের পর খেলোয়াড়দের সংঘর্ষ এবং ফিফার বাণিজ্যিকীকরণ নিয়ে তীব্র সমালোচনাও হয়েছে বিশ্বজুড়ে। মাঠের লড়াইয়ের পাশাপাশি মাঠের বাইরের ঘটনাগুলোও সমানভাবে আলোচনার জন্ম দিয়েছে। ২০২৬ বিশ্বকাপের সবচেয়ে আলোচিত, সমালোচিত ও বিতর্কিত ১৫ ঘটনার দিকে আলোকপাত করা যাক।
শেষ বিশ্বকাপে ‘মেসি ম্যানিয়া’
২০২৬ বিশ্বকাপ শুরুর আগেই প্রশ্ন উঠেছিল, ৩৯ বছর বয়সে লিওনেল মেসি কি আরেকবার আর্জেন্টিনাকে টেনে নিতে পারবেন; নাকি বয়সের চোখ রাঙানিতে হার মানবেন। টুর্নামেন্ট শেষেও উত্তর মেসির পক্ষেই গেল। ফাইনালে শিরোপা না জিতলেও পুরো আসরের সবচেয়ে আলোচিত ফুটবলার ছিলেন তিনিই। গ্রুপ পর্ব থেকেই আক্রমণের নেতৃত্ব দেন মেসি। শেষ ষোলোতে কেপ ভার্দের বিপক্ষে গোল করে বিশ্বকাপে টানা অষ্টম ম্যাচে গোল করার রেকর্ড গড়েন। সে ম্যাচে তিনি বিশ্বকাপে ৩০ ম্যাচ খেলা প্রথম ফুটবলারও হন।
নকআউট পর্বে গোলের পাশাপাশি প্লে-মেকার হিসেবেও দারুণ কার্যকর ছিলেন তিনি। প্রতিপক্ষের ডিফেন্সকে ব্যস্ত রেখেছেন, সতীর্থদের জন্য সুযোগ তৈরি করেছেন এবং গুরুত্বপূর্ণ মুহূর্তে নেতৃত্ব দিয়েছেন। টুর্নামেন্টজুড়ে তার প্রতিটি স্পর্শই ছিল আলোচনার বিষয়। ফাইনালে অবশ্য স্পেনের শৃঙ্খলাবদ্ধ রক্ষণ তাকে প্রায় নিষ্ক্রিয় করে দেয়। পুরো ম্যাচে মাত্র ৫৪ বার বল স্পর্শ করেন, যা তার বিশ্বকাপ ক্যারিয়ারের হতাশাজনক রেকর্ড। আর্জেন্টিনা গোলমুখে একটি শটও লক্ষ্যে রাখতে পারেনি।
শেষ বাঁশির পর মেসির অশ্রুসিক্ত মুখ বিশ্বকাপের অন্যতম প্রতীকী ছবিতে পরিণত হয়। এমনকি স্পেনের অধিনায়ক রদ্রিও ট্রফি হাতে নেওয়ার পর প্রথমেই মেসির প্রতি শ্রদ্ধা জানান। এটা অবশ্য স্বাভাবিক। এক হ্যাটট্রিকসহ অগুনতি রেকর্ডের মালা গলায় পরে আট গোল ও চার অ্যাসিস্ট নিয়ে বিশ্বকাপ শেষ করা তো শ্রদ্ধারই। সব মিলিয়ে ছয় বিশ্বকাপে ২১ গোল আর ১২ অ্যাসিস্ট নিয়ে কিংবদন্তির কাতারেই আছেন মেসি।
হার না মানা আর্জেন্টিনার ‘কামব্যাক’
বিশ্বকাপ শিরোপা ধরে রাখতে পারেনি আর্জেন্টিনা। কিন্তু পুরো টুর্নামেন্টে তাদের সবচেয়ে বড় পরিচয় ছিল লড়াই করে ফিরে আসার মানসিকতা। কঠিন পরিস্থিতি থেকে ঘুরে দাঁড়ানোর উদাহরণ রেখে আসর মাতিয়েছে লিওনেল স্কালোনির দল। সবচেয়ে বড় পরীক্ষা আসে শেষ ষোলোতে অভিষিক্ত কেপ ভার্দের বিপক্ষে। দুবার এগিয়ে গিয়েও স্বস্তিতে থাকতে পারেনি আর্জেন্টিনা। দুবারই সমতায় ফিরে আসে আফ্রিকার দলটি। শেষ পর্যন্ত অতিরিক্ত সময়ে আত্মঘাতী গোলে ৩-২ ব্যবধানে জিতে কোয়ার্টার ফাইনালে ওঠে আর্জেন্টিনা।
এরপর মিসরের সঙ্গে দুই গোলে পিছিয়ে থেকেও মাত্র ১৩ মিনিটে তিন গোল করে আসরের সেরা কামব্যাকের গল্প লেখেন মেসিরা। সেমিতে ইংল্যান্ডের বিপক্ষে পিছিয়ে পড়েও ২-১ গোলের জয়ে রূপকথার জন্ম দেয় আর্জেন্টিনা। ফাইনালেও ৯০+ মিনিট ১০ জন নিয়ে স্পেনকে আটকে রেখেছিল আর্জেন্টিনা। শেষ পর্যন্ত অতিরিক্ত সময়ে হারলেও পুরো টুর্নামেন্টজুড়ে তাদের লড়াকু মানসিকতা প্রশংসিত হয়েছে। চ্যাম্পিয়ন হতে না পারলেও ২০২৬ বিশ্বকাপে ‘হার না মানা’ দলের প্রতীক হয়ে ওঠে আর্জেন্টিনা।
গোলকিপারদের বীরত্বের বিশ্বকাপ
২০২৬ বিশ্বকাপে যতটা আলোচনা হয়েছে আক্রমণভাগ নিয়ে, ঠিক ততটাই আলোচনায় ছিলেন গোলরক্ষকরা। অনেক ম্যাচের ভাগ্য নির্ধারণ হয়েছে তাদের অসাধারণ সেভে। সবচেয়ে বেশি আলোচনার জন্ম দিয়েছেন কেপ ভার্দের ৪০ বছর বয়সি গোলরক্ষক ভোজিনহা। পুরো টুর্নামেন্টের অন্যতম বিস্ময় ছিলেন তিনি। স্পেন ও আর্জেন্টিনার মতো শক্তিশালী দলের বিপক্ষে একের পর এক অবিশ্বাস্য সেভ করে তিনি বিশ্বজুড়ে আলোচনায় আসেন। বিশেষ করে আর্জেন্টিনার বিপক্ষে মেসির নিশ্চিত গোল ফিরিয়ে দেওয়া মুহূর্তটি টুর্নামেন্টের অন্যতম স্মরণীয় দৃশ্য হয়ে আছে।
এছাড়াও প্যারাগুয়ের অরল্যান্ডো গিল, ইরানের আলিরেজা বেইরানভান্দ ও কুরাসাওয়ের এলয় রুম দেখিয়েছেন অসাধারণ বীরত্ব। শেষ বত্রিশে গিল টাইব্রেকারে বিদায় করে দেন জার্মানিকে। আলিরেজা বেলজিয়ামের বিপক্ষে সাতটি সেভ করে দলকে এনে দেন এক পয়েন্ট। এলয় রুম ইকুয়েডরের বিপক্ষে এক ম্যাচেই করেন ১৫টি সেভ, ৯০ মিনিটের বিশ্বকাপ ইতিহাসে যা সর্বোচ্চ সেভের রেকর্ড। মরক্কোর ইয়াসিন বোনো নেদারল্যান্ডসের বিপক্ষে টাইব্রেকারে হয়ে ওঠেন নায়ক। জাপানের জিওন সুজুকিও ছিলেন আসরের অন্যতম উজ্জ্বল মুখ।
স্পেনের ইনাই সিমন এবারের আসরে মাত্র একটি গোল হজম করে জিতে নেন সেরা গোলরক্ষকের পুরস্কার। আর্জেন্টিনার এমিলিয়ানো মার্তিনেজ ফাইনালে স্পেনের বিপক্ষে ১১টি সেভ করেন, যা গত ৬০ বছরের বিশ্বকাপ ফাইনালের মধ্যে সর্বোচ্চ।
কেপ ভার্দের রূপকথা
বিশ্বকাপে প্রথম অংশগ্রহণ, অথচ বিদায় নিয়েও কোটি কোটি ফুটবলপ্রেমীর হৃদয় জিতে নিয়েছে কেপ ভার্দে। পাঁচ লাখেরও কম জনসংখ্যার দেশটি দেখিয়ে দিয়েছে, সাহস থাকলে ফুটবলে অসম্ভব বলে কিছু নেই। গ্রুপ পর্বে স্পেন, উরুগুয়ে ও সৌদি আরবের বিপক্ষে দুর্দান্ত পারফরম্যান্স করে নকআউটে উঠে তারা। শেষ ষোলোতে বর্তমান চ্যাম্পিয়ন আর্জেন্টিনাকে ১২০ মিনিট পর্যন্ত চরম পরীক্ষায় ফেলে দেয়। দুবার পিছিয়ে পড়েও দুবার সমতায় ফিরে আসে কেপ ভার্দে। শেষ পর্যন্ত আত্মঘাতী গোলে ৩-২ ব্যবধানে হেরে তাদের স্বপ্নভঙ্গ হয়।
কোচ বুবিস্তা ম্যাচ শেষে বলেন, ছোট দেশ হয়েও বিশ্বের সেরাদের সঙ্গে সমানে লড়াই করতে পারা তাদের সবচেয়ে বড় অর্জন। তার মতে, এ টুর্নামেন্ট কেপ ভার্দের নতুন প্রজন্মকে বড় স্বপ্ন দেখাবে। ভোজিনহার গোলকিপিং, সিডনি লোপেস কাবরালের গোল এবং পুরো দলের নির্ভীক ফুটবল কেপ ভার্দেকে নিরপেক্ষ সমর্থকদের দ্বিতীয় প্রিয় দলে পরিণত করে। শিরোপা জেতেনি; কিন্তু ২০২৬ বিশ্বকাপের সবচেয়ে সুন্দর রূপকথার নাম ছিল কেপ ভার্দে।
নরওয়ের ‘ভাইকিং উৎসব’
১৯৯৮ সালের পর প্রথমবার বিশ্বকাপে ফিরে নরওয়ে শুধু মাঠেই নয়, গ্যালারিতেও দারুণ ছাপ রেখে গেছে। আর্লিং হালান্ডের নেতৃত্বে দলটির পারফরম্যান্স যেমন আলোচনায় ছিল, তেমনি ভাইকিং পোশাকে হাজারো সমর্থকের উপস্থিতি বিশ্বকাপের অন্যতম আকর্ষণে পরিণত হয়। মার্কিন যুক্তরাষ্ট্র, কানাডা ও মেক্সিকোর বিভিন্ন ভেন্যুতে নরওয়ের সমর্থকরা ঐতিহ্যবাহী ভাইকিং হেলমেট, পতাকা ও গান নিয়ে উৎসবের আবহ তৈরি করেন। সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে তাদের ছবি ও ভিডিও ব্যাপকভাবে ভাইরাল হয়। সবচেয়ে বেশি আলোচনায় ছিল ম্যাচ জিতে নরওয়ের খেলোয়াড়দের ঢোলের শব্দের সঙ্গে ‘রো.. রো’ করে নৌকা চালানোর অঙ্গভঙ্গি। আয়োজক দেশগুলোর বিভিন্ন শহরে নরওয়ে সমর্থকদের অংশগ্রহণকে অনেক আন্তর্জাতিক সংবাদমাধ্যম ‘ভাইকিং ইনভেশন’ বলেও উল্লেখ করেছে। ফুটবল, সংস্কৃতি ও উৎসবÑতিনটিরই অনন্য মিশেল ছিল সমর্থকদের উপস্থিতিতে। ২০২৬ বিশ্বকাপের সবচেয়ে রঙিন ফ্যান-সংস্কৃতির কথা উঠলে নরওয়ের ভাইকিং উৎসব নিঃসন্দেহে প্রথম সারিতেই থাকবে।
সমালোচিত পাঁচ ঘটনা
টিকিটের আকাশছোঁয়া দাম
২০২৬ বিশ্বকাপ মাঠের ফুটবলের মতোই আলোচনায় ছিল টিকিটের মূল্য। ৪৮ দলের সম্প্রসারিত এ বিশ্বকাপে দর্শকসংখ্যা রেকর্ড ছুঁলেও অনেক সমর্থকের অভিযোগ ছিল স্টেডিয়ামে খেলা দেখা সাধারণ মানুষের নাগালের বাইরে চলে গেছে। এ আসরে দর্শক উপস্থিতি রেকর্ড ছুঁলেও সবচেয়ে বড় সমালোচনা ছিল টিকিটের দাম সাধারণ সমর্থকদের জন্য বিলাসী হয়ে ওঠা। গ্রুপ পর্বের টিকিট ৬০ ডলার থেকে শুরু হলেও নকআউটে দাম দ্রুত বেড়ে যায়। ফাইনালের সাধারণ টিকিটের মূল্য ১০ হাজার ডলারের কাছাকাছি পৌঁছায়, আর আতিথেয়তা প্যাকেজ ও পুনঃবিক্রির বাজারে কিছু টিকিটের দাম ২৮ হাজার ডলার ছাড়িয়ে যায়। এমনকি কিছু অনানুষ্ঠানিক সেলার তালিকায় আরো বেশি দামও দেখা যায়।
বিশ্বকাপজুড়ে সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে অসংখ্য সমর্থক অভিযোগ করেনÑভ্রমণ, আবাসন ও টিকিট মিলিয়ে একটি ম্যাচ দেখতে যে ব্যয় হয়েছে, তা অনেক পরিবারের সামর্থ্যের বাইরে। সমর্থকদের সংগঠনগুলো ফিফার কাছে আরো বেশি সাশ্রয়ী মূল্যের টিকিট বরাদ্দের দাবি জানায়। ইংল্যান্ডের ডিফেন্ডার মার্ক গেহি প্রকাশ্যেই এই মূল্যকে ‘রাবিশ’ বলে সমালোচনা করেন। যুক্তরাষ্ট্রের মিডফিল্ডার টিমোথি ওয়েহও বলেন, এত দাম সাধারণ সমর্থকদের জন্য অযৌক্তিক। ফিফা অবশ্য বাজার চাহিদার যুক্তি দেখিয়ে মূল্য নির্ধারণকে সমর্থন করে।
বিশ্লেষকদের মতে, ডায়নামিক প্রাইসিং এবং করপোরেট আতিথেয়তা থেকে সর্বোচ্চ আয় করার নীতিই সমর্থকদের ক্ষোভের প্রধান কারণ। অনেক স্টেডিয়ামে প্রিমিয়াম আসন খালি থাকলেও সাধারণ সমর্থকরা টিকিটের নাগাল পাননি। ২০২৬ বিশ্বকাপের সবচেয়ে বড় সমালোচনা হিসেবে তাই টিকিটের মূল্যই উঠে এসেছে।
হাইড্রেশন ব্রেকে ‘ম্যাচের ছন্দ নষ্ট’
উত্তর আমেরিকার তীব্র গরম সামনে রেখে এবারের বিশ্বকাপে প্রতিটি ম্যাচেই বাধ্যতামূলক তিন মিনিটের হাইড্রেশন ব্রেক চালু করে ফিফা। খেলোয়াড়দের নিরাপত্তার জন্য নেওয়া এ সিদ্ধান্ত শেষ পর্যন্ত অন্যতম বিতর্কিত ইস্যুতে পরিণত হয়। বেশ কজন কোচ ও সাবেক ফুটবলার অভিযোগ করেন, এই বিরতিতে ম্যাচের স্বাভাবিক গতি ভেঙে যায়। যে দল আক্রমণের ধারায় ছিল, তারা ছন্দ হারায়; অন্যদিকে চাপে থাকা দল নতুন করে নিজেদের সংগঠিত করার সুযোগ পায়। সমর্থকদের একাংশের অভিযোগ ছিল, এটি সম্প্রচার ও বিজ্ঞাপনের সুবিধাও বাড়িয়েছে।
অন্যদিকে খেলোয়াড় ও চিকিৎসকরা এ সিদ্ধান্তকে সমর্থন করেন। তাদের মতে, তাপমাত্রা ও আর্দ্রতা অনেক ভেন্যুতেই খেলোয়াড়দের জন্য ঝুঁকিপূর্ণ পর্যায়ে পৌঁছেছিল। তাই পানির বিরতি না দিলে হিট স্ট্রোক বা পানিশূন্যতার ঝুঁকি বাড়ত। ফিফার গ্লোবাল ফুটবল ডেভেলপমেন্ট প্রধান আর্সেন ভেঙ্গার জানিয়েছেন, চিকিৎসকদের পরামর্শেই এ সিদ্ধান্ত নেওয়া হয়েছে এবং তথ্য-উপাত্ত অনুযায়ী এর ফলে ম্যাচের ফলাফলে কোনো প্রভাব পড়েনি। তবে ভবিষ্যতে এ নিয়ম বহাল থাকবে কি নাÑতা নিয়ে টুর্নামেন্ট শেষে পর্যালোচনা করা হবে। ফলে নিরাপত্তা ও খেলার স্বাভাবিক ছন্দÑএ দুইয়ের ভারসাম্য নিয়ে নতুন বিতর্কের জন্ম দিয়েছে ২০২৬ বিশ্বকাপের হাইড্রেশন ব্রেক।
ভিসানীতিতে ভোগান্তি, বিশ্বকাপেও রাজনীতি
যুক্তরাষ্ট্র, কানাডা ও মেক্সিকো যৌথভাবে বিশ্বকাপ আয়োজন করলেও বিশেষ করে যুক্তরাষ্ট্রের কঠোর ভিসানীতির কারণে হাজারো সমর্থক, সাংবাদিক ও ফুটবল-সংশ্লিষ্ট ব্যক্তিকে চরম ভোগান্তির মুখে পড়তে হয়। বেশ কয়েকটি দেশের নাগরিকদের দীর্ঘ নিরাপত্তা যাচাই, সাক্ষাৎকার এবং অনুমোদনের অপেক্ষায় থাকতে হয়েছে। কেউ কেউ নির্ধারিত সময়ে ভিসা না পাওয়ায় ম্যাচই দেখতে পারেননি। বিষয়টি নিয়ে সমর্থক সংগঠনগুলো অভিযোগ করে, বিশ্বকাপের মতো বৈশ্বিক আসরের জন্য বিশেষ ভিসা ব্যবস্থা থাকা উচিত ছিল।
সবচেয়ে আলোচিত ঘটনা ছিল সোমালিয়ার আন্তর্জাতিক রেফারি ওমর আবদুলকাদির আরতানের যুক্তরাষ্ট্রে প্রবেশ করতে না পারা। শেষ পর্যন্ত তিনি বিশ্বকাপে দায়িত্বই পালন করতে পারেননি। বিষয়টি নিয়ে উয়েফা প্রকাশ্যে ক্ষোভ প্রকাশ করে এবং পরে তাকে ইউরোপিয়ান সুপার কাপ পরিচালনার দায়িত্ব দেয়।
ফুটবল-সংশ্লিষ্টদের মতে, খেলোয়াড়দের মতো ম্যাচ অফিসিয়ালদেরও যদি ভিসা জটিলতার মুখে পড়তে হয়, তাহলে বিশ্বকাপের সর্বজনীনতার ধারণাই প্রশ্নের মুখে পড়ে। ফলে বিশ্বকাপ শেষ হলেও ভবিষ্যতের বড় ক্রীড়া আসরগুলোর জন্য ভিসা প্রক্রিয়া সহজ করার দাবি জোরালো হয়েছে।
রাজনীতির বেড়াজালে ইরানের ‘দুঃস্বপ্নের বিশ্বকাপ’
২০২৬ বিশ্বকাপে ইরানকে ঘিরে কেবল মাঠের পারফরম্যান্স নয়, রাজনৈতিক পরিস্থিতিও বড় আলোচনায় ছিল। মধ্যপ্রাচ্যের চলমান উত্তেজনা এবং যুক্তরাষ্ট্রের নিরাপত্তা নীতির কারণে ইরানি সমর্থক, সাংবাদিক ও প্রতিনিধিদের অতিরিক্ত যাচাই-বাছাইয়ের মুখে পড়তে হয়। উয়েফা সভাপতি আলেক্সান্ডার চেফেরিন পরে জানান, ইরান-সংক্রান্ত কিছু ম্যাচ পরিচালনা ও প্রশাসনিক সিদ্ধান্ত নিয়েও ফিফার সঙ্গে তাদের মতবিরোধ হয়েছিল। এ ঘটনাগুলো শেষ পর্যন্ত ফিফা ও উয়েফার সম্পর্কে প্রভাব ফেলে।
সবচেয়ে আলোচনার বিষয় ছিল, ইরানের খেলোয়াড়দের ম্যাচ শেষেই যুক্তরাষ্ট্র ছেড়ে চলে যাওয়া। ইরান ক্যাম্প করেছিল মেক্সিকোতে। ফলে প্রতি ম্যাচেই দীর্ঘ ভ্রমণক্লান্তি পেরিয়ে মাঠে নেমে ম্যাচ শেষেই ফিরে যেতে হয়েছে এশিয়ার দলটিকে। এতে ম্যাচে ঠিকঠাক মনোযোগ দিতে পারেনি তারা। এ নিয়ে আসর চলাকালে সমালোচনায় ভেসে গিয়েছিল যুক্তরাষ্ট্র। অবশ্য আয়োজক কর্তৃপক্ষ নিরাপত্তা ঝুঁকির যুক্তি তুলে ধরে নিজেদের অবস্থান ব্যাখ্যা করে। মানবাধিকার কর্মীদের মতে, বিশ্বকাপে সব দেশের সমর্থকের জন্য সমান সুযোগ নিশ্চিত করা উচিত ছিল। ফলাফলের দিকটি ছাপিয়ে ২০২৬ বিশ্বকাপে ইরানকে ঘিরে প্রশাসনিক সিদ্ধান্তগুলো ফুটবলের বাইরে আন্তর্জাতিক রাজনীতির প্রভাবের দিকটাই উঠে এসেছে।
বিশ্বকাপে ফিফার ‘বাণিজ্য বিতান’
২০২৬ বিশ্বকাপ ছিল ইতিহাসের সবচেয়ে বড় এবং সবচেয়ে বেশি আয় করা বিশ্বকাপগুলোর একটি। কিন্তু সে সাফল্যের আড়ালেই উঠে এসেছে অতিরিক্ত বাণিজ্যিকীকরণের অভিযোগ। ডায়নামিক টিকিটের মূল্য, করপোরেট আতিথেয়তা, ভিআইপি অভিজ্ঞতা, স্পনসরশিপ ও বিশ্বকাপ ফাইনালে প্রথমবারের মতো সুপার বোলের আদলে হাফ টাইম শোÑসব মিলিয়ে অনেক সমালোচকের মতে, ফুটবলের চেয়ে বিনোদন ও ব্যবসাই বেশি গুরুত্ব পেয়েছে।
বিশেষ করে ফাইনালে ২৭ মিনিটের বিরতি নিয়ে সমর্থকদের একাংশ ক্ষুব্ধ প্রতিক্রিয়া জানান। অনেকের মতে, ঐতিহ্যগত ফুটবলের ছন্দ ভেঙে দিয়ে এটি ছিল সম্প্রচার ও বাণিজ্যিক স্বার্থকে অগ্রাধিকার দেওয়ার উদাহরণ। দ্য গার্ডিয়ান তাদের বিশ্লেষণে লিখেছে, এ বিশ্বকাপ ছিল ‘জাঁকজমক, বিতর্ক ও আপসের’ এক মিশ্র রূপ, যেখানে ফুটবলের পাশাপাশি বাণিজ্যিক ও রাজনৈতিক বিষয়ও সমানভাবে প্রভাব ফেলেছে।
ফিফা অবশ্য বলছে, সম্প্রসারিত বিশ্বকাপ পরিচালনা, অবকাঠামো উন্নয়ন ও বৈশ্বিক ফুটবলে বিনিয়োগ বাড়াতে এই রাজস্ব অপরিহার্য। কিন্তু সমর্থকদের বড় অংশের প্রশ্নÑবিশ্বকাপ কি ধীরে ধীরে সাধারণ মানুষের উৎসব থেকে করপোরেট পণ্যে পরিণত হচ্ছে!
বিতর্কিত পাঁচ ঘটনা
হলুদ ও লাল কার্ড ছাপিয়ে ‘ট্রাম্পকার্ড’
২০২৬ বিশ্বকাপের সবচেয়ে বড় প্রশাসনিক বিতর্কগুলোর একটি ছিল যুক্তরাষ্ট্রের স্ট্রাইকার ফোলারিন বালোগানকে ঘিরে। নকআউট পর্বে লাল কার্ড দেখায় ফিফার নিয়মানুযায়ী পরের ম্যাচে তার এক ম্যাচের নিষেধাজ্ঞা কার্যকর হওয়ার কথা ছিল। কিন্তু ফিফা ট্রাম্পের আদেশে বালোগানের শাস্তি স্থগিত রাখার সিদ্ধান্ত নেয়। এর ফলে বালোগানকে বেলজিয়ামের বিপক্ষে শেষ ষোলোর ম্যাচে দেখা যায়। এ সিদ্ধান্তে তীব্র প্রতিক্রিয়া জানায় উয়েফা। সংস্থাটির সভাপতি আলেক্সান্ডার সেফেরিন এটিকে শৃঙ্খলাবিধির ব্যতিক্রমী ও অস্বচ্ছ কাজ বলে মন্তব্য করেন। পরবর্তীতে তিনি বিশ্বকাপ ফাইনালও বয়কট করেন।
বিতর্ক আরো বাড়ে যখন আন্তর্জাতিক সংবাদমাধ্যমে দাবি করা হয়, বিষয়টি রাজনৈতিক পর্যায় পর্যন্ত গড়িয়েছিল এবং ফিফার সিদ্ধান্তের ওপর রাজনৈতিক প্রভাবের অভিযোগ ওঠে; যার কেন্দ্রবিন্দুতে ছিলেন যুক্তরাষ্ট্রের প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প। যদিও ফিফা জানায়, তাদের শৃঙ্খলা কমিটি স্বাধীনভাবেই সিদ্ধান্ত নিয়েছে। ফুটবল-সংশ্লিষ্টদের মতে, এ ঘটনা শুধু একটি খেলোয়াড়ের নিষেধাজ্ঞা নিয়ে বিতর্ক ছিল না; বরং ফুটবলের শৃঙ্খলা প্রক্রিয়ার স্বচ্ছতা ও ফিফা-উয়েফা সম্পর্কের টানাপোড়েনকেও সামনে নিয়ে আসে।
ট্রাম্প-ইনফান্তিনো সম্পর্ক ও রাজনৈতিক হস্তক্ষেপ
২০২৬ বিশ্বকাপে মাঠের ফুটবলের পাশাপাশি সবচেয়ে আলোচিত বিষয়গুলোর একটি ছিল ফিফা সভাপতি জিয়ান্নি ইনফান্তিনো এবং যুক্তরাষ্ট্রের প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্পের ঘনিষ্ঠ সম্পর্ক। টুর্নামেন্টজুড়ে বিভিন্ন সিদ্ধান্তে রাজনৈতিক প্রভাবের অভিযোগ ওঠে, যা ফুটবল বিশ্বে ব্যাপক বিতর্কের জন্ম দেয়। বিশেষ করে যুক্তরাষ্ট্রের ফরোয়ার্ড ফোলারিন বালোগানের লাল কার্ডের নিষেধাজ্ঞা প্রত্যাহারের ঘটনাকে কেন্দ্র করে সে বিতর্ক চরমে পৌঁছায়। ট্রাম্প নিজেই স্বীকার করেন, তিনি ইনফান্তিনোকে ফোন করে ঘটনাটি পুনর্বিবেচনার অনুরোধ করেছিলেন, যদিও তিনি দাবি করেন কোনো চাপ সৃষ্টি করেননি।
ব্রিটিশ সংবাদমাধ্যম ‘দ্য গার্ডিয়ান’ এক বিশ্লেষণে লিখেছে, ইনফান্তিনো যুক্তরাষ্ট্র সরকারের সঙ্গে সুসম্পর্ক গড়ে তোলার চেষ্টা করতে গিয়ে ফিফাকে অপ্রয়োজনীয়ভাবে রাজনৈতিক বিতর্কে জড়িয়ে ফেলেছেন। তাদের ভাষ্য, স্বাগতিক দেশের সঙ্গে সমন্বয় করা এক বিষয়; কিন্তু রাজনৈতিক নেতার সঙ্গে অতিরিক্ত ঘনিষ্ঠতা ফুটবলের বিশ্বাসযোগ্যতাকেই ক্ষতিগ্রস্ত করেছে।
বিশ্বকাপ শেষ হলেও ট্রাম্প-ইনফান্তিনো সম্পর্ককে ঘিরে বিতর্ক থামেনি। অনেকের মতে, ২০২৬ বিশ্বকাপ দেখিয়ে দিয়েছে বিশ্বফুটবলের সর্বোচ্চ আসর এখন শুধু ক্রীড়া প্রতিযোগিতা নয়; রাজনীতি, ক্ষমতা ও কূটনৈতিক প্রভাবেরও এক গুরুত্বপূর্ণ মঞ্চ।
ভিএআর ও রেফারিং বিতর্ক
পুরো ২০২৬ বিশ্বকাপজুড়েই রেফারিং এবং ভিএআরের সিদ্ধান্ত ছিল আলোচনার কেন্দ্রবিন্দু। তবে বিতর্কের চূড়ান্ত রূপ দেখা যায় ফাইনালে। অতিরিক্ত সময়ে নিকো উইলিয়ামস বল জালে পাঠালেও মিকেল মেরিনোর বিরুদ্ধে ফাউলের সিদ্ধান্ত দিয়ে গোল বাতিল করেন রেফারি স্লাভকো ভিনচিচ। রিপ্লেতে সংস্পর্শ খুবই সামান্য মনে হওয়ায় প্রশ্ন ওঠে, এটি আদৌ স্পষ্ট ফাউল ছিল কি না। আরো বড় প্রশ্ন ছিলÑএত গুরুত্বপূর্ণ মুহূর্তে কেন ভিএআর রেফারিকে অন-ফিল্ড রিভিউর পরামর্শ দিল না।
শুধু ফাইনাল নয়, টুর্নামেন্টের বিভিন্ন ম্যাচেও ভিএআরের ধারাবাহিকতা নিয়ে সমালোচনা হয়। রাউন্ড অব সিক্সটিনে আর্জেন্টিনার বিপক্ষে মিসরের জিকোর গোল বাতিল বেশ সমালোচনার জন্ম দেয়। আবার কোথাও সামান্য সংস্পর্শে হস্তক্ষেপ, আবার কোথাও একই ধরনের ঘটনায় নীরব থাকাÑএই অসংগতিই বিতর্ককে আরো বাড়িয়ে তোলে। রেফারি কমিটির সাবেক সদস্যদের মতে, প্রযুক্তি থাকলেও তার প্রয়োগে ধারাবাহিকতা না থাকলে বিতর্ক কমে না, বরং বেড়ে যায়। ২০২৬ বিশ্বকাপ সেই বাস্তবতারই নতুন উদাহরণ হয়ে থাকল।
ভিসা জটিলতায় বিশ্বকাপ মিস
বিশ্বকাপ শুরু হওয়ার আগেই বড় ধাক্কা খেয়েছিলেন সোমালিয়ার আন্তর্জাতিক রেফারি ওমর আবদুলকাদির আরতান। যুক্তরাষ্ট্রে প্রবেশের অনুমতি না পাওয়ায় তিনি বিশ্বকাপে দায়িত্ব পালন করতে পারেননি। এ ঘটনায় উয়েফা প্রকাশ্যে অসন্তোষ জানায়। সভাপতি আলেক্সান্ডার সেফেরিন এটিকে বিশ্বকাপের চেতনার পরিপন্থী বলে মন্তব্য করেন। পরে উয়েফা আরতানকে সম্মান জানিয়ে আসন্ন ইউরোপিয়ান সুপার কাপ পরিচালনার দায়িত্ব দেওয়ার ঘোষণা দেয়।
ফুটবল বিশ্লেষকরা মনে করেন, বিশ্বকাপের মতো বৈশ্বিক টুর্নামেন্টে নির্বাচিত ম্যাচ অফিসিয়ালদের এভাবে বাদ পড়া শুধু ব্যক্তিগত ক্ষতিই নয়, বরং প্রতিযোগিতার গ্রহণযোগ্যতার ওপরও প্রশ্ন তোলে। রেফারিদের আন্তর্জাতিক নিয়োগে আয়োজক দেশের অভিবাসন নীতির প্রভাব কতটা পড়তে পারেÑএ ঘটনাই সে বিতর্ককে নতুন করে সামনে নিয়ে আসে।
ফাইনালে আর্জেন্টিনার ‘কালো অধ্যায়’
ফাইনালে স্পেন শিরোপা জয়ের আনন্দে মাতোয়ারা, তখনই মাঠে দেখা যায় নজিরবিহীন বিশৃঙ্খলা। ম্যাচ শেষে দুদলের খেলোয়াড় ও কর্মকর্তাদের মধ্যে উত্তপ্ত বাক্যবিনিময় মুহূর্তেই হাতাহাতিতে রূপ নেয়। প্রত্যক্ষদর্শীদের বর্ণনা অনুযায়ী, আর্জেন্টিনার লিয়ান্দ্রো পারেদেস প্রথমে এরিক গার্সিয়াকে ধাক্কা দেন, পরে গাভির সঙ্গেও সংঘর্ষে জড়িয়ে পড়েন। এক পর্যায়ে দুদলের একাধিক খেলোয়াড় ও কর্মকর্তাকে পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণে এগিয়ে আসতে হয়।
ঘটনার পর ফিফা আনুষ্ঠানিকভাবে তদন্ত শুরু করে এবং ডিসিপ্লিনারি কমিটির অধীনে একজন বিশেষ তদন্তকারী নিয়োগ দেয়। সম্ভাব্য শাস্তি হিসেবে ম্যাচ নিষেধাজ্ঞা কিংবা আর্থিক জরিমানার বিষয়টিও বিবেচনায় রয়েছে। বিশ্বকাপ ফাইনালের মতো মর্যাদাপূর্ণ মঞ্চে এমন ঘটনা ফুটবল বিশ্বে ব্যাপক সমালোচনার জন্ম দেয়। অনেক সাবেক ফুটবলার মনে করেন, শিরোপার লড়াই যতই উত্তপ্ত হোক, শেষ বাঁশির পর খেলোয়াড়দের আচরণ আরো সংযত হওয়া উচিত ছিল।
