মুক্তদেশ ডেস্ক: ইরানের সঙ্গে চলমান সংঘাতে এখন পর্যন্ত যুক্তরাষ্ট্রের ব্যয় প্রায় ৩৭ দশমিক ৫ বিলিয়ন ডলার (প্রায় ২৮ বিলিয়ন পাউন্ড) ছাড়িয়েছে বলে জানিয়েছেন মার্কিন প্রতিরক্ষামন্ত্রী পিট হেগসেথ। মে মাসে দেওয়া সর্বশেষ সরকারি হিসাবের তুলনায় এই ব্যয় প্রায় ৮ বিলিয়ন ডলার বেড়েছে।
এত ব্যয়ের পরেও ফের অতিরিক্ত ৮৭ বিলিয়ন ডলার বরাদ্দের আবেদনে করেন হেগসেথ। এ সময় ট্রাম্প প্রশাসনের বিরুদ্ধে আরেকটি অন্তহীন যুদ্ধের পেছনে অতিরিক্ত ব্যয়ের অভিযোগ তোলেন ডেমোক্র্যাটিক সিনেটর গ্যারি পিটার্স। এ নিয়ে তার সাথে হেগসেথের তীব্র বাকবিতণ্ডাও হয়। ব্রিটিশ বার্তাসংস্থা বিবিসির এক প্রতিবেদনে এ তথ্য জানা যায়।
মঙ্গলবার সিনেট অ্যাপ্রোপ্রিয়েশনস কমিটির শুনানিতে হেগসেথ বলেন, মধ্যপ্রাচ্যে চলমান সামরিক অভিযান অব্যাহত রাখতে এবং যুক্তরাষ্ট্রের সামরিক সক্ষমতা ধরে রাখতে কংগ্রেসের কাছ থেকে জরুরি ভিত্তিতে ৮৭ বিলিয়ন ডলারের অতিরিক্ত বরাদ্দ প্রয়োজন। এর মধ্যে ৬৭ বিলিয়ন ডলার মধ্যপ্রাচ্যের সামরিক অভিযানে ব্যয় করা হবে।
এর আগে গত সপ্তাহে ইরানের সঙ্গে পুনরায় সংঘাত শুরুর পর এই প্রথম কংগ্রেসে হাজির হন হেগসেথ। এরই মধ্যে মধ্যপ্রাচ্যে তিন মার্কিন সেনার নিহত হওয়ার ঘটনাও নিশ্চিত করেছে পেন্টাগন।
শুনানির শুরুতে হেগসেথ বলেন, ‘আমরা একটি বিপজ্জনক বিশ্বে বাস করছি। এই বাস্তবতায় দ্রুত ও সাহসী পদক্ষেপ নেওয়া জরুরি।’ তিনি সতর্ক করে বলেন, অতিরিক্ত অর্থ বরাদ্দ না পেলে সেনাসদস্যদের বেতন, অস্ত্র ও গোলাবারুদ পুনরায় মজুত এবং চলমান সামরিক অভিযান পরিচালনায় গুরুতর সংকট তৈরি হবে।
তার ভাষায়, এই অর্থ যুক্তরাষ্ট্রের সামরিক বাহিনীর ‘প্রাণঘাতী সক্ষমতা’ আরও শক্তিশালী করবে এবং ‘শক্তির মাধ্যমে শান্তি’ প্রতিষ্ঠায় সহায়ক হবে।
শুনানিতে রিপাবলিকান সিনেটর ও কমিটির চেয়ারম্যান সুসান কলিন্স জানতে চান, অতিরিক্ত অর্থ অনুমোদন না পেলে কী ধরনের প্রভাব পড়বে। জবাবে হেগসেথ বলেন, বর্তমান ও ভবিষ্যৎ সামরিক প্রশিক্ষণ কার্যক্রম কমিয়ে আনতে হবে। একই সঙ্গে তিনি সাবেক প্রেসিডেন্ট জো বাইডেন প্রশাসনের বিরুদ্ধে সামরিক খাতে পর্যাপ্ত অর্থ বরাদ্দ না দেওয়ার অভিযোগও তোলেন।
অন্যদিকে কমিটির শীর্ষ ডেমোক্র্যাট সদস্য প্যাটি মারে অতিরিক্ত অর্থ বরাদ্দের যৌক্তিকতা নিয়ে প্রশ্ন তোলেন। ডেমোক্র্যাটিক সিনেটর ডিক ডারবিন যুদ্ধের মোট ব্যয়ের হিসাব জানতে চাইলে হেগসেথ ৩৭ দশমিক ৫ বিলিয়ন ডলারের তথ্য তুলে ধরেন।
তবে বিবিসির সহযোগী সংবাদমাধ্যম সিবিএস নিউজকে ডেমোক্র্যাটিক দলের দুটি সূত্র এবং বিষয়টি সম্পর্কে অবগত আরেকটি সূত্র জানিয়েছে, প্রকৃত ব্যয় সরকারি হিসাবের চেয়েও অনেক বেশি। তাদের দাবি, ক্ষতিগ্রস্ত মার্কিন ঘাঁটি পুনর্নির্মাণের মতো ব্যয় বর্তমান হিসাবের মধ্যে অন্তর্ভুক্ত করা হয়নি।
সবশেষ ১২ মে পেন্টাগনের এক জ্যেষ্ঠ কর্মকর্তা জানিয়েছিলেন, তখন পর্যন্ত যুদ্ধের ব্যয় ছিল ২৯ বিলিয়ন ডলার। এর আগে যুদ্ধের প্রথম সপ্তাহেই ব্যয় হয়েছিল প্রায় ১১ দশমিক ৩ বিলিয়ন ডলার বলে কংগ্রেসকে জানিয়েছিল পেন্টাগন।
হেগসেথ দাবি করেন, প্রস্তাবিত বরাদ্দ অনুমোদন পেলে এটি হবে ‘এক প্রজন্মের জন্য গুরুত্বপূর্ণ বিনিয়োগ’, যা যুক্তরাষ্ট্রকে অন্য দেশের সামরিক শক্তির সঙ্গে প্রতিযোগিতায় পিছিয়ে পড়া থেকে রক্ষা করবে।
শুনানিতে নিউইয়র্কের ডেমোক্র্যাটিক সিনেটর কার্স্টেন গিলিব্র্যান্ড অভিযোগ করেন, ট্রাম্প প্রশাসন কংগ্রেসের কাছে ‘বোমার জন্য সীমাহীন অর্থ’ চাইছে, অথচ অনেক মার্কিন নাগরিক পরিবারের খাবারের খরচই বহন করতে পারছেন না। তিনি প্রশ্ন তোলেন, ‘প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প যে যুদ্ধকে ইতোমধ্যে জয়ী বলে দাবি করেছেন, সেই যুদ্ধের জন্য আবারও কেন বিলিয়ন ডলার প্রয়োজন।’
পরে ডেমোক্র্যাটিক সিনেটর গ্যারি পিটার্স হেগসেথকে ব্যর্থ আখ্যা দিয়ে অভিযোগ করেন, ট্রাম্প প্রশাসন আরেকটি ‘অন্তহীন যুদ্ধ’ তৈরি করেছে। জবাবে হেগসেথ বলেন, ‘আপনার লজ্জা হওয়া উচিত,’ এবং পিটার্সকে ‘ট্রাম্প ডিরেঞ্জমেন্ট সিনড্রোমে’ আক্রান্ত বলেও মন্তব্য করেন।
অতিরিক্ত এই অর্থ বরাদ্দের প্রস্তাব শুধু ডেমোক্র্যাটদের বিরোধিতার মুখেই নয়, রিপাবলিকান দলের ভেতরেও আপত্তির সম্মুখীন হয়েছে।
এদিকে প্রতিনিধি পরিষদ বৃহস্পতিবার থেকে বিরতিতে যাচ্ছে এবং কংগ্রেসের দুই কক্ষ যৌথভাবে সেপ্টেম্বরের আগে আর অধিবেশনে বসবে না। ফলে রিপাবলিকানরা প্রয়োজনীয় ভোট পেলেও পেন্টাগনের হাতে এই অর্থ পৌঁছাতে আরও কয়েক মাস সময় লাগতে পারে।
শুনানি চলাকালেই হোয়াইট হাউস থেকে সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম ট্রুথ সোশ্যালে প্রেসিডেন্ট ট্রাম্প যুক্তরাষ্ট্রের অতীতের দীর্ঘ ও রক্তক্ষয়ী যুদ্ধগুলোর একটি তালিকা প্রকাশ করেন। তিনি জানান, ২৮ ফেব্রুয়ারি শুরু হওয়া ইরান যুদ্ধে এখন পর্যন্ত ১৮ জন মার্কিন নাগরিক নিহত হয়েছেন।
মঙ্গলবার পেন্টাগন ইরাকে দায়িত্ব পালনরত ৩০ বছর বয়সী মার্কিন সেনা সার্জেন্ট মাইকেল ইমানুয়েল সুইন্টন নিহত হওয়ার খবর নিশ্চিত করে। একই সঙ্গে জানানো হয়, জর্ডানে নিখোঁজ ২৮ বছর বয়সী সার্জেন্ট অ্যাঞ্জেল র্যাম্পারসাড নিহত হয়েছেন বলে ধারণা করা হচ্ছে।
এর একদিন আগে জর্ডানে নিহত আরও দুই মার্কিন সেনাসদস্যের পরিচয় প্রকাশ করে পেন্টাগন। তারা হলেন প্রাইভেট ফার্স্ট ক্লাস ইসাবেলা গঞ্জালেস (১৯) এবং ফার্স্ট লেফটেন্যান্ট টাইলার ফিহান (২৫)।
নিহত সেনাদের মরদেহ যুক্তরাষ্ট্রে পৌঁছালে বুধবার ডেলাওয়ারের একটি বিমানঘাঁটিতে তাদের প্রতি শেষ শ্রদ্ধা জানাতে যাওয়ার কথা রয়েছে প্রেসিডেন্ট ট্রাম্পের।
