মুক্তদেশ ডেস্ক: সাড়ে চার দশক আগে চট্টগ্রাম সার্কিট হাউসে রাষ্ট্রপতি জিয়াউর রহমানকে খুনের ঘটনার সঙ্গে জড়িত থাকার অভিযোগে সাবেক সেনা কর্মকর্তা মেজর মোহাম্মদ মোজাফফর হোসেনকে গ্রেপ্তার করেছে গোয়েন্দা পুলিশ। গত বুধবার রাতে বনানী ডিওএইচএস থেকে তাকে গ্রেপ্তার করা হয়।
গতকাল বৃহস্পতিবার সন্ধ্যায় তাকে সেনাবাহিনীর মিলিটারি পুলিশের কাছে হস্তান্তর করা হয়েছে। গ্রেপ্তারের পর মেজর মোজাফফর হোসেন পুলিশকে বলেছেন, সাবেক রাষ্ট্রপতি জিয়াউর রহমান হত্যাকাণ্ডের পর তিনি ত্রিপুরা সীমান্ত দিয়ে ভারতে পালিয়ে গিয়েছিলেন। ১৬ বছর পর দেশটিতে আত্মগোপনে থাকার পর ১৯৯৭ সালে আবার দেশে ফিরে আসেন। আত্মগোপনে থাকা অবস্থায় ভারতে ব্যবসা করতেন।
জানা গেছে, গোপন সংবাদের ভিত্তিতে গত বুধবার রাতে বনানী ডিওএইচএসের একটি বাসা থেকে মোজাফফর হোসেনকে গ্রেপ্তার করে ঢাকা মহানগর গোয়েন্দা পুলিশ। গোয়েন্দা পুলিশের প্রধান শফিকুল ইসলাম এই অভিযানে নেতৃত্ব দেন। তিনি বলেন, ‘নিয়ম অনুযায়ী তাকে তার বাহিনীর কাছে হস্তান্তর করা হয়েছে।’ গতকাল মেজর মোজাফফরকে মিলিটারি পুলিশের কাছে হস্তান্তরের সময় তার জব্দকরা ব্যক্তিগত মোবাইল ফোনটিও হস্তাস্তর করা হয়।
সংশ্লিষ্ট কর্মকর্তারা বলছেন, মেজর মোজাফফর গ্রেপ্তারের মধ্য দিয়ে দেশের অন্যতম আলোচিত রাজনৈতিক হত্যাকাণ্ডের একটি দীর্ঘদিনের অমীমাংসিত অধ্যায়ে নতুন অগ্রগতি এলো। সেনাবাহিনীর নিজস্ব বিচার প্রক্রিয়ার (কোর্ট মার্শাল) মাধ্যমে এখন তার বিরুদ্ধে পরবর্তী আইনি পদক্ষেপ নেওয়া হবে।
১৯৮১ সালের ৩০ মে ভোরে চট্টগ্রামে এক সামরিক অভ্যুত্থানে নিহত হন তৎকালীন রাষ্ট্রপতি জিয়াউর রহমান, যিনি বর্তমান ক্ষমতাসীন দল বিএনপির প্রতিষ্ঠাতা। ওই হত্যাকাণ্ডের পর মেজর মোজাফফর হোসেনকে ধরিয়ে দিতে সে সময় পুরস্কারও ঘোষণা করা হয়েছিল। পত্রিকায় তার ছবিও প্রকাশ করা হয়েছিল।
গ্রেপ্তার মোহাম্মদ মোজাফফর হোসেন বলেন, হত্যাকাণ্ডের পর মেজর জেনারেল মঞ্জুরসহ অভ্যুত্থানকারী বেশ কয়েকজন সেনা কর্মকর্তা সেদিন রাতে চট্টগ্রাম সেনানিবাস ছেড়ে পালিয়ে যান। তিনি মেজর জেনারেল মঞ্জুরের গাড়িতে করে পালাচ্ছিলেন। লক্ষ্য ছিল ভারতে পালাবেন। কিন্তু পথিমধ্যে
সেনাবাহিনীর সদস্যদের গোলাগুলিতে উত্তেজনাকর পরিস্থিতিতে তারা পিছু হটেন। এরপর মেজর জেনারেল মঞ্জুরের গাড়ি থেকে নেমে মেজর ওসমানের গাড়িতে ওঠেন। তারা যাওয়ার সময় রাস্তায় দুজন সেনা কর্মকর্তার লাশ দেখতে পান। পরে গাড়ি থেকে নেমে ফটিকছড়ি দিয়ে ত্রিপুরা সীমান্তে পৌঁছান। সেখানে বাংলাদেশ সীমান্তের একটি বাড়িতে আত্মগোপন করেন। ওই বাড়িতে ১৬ দিন থাকার পর সীমান্ত পাড়ি দিয়ে ভারতে চলে যান। এরপর ১৬ বছর সেখানেই আত্মগোপন করেন। সেখানে ব্যবসা করতেন। ১৬ বছর পর ১৯৯৭ সালে দেশে ফিরে আসেন। তখন ক্ষমতায় ছিল শেখ হাসিনার নেতৃত্বাধীন আওয়ামী লীগ সরকার।
মেজর মোজাফফর গ্রেপ্তারের পর আরও জানান, তিনি ছিলেন রক্ষী বাহিনীতে। পরে সেনাবাহিনীতে মেজর হিসেবে যোগ দেন। তার স্বপ্ন ছিল পদোন্নতির মাধ্যমে সেনাবাহিনীর ঊর্ধ্বতন কর্মকর্তা হবেন। কিন্তু পদোন্নতি বঞ্চিত হওয়ায় তৎকালীন সেনা প্রশাসনের ওপর ক্ষুব্ধ ছিলেন। তার ভাষ্যানুযায়ী জিয়াউর রহমানকে হত্যাকাণ্ডের পর তার লাশ কোন পাহাড়ে দাফন করা হবে সেই জায়গাও ঠিক করে রাখা হয়েছিল।
জানা গেছে, ঘটনার আগের দিন দুদিনের সফরে চট্টগ্রাম যান রাষ্ট্রপতি জিয়াউর রহমান। তার সফরের মূল উদ্দেশ্য ছিল বিএনপির স্থানীয় নেতাদের বিরোধ নিরসন। প্রথম দিন নেতাকর্মীদের সঙ্গে ধারাবাহিক বৈঠক করে তিনি মধ্যরাতে ঘুমাতে যান। এর কয়েক ঘণ্টার মধ্যে সেনাবাহিনীর একটি দল তার ওপর গুলি চালায় এবং তিনি ঘটনাস্থলেই নিহত হন। ৩০ মে সকালে রেডিওতে তার মৃত্যুর খবর ঘোষণা করা হয়। পরে সরকারের তরফে এক বিবৃতিতে বলা হয়, ‘বিপ্লবী পরিষদ’ পরিচয় দেওয়া কিছু সেনা সদস্য রাষ্ট্রপতি জিয়াকে হত্যা করেছে। উপ-রাষ্ট্রপতি বিচারপতি আবদুস সাত্তার তখন অস্থায়ী রাষ্ট্রপতির দায়িত্ব নেন।
হত্যাকাণ্ডের কয়েক ঘণ্টা পর জিয়ার লাশ গোপনে চট্টগ্রামের রাঙ্গুনিয়ায় নিয়ে যাওয়া হয়। সেখানে পাহাড়ি এলাকায় তাকে কবর দেওয়া হয়। পরে সরকারের উদ্যোগে সেখান থেকে তার মরদেহ তুলে ঢাকায় এনে ২ জুন দাফন করা হয় দাফন করা হয় সংসদ ভবনের পাশে।
এদিকে রাষ্ট্রপতি জিয়াকে হত্যার পর অভ্যুত্থানকারীরা বিভিন্ন সড়কে অবস্থান নেওয়ায় চট্টগ্রাম পুরোপুরি যোগাযোগ বিচ্ছিন্ন হয়ে পড়ে। তারা জিয়ার লাশও হস্তান্তর করতে রাজি হচ্ছিল না। ওই অবস্থায় চট্টগ্রাম সেনানিবাসের জিওসি মেজর জেনারেল মঞ্জুরসহ অভ্যুত্থানে অংশগ্রহণকারীদের সবাইকে ৩১ মে দুপুর ১২টার মধ্যে আত্মসমর্পণ করার নির্দেশ দেন তখনকার সেনাপ্রধান হুসেইন মুহাম্মদ এরশাদ, যিনি পরে রাষ্ট্রপতির দায়িত্ব নিয়েছিলেন। পরদিন ১ জুন অভ্যুত্থানে জড়িত লেফটেন্যান্ট কর্নেল মতিউর রহমান ও লেফটেন্যান্ট কর্নেল মেহবুব চট্টগ্রাম থেকে পালিয়ে যাওয়ার সময় সরকার সমর্থক সেনা সদস্যদের গুলিতে নিহত হয়েছেন বলে খবর আসে। মঞ্জুরকে ধরিয়ে দিতে পাঁচ লাখ টাকার পুরস্কার ঘোষণা করা হয়। চট্টগ্রাম সেনানিবাসে ফের সরকারের নিয়ন্ত্রণ প্রতিষ্ঠা পায়।
মেজর জেনারেল মঞ্জুর ২ জুন ফটিকছড়ির একটি চা বাগানে ধরা পড়েন। সেখান থেকে তাকে থানায় নেওয়া হয়। পরে রেডিও-টেলিভিশনে ঘোষিত সরকারের বিবৃতিতে বলা হয়, চট্টগ্রাম সেনানিবাসে একদল উচ্ছৃঙ্খল সৈন্যের হাতে জেনারেল মঞ্জুর নিহত হয়েছেন। সে সময় ‘বিদ্রোহের’ অভিযোগে ১৮ জন সেনা কর্মকর্তার বিচার করা হয়েছিল। তাদের মধ্যে ১৩ জন সেনা কর্মকর্তার ফাঁসি এবং বাকিদের বিভিন্ন মেয়াদে কারাদণ্ড হয়। তবে অভ্যুত্থানে অংশ নেওয়া মেজর খালেদ ও মেজর মোজাফফর পালিয়ে যেতে সক্ষম হন। তাদের দুজনকে ধরিয়ে দিতেও সে সময় পুরস্কার ঘোষণা করা হয়েছিল।
জানা গেছে, জিয়াউর রহমানকে হত্যার আগে সেনাবাহিনীর বিদ্রোহী দলটি কালুরঘাটে গোপন বৈঠক করেছিল। ওই বৈঠকে ২০ জনের একটি ঘাতক দল গঠন করা হয়। বৈঠকে মেজর মোজাফফর হোসেনও উপস্থিত ছিলেন। পরিকল্পনা অনুযায়ী সেনাবাহিনীর ৩টি পিকআপ এবং ২টি জিপে করে ঘাতক দল চট্টগ্রাম সার্কিট হাউসে প্রবেশ করে। তাদের একটি দলের দায়িত্ব ছিল রাষ্ট্রপতি জিয়াউর রহমানকে হত্যা করা, আরেকটি দলের দায়িত্ব ছিল কেউ বাধা দিতে আসলে সঙ্গে সঙ্গে তাদের শেষ করে দেওয়া। ঘটনার সময় রাষ্ট্রপতির নিরাপত্তার দায়িত্বে থাকা কয়েকজন বিদ্রোহী সেনাদের প্রতিহত করতে গিয়ে হতাহত হন। আমাদের সময়
