মুক্তদেশ ডেস্ক: দেশে বর্তমানে উৎপাদনে থাকা গ্যাসক্ষেত্রের সংখ্যা ২০টি। পেট্রোবাংলার সাম্প্রতিক প্রকাশিত প্রতিবেদন বিশ্লেষণে দেখা যায়, চলতি বছরের জানুয়ারিতে এসব গ্যাসক্ষেত্রে মজুদ ছিল ৬ হাজার ৩২১ বিলিয়ন ঘনফুট (বিসিএফ), অর্থাৎ ছয় টিসিএফের কিছু বেশি। তবে জুন শেষে এ মজুদ কমে প্রায় ছয় টিসিএফে নেমে এসেছে।
উল্লেখ্য, দেশে প্রতি মাসে গড়ে প্রায় ৫৮ বিসিএফ গ্যাস উত্তোলন করা হয়। অন্যদিকে পেট্রোবাংলার হিসাবে দেশে মোট গ্যাস মজুদ রয়েছে ৭ দশমিক ৬৩ টিসিএফ। এ হিসাবের মধ্যে পরিত্যক্ত ও বর্তমানে উৎপাদনের বাইরে থাকা গ্যাসক্ষেত্রগুলোর মজুদও অন্তর্ভুক্ত করা হয়েছে। দেশে এ ধরনের গ্যাসক্ষেত্রের সংখ্যা ১০টি, যেখানে মোট মজুদ রয়েছে প্রায় ১ হাজার ৩৩৪ বিসিএফ গ্যাস। তবে উত্তোলন জটিলতা, অবকাঠামোগত সীমাবদ্ধতা ও বিভিন্ন মামলা-সংক্রান্ত কারণে দীর্ঘদিন ধরে এসব ক্ষেত্রের গ্যাস জাতীয় গ্রিডে যুক্ত করা সম্ভব হয়নি।
দেশে স্থানীয় গ্যাসের উৎপাদন এখন বছরে প্রায় ৭০০ বিসিএফে নেমে এসেছে। সে হিসাবে বর্তমান মজুদ দিয়ে গ্যাস সরবরাহ টিকবে মাত্র আট বছরের মতো। প্রতি বছর গ্যাসের চাহিদা ও জোগানের মধ্যে যে বড় ধরনের ব্যবধান তৈরি হচ্ছে, তাতে স্থানীয় গ্যাসের মজুদ উল্লেখযোগ্যভাবে বাড়ানো না গেলে বিদ্যুৎ উৎপাদন, শিল্প-কারখানা এবং নতুন বিনিয়োগ বড় ঝুঁকিতে পড়তে পারে বলে মনে করছেন খাতসংশ্লিষ্টরা। তাদের মতে, স্থানীয় গ্যাস খাতের বর্তমান সংকট একদিনে তৈরি হয়নি; বরং দশকের পর দশক ধরে গড়ে ওঠা নীতি-ভুল, অনুসন্ধান ঘাটতি এবং রাষ্ট্রায়ত্ত সংস্থাগুলোর সীমাবদ্ধতার ফল এটি।
এনার্জি রেগুলেটরি কমিশন (বিইআরসি), পেট্রোবাংলা ও বাপেক্সের সাবেক শীর্ষ কর্মকর্তা মকবুল ই ইলাহী চৌধুরী বলেন, স্বাধীনতার পর থেকে ১৯৮০-৮১ সাল পর্যন্ত দেশের তেল, গ্যাস ও কয়লা খাতে জোরালো উদ্যোগ দেখা গিয়েছিল। ১৯৯৩-৯৫ সালে প্রণীত জ্বালানি নীতির মূল লক্ষ্য ছিল স্থানীয় গ্যাস উৎপাদন বৃদ্ধি ও স্বনির্ভরতা অর্জন। কিন্তু পরবর্তী সময়ে সেই উদ্যোগ আর কাঙ্ক্ষিত গতি পায়নি।
তার ভাষ্য, নব্বইয়ের দশকে শিল্প খাতে গ্যাসের ব্যবহার তুলনামূলক কম ছিল এবং তখন ধারণা করা হতো যে দেশে বিপুল পরিমাণ গ্যাস মজুদ রয়েছে। ফলে প্রয়োজনীয় গতিতে অনুসন্ধান কার্যক্রম পরিচালিত হয়নি।
বর্তমান মজুদের বড় অংশই চারটি প্রধান গ্যাসক্ষেত্রে কেন্দ্রীভূত। এর মধ্যে সবচেয়ে বড় উৎপাদনশীল ক্ষেত্র হচ্ছে শেভরন পরিচালিত বিবিয়ানা গ্যাসক্ষেত্র। হাইড্রোকার্বন ইউনিটের তথ্যমতে, এ ক্ষেত্রের টুপি রিজার্ভ ছিল ৫ হাজার ৭৫৫ বিসিএফ, যদিও পেট্রোবাংলা একসময় এর মজুদ ৭ হাজার ৬৬৬ বিসিএফ হিসেবে দেখিয়েছিল। নির্ভরযোগ্য সূত্র জানায়, শেভরন উন্নত প্রযুক্তি ব্যবহার করে কূপগুলোর সক্ষমতা বাড়িয়ে চলেছে, যার ফলে মজুদের হিসাবেও ইতিবাচক প্রতিফলন দেখা যাচ্ছে।
গ্যাস খাতের বর্তমান মজুদের মধ্যে উৎপাদনরত ক্ষেত্রগুলোর মজুদই প্রায় ছয় টিসিএফ। বাকি অংশ রয়েছে পরিত্যক্ত বা উৎপাদনের বাইরে থাকা ক্ষেত্রগুলোতে, যেগুলো বাস্তবে দেশের চলমান গ্যাস সংকট নিরসনে কোনো কার্যকর অবদান রাখতে পারছে না।
দেশে গ্যাস উৎপাদন ধারাবাহিকভাবে কমতে শুরু করে ২০১৬ সাল থেকে। পরের বছর আওয়ামী লীগ সরকার গ্যাস সেক্টর মাস্টারপ্ল্যান-২০১৭ প্রণয়ন করে। সেখানে স্থানীয় অনুসন্ধান ও উৎপাদন বাড়ানোর কথা বলা হলেও বাস্তবে জোর দেওয়া হয় আমদানিনির্ভর নীতিতে। ২০১৮ সাল থেকে এলএনজি আমদানি বাড়ানোর মাধ্যমে কমিশন বাণিজ্য ও সিন্ডিকেট গড়ে তোলার অভিযোগ ওঠে তৎকালীন বিদ্যুৎ, জ্বালানি ও খনিজ সম্পদ প্রতিমন্ত্রী নসরুল হামিদের বিরুদ্ধে। এলএনজি আমদানিতে বিপুল অর্থ ব্যয় হলেও দেশীয় গ্যাস অনুসন্ধান ও উন্নয়নে বিনিয়োগ কমে যায়।
২০১৮-১৯ অর্থবছর থেকে ২০২৪-২৫ অর্থবছর পর্যন্ত দেশে প্রায় ২ লাখ ৫ হাজার কোটি টাকার এলএনজি আমদানি করা হয়েছে। ২০২৫-২৬ অর্থবছরেও এলএনজি আমদানিতে প্রায় ৫১ হাজার কোটি টাকা ব্যয়ের প্রাক্কলন রয়েছে। বিপরীতে রাষ্ট্রায়ত্ত গ্যাস কোম্পানিগুলো গত ২৩ বছরে মাত্র প্রায় ৭ হাজার কোটি টাকার বিনিয়োগ পেয়েছে।
জ্বালানি বিশেষজ্ঞ ও ভূতত্ত্ববিদ অধ্যাপক বদরূল ইমাম বলেন, গত দুই দশকে দেশের জ্বালানি খাত ছিল অনুসন্ধানবিমুখ। সমুদ্রসীমা নিষ্পত্তির পর মিয়ানমার যেখানে গ্যাস আবিষ্কার করেছে, সেখানে বাংলাদেশ কার্যকর কোনো উদ্যোগ নিতে পারেনি। তার মতে, বিনিয়োগ ও দূরদর্শী সিদ্ধান্ত ছাড়া জ্বালানি খাতে বড় সাফল্য আসে না। আমদানিনির্ভর পরিকল্পনার কারণে দেশের অভ্যন্তরীণ সম্পদ উন্নয়ন অবহেলিত হয়েছে এবং বিদ্যমান মজুদই শুধু ব্যবহার করা হচ্ছে, নতুন মজুদ বাড়ানো যাচ্ছে না।
বাপেক্সে প্রয়োজনীয় বিনিয়োগের অভাবে অত্যাধুনিক অনুসন্ধান যন্ত্রপাতি কেনা হয়নি এবং দক্ষ জনবল গড়ে তোলার ক্ষেত্রেও ঘাটতি তৈরি হয়েছে বলে অভিযোগ রয়েছে।
পেট্রোবাংলার তথ্য অনুযায়ী, ভোলা নর্থ গ্যাসক্ষেত্র ২০১৮ সালে আবিষ্কৃত হলেও এখনো উৎপাদনে আনা হয়নি। সেখানে ৪৩৫ বিসিএফ গ্যাস মজুদ রয়েছে। একইভাবে ২০২১ সালে আবিষ্কৃত সিলেটের জকিগঞ্জ গ্যাসক্ষেত্রেও ৫২ বিসিএফ মজুদ থাকলেও পাইপলাইন সংকটের কারণে জাতীয় গ্রিডে যুক্ত করা যায়নি। এছাড়া ২০২৩ সালে ভোলার ইলিশা এলাকায় আরেকটি গ্যাসক্ষেত্র আবিষ্কৃত হলেও সেটিও উৎপাদনে আসেনি।
পেট্রোবাংলার পরিচালক (অপারেশন অ্যান্ড মাইনস) প্রকৌশলী মো. রফিকুল ইসলাম বলেন, দেশে মোট গ্যাস মজুদ ৭ দশমিক ৬৩ টিসিএফ। উৎপাদনরত ও অউৎপাদনশীল সব ক্ষেত্রের হিসাব মিলিয়েই এ পরিমাণ নির্ধারণ করা হয়েছে। জকিগঞ্জ ও ভোলাসহ কয়েকটি ক্ষেত্রে নতুন কূপ খননের কাজ চলছে, যা পেট্রোবাংলার ৫০ ও ১০০ কূপ খনন কর্মসূচির অন্তর্ভুক্ত।
দেশের পাঁচটি পরিত্যক্ত গ্যাসক্ষেত্রে অন্তত ৬৬১ বিসিএফ গ্যাস মজুদ রয়েছে। এর মধ্যে ছাতক গ্যাসক্ষেত্রে ৪৪৭ বিসিএফ, সাঙ্গুতে ৮৯ বিসিএফ, ফেনীতে ৬২ বিসিএফ এবং কামতায় ৪৪ বিসিএফ মজুদ রয়েছে। দীর্ঘদিন ধরে এসব ক্ষেত্র পরিত্যক্ত অবস্থায় পড়ে আছে।
জ্বালানি বিভাগের একটি সূত্র জানায়, পরিত্যক্ত গ্যাসক্ষেত্রগুলো পুনরুজ্জীবিত করতে পিএসসি মডেলে বিদেশি কোম্পানিগুলোর আগ্রহ দেখা যাচ্ছে। এসব ক্ষেত্র উন্নয়নে বড় ধরনের উদ্যোগ নেওয়ার উপায় নিয়ে বর্তমানে আলোচনা চলছে।
জ্বালানি সচিব মোহাম্মদ সাইফুল ইসলাম বলেন, দেশের গ্যাস মজুদ বাড়াতে প্রাথমিক পর্যায়ে বেশ কিছু উদ্যোগ নেওয়া হয়েছে। দেশের অনেক সিসমিক জরিপ ১০ থেকে ১৫ বছর আগের হওয়ায় কূপ খননে প্রত্যাশিত ফল পাওয়া যাচ্ছে না। তাই পুরোনো টু-ডি সিসমিক জরিপকে থ্রি-ডি জরিপে রূপান্তরের উদ্যোগ নেওয়া হয়েছে এবং এ বিষয়ে বিশেষজ্ঞ কমিটিও গঠন করা হয়েছে। পাশাপাশি পরিত্যক্ত গ্যাসক্ষেত্রগুলো উন্নয়নে বিদেশি কোম্পানিগুলোর সঙ্গে আলোচনা চলছে।
