মুক্তদেশ ডেস্ক: রাজধানী ঢাকার যানজট কমাতে নির্দিষ্ট সড়কে কিলোমিটারপ্রতি ৬ দশমিক ২৭ টাকা হারে যানজট শুল্ক (Congestion Charge) আরোপের প্রস্তাব করা হয়েছে। তবে এ শুল্ক সব সড়কে নয়; শুধু মেট্রোরেল, বিআরটি (বাস র্যাপিড ট্রানজিট) এবং উন্নত বাসসেবাসমৃদ্ধ করিডোরে চলাচলকারী প্রাইভেট কার, মোটরসাইকেল ও ট্রাকের ক্ষেত্রে প্রযোজ্য হবে।
প্রস্তাবটি বৃহত্তর ঢাকার জন্য ২০২৫-২০৪৫ মেয়াদের হালনাগাদকৃত সংশোধিত কৌশলগত পরিবহন পরিকল্পনা (ইউআরএসটিপি)-এর খসড়ায় অন্তর্ভুক্ত করা হয়েছে। তবে এতে স্পষ্টভাবে বলা হয়েছে, যানজট শুল্ক কার্যকরের আগে নির্ভরযোগ্য ও কার্যকর গণপরিবহন ব্যবস্থা নিশ্চিত করতে হবে।
বর্তমানে উত্তরা-মতিঝিল মেট্রোরেল করিডোরকে এ ধরনের শুল্ক চালুর জন্য সবচেয়ে উপযোগী হিসেবে বিবেচনা করা হচ্ছে। ভবিষ্যতে নির্মাণাধীন ও পরিকল্পিত মেট্রোরেল, বিআরটি এবং উন্নত বাসসেবা চালু হওয়া করিডোরগুলোতেও এ ব্যবস্থা চালুর সুযোগ তৈরি হবে বলে প্রতিবেদনে উল্লেখ করা হয়েছে।
ঢাকার যানজট পরিস্থিতি ক্রমেই উদ্বেগজনক হয়ে উঠছে। বিশ্বব্যাংক ও বাংলাদেশ প্রকৌশল বিশ্ববিদ্যালয়ের (বুয়েট) সড়ক দুর্ঘটনা গবেষণা ইনস্টিটিউটের তথ্য অনুযায়ী, ২০০৭ সালে রাজধানীতে যানবাহনের গড় গতি ছিল ঘণ্টায় প্রায় ২১ কিলোমিটার, যা ২০২২ সালে কমে দাঁড়িয়েছে মাত্র ৪ দশমিক ৮ কিলোমিটারে। অন্যদিকে বিশ্বব্যাংকের এক গবেষণায় বলা হয়েছে, যানজটের কারণে ঢাকায় প্রতিদিন প্রায় ৩২ লাখ কর্মঘণ্টা নষ্ট হচ্ছে, যা অর্থনীতিতেও বড় ধরনের প্রভাব ফেলছে।
প্রস্তাবিত ব্যবস্থায় রেডিও ফ্রিকোয়েন্সি আইডেন্টিফিকেশন (আরএফআইডি) প্রযুক্তির মাধ্যমে স্বয়ংক্রিয়ভাবে শুল্ক আদায় করা হবে। নির্ধারিত সড়কে আরএফআইডি রিডার বসানো হবে এবং নিবন্ধিত যানবাহনের ট্রান্সপন্ডারের মাধ্যমে নির্ধারিত অর্থ কেটে নেওয়া হবে। পুরো ব্যবস্থাপনা তদারকি করবে বাংলাদেশ সড়ক পরিবহন কর্তৃপক্ষ (বিআরটিএ) ও ঢাকা পরিবহন সমন্বয় কর্তৃপক্ষ (ডিটিসিএ)।
এ ছাড়া ঢাকা মহানগর পুলিশের (ডিএমপি) ট্রাফিক বিভাগ ও ডিটিসিএর যৌথ ব্যবস্থাপনায় একটি আধুনিক ট্রাফিক কন্ট্রোল সেন্টার স্থাপনেরও সুপারিশ করা হয়েছে। এতে ডিএমপি ট্রাফিক নিয়ন্ত্রণ ও দুর্ঘটনা ব্যবস্থাপনার দায়িত্ব পালন করবে, আর ডিটিসিএ পরিচালনা করবে যানজট শুল্ক ও বাস চলাচল ব্যবস্থাপনা।
ইউআরএসটিপির খসড়ায় বলা হয়েছে, ২০৪৫ সাল পর্যন্ত প্রস্তাবিত পরিবহন অবকাঠামো উন্নয়ন পরিকল্পনা বাস্তবায়নে বিপুল অর্থের প্রয়োজন হবে। সে অর্থের একটি অংশ যানজট শুল্ক থেকে সংগ্রহের প্রস্তাব করা হয়েছে। পাশাপাশি যানজট কমিয়ে গণপরিবহন ব্যবহারে মানুষকে উৎসাহিত করাও এ উদ্যোগের অন্যতম লক্ষ্য।
পরিবহন বিশেষজ্ঞ ও বাংলাদেশ প্রকৌশল বিশ্ববিদ্যালয়ের (বুয়েট) অধ্যাপক ড. সামছুল হক এ উদ্যোগকে সময়োপযোগী বলে মন্তব্য করেছেন। তাঁর মতে, এ ব্যবস্থা কার্যকর করতে হলে যানবাহনের পূর্ণাঙ্গ ডিজিটাল ডেটাবেজ, নিবন্ধিত ট্রান্সপন্ডার এবং আধুনিক ট্রাফিক ব্যবস্থাপনা নিশ্চিত করতে হবে। তিনি আরও বলেন, যানজটের মাত্রা ও সময়ভেদে পরিবর্তনশীল (ভেরিয়েবল) শুল্ক চালু করা হলে এর কার্যকারিতা আরও বাড়বে এবং সংগৃহীত অর্থ গণপরিবহন ও সড়ক অবকাঠামো উন্নয়নেই ব্যয় করা উচিত।
ডিটিসিএর নির্বাহী পরিচালক মোহাম্মদ মসিউর রহমান বলেন, রাজধানীর যানজট কমাতে সরকার ইতোমধ্যে মেট্রোরেল, মনোরেল, বিআরটি, বাস টার্মিনাল স্থানান্তর, ডেডিকেটেড বাস রুট এবং কোম্পানিভিত্তিক বাস পরিচালনাসহ বিভিন্ন উদ্যোগ নিয়েছে। যানজট শুল্ক সেই সমন্বিত পরিকল্পনারই একটি অংশ। এসব উদ্যোগ বাস্তবায়িত হলে রাজধানীর যান চলাচল ব্যবস্থায় উল্লেখযোগ্য উন্নতি আসবে বলে তিনি আশা প্রকাশ করেন।
