মুক্তদেশ ডেস্ক: রাশিয়া নতুন একটি আন্তমহাদেশীয় ব্যালিস্টিক ক্ষেপণাস্ত্রের পরীক্ষামূলক উৎক্ষেপণ করেছে। রুশ প্রেসিডেন্ট ভ্লাদিমির পুতিন পারমাণবিক অস্ত্র বহনে সক্ষম সারমাত সিরিজের এই ক্ষেপণাস্ত্রকে বিশ্বের ‘সবচেয়ে শক্তিশালী’ ক্ষেপণাস্ত্র বলে আখ্যা দিয়েছেন। কাতারভিত্তিক সংবাদমাধ্যম আল জাজিরার প্রতিবেদনে এ তথ্য জানানো হয়েছে।
রুশ রাষ্ট্রীয় টেলিভিশনে প্রচারিত ফুটেজে দেখা যায়, রাশিয়ার কৌশলগত ক্ষেপণাস্ত্র বাহিনীর কমান্ডার সের্গেই কারাকায়েভ পুতিনকে মঙ্গলবারের উৎক্ষেপণ সম্পর্কে অবহিত করছেন। মস্কো এ পরীক্ষাকে সফল বলে দাবি করেছে। পুতিন জানান, চলতি বছরের শেষ নাগাদ সারমাত ক্ষেপণাস্ত্র যুদ্ধ প্রস্তুত অবস্থায় আনা হবে।
টেলিভিশনে দেওয়া বক্তব্যে পুতিন বলেন, “এটি বিশ্বের সবচেয়ে শক্তিশালী ক্ষেপণাস্ত্র।” তিনি আরও দাবি করেন, এর ওয়ারহেডের ধ্বংসক্ষমতা পশ্চিমা বিশ্বের সমমানের যেকোনো ক্ষেপণাস্ত্রের তুলনায় চার গুণ বেশি।
পুতিনের ভাষ্য অনুযায়ী, সারমাত সাব-অরবিটাল ফ্লাইটে সক্ষম। ফলে এর পাল্লা ৩৫ হাজার কিলোমিটার বা প্রায় ২১ হাজার ৭৫০ মাইলের বেশি। তিনি দাবি করেন, এটি বর্তমান ও ভবিষ্যতের সব ধরনের ক্ষেপণাস্ত্র প্রতিরক্ষা ব্যবস্থা ভেদ করতে সক্ষম।
দীর্ঘদিনের নানা ব্যর্থতার পর এই পরীক্ষা চালানো হলো। সারমাত প্রকল্পের উন্নয়ন শুরু হয়েছিল ২০১১ সালে। মঙ্গলবারের পরীক্ষার আগে ক্ষেপণাস্ত্রটির মাত্র একটি সফল পরীক্ষার তথ্য প্রকাশ্যে জানা গিয়েছিল। এছাড়া ২০২৪ সালে একটি ব্যর্থ পরীক্ষার সময় ভয়াবহ বিস্ফোরণের ঘটনাও ঘটে বলে বিভিন্ন প্রতিবেদনে উল্লেখ করা হয়।
পশ্চিমা বিশ্বে ‘সাটান-টু’ নামে পরিচিত সারমাত ক্ষেপণাস্ত্রটি সোভিয়েত আমলে নির্মিত প্রায় ৪০টি ভয়েভোদা ক্ষেপণাস্ত্রের পরিবর্তে ব্যবহারের পরিকল্পনা রয়েছে। পুতিন বলেন, সারমাত ভয়েভোদার মতোই শক্তিশালী, তবে এর নিখুঁততা আরও বেশি।
এই পরীক্ষা এমন সময়ে হলো, যখন যুক্তরাষ্ট্র ও রাশিয়ার পারমাণবিক অস্ত্রভাণ্ডার নিয়ন্ত্রণকারী কাঠামো ভেঙে পড়া নিয়ে উদ্বেগ বাড়ছে। দুই দেশের মধ্যে কৌশলগত ওয়ারহেড ও সেগুলোর বহনব্যবস্থা সীমিত রাখার সর্বশেষ চুক্তি ‘নিউ স্টার্ট’-এর মেয়াদ গত ফেব্রুয়ারিতে শেষ হয়েছে। এর ফলে অর্ধশতাব্দীরও বেশি সময় পর বিশ্বের সবচেয়ে বড় দুই পারমাণবিক শক্তি কোনো আনুষ্ঠানিক নিয়ন্ত্রণ কাঠামোর বাইরে চলে গেছে।
চুক্তির মেয়াদ শেষ হওয়ার পর মস্কো ও ওয়াশিংটন উচ্চপর্যায়ের সামরিক সংলাপ পুনরায় শুরু করতে সম্মত হলেও নতুন কোনো চুক্তির বিষয়ে এখনো উল্লেখযোগ্য অগ্রগতি দেখা যায়নি। দুই পক্ষই একে অপরের বিরুদ্ধে নিউ স্টার্ট চুক্তির শর্ত লঙ্ঘনের অভিযোগ তুলেছে।
২০০০ সালে ক্ষমতায় আসার পর পুতিন রাশিয়ার পারমাণবিক ত্রয়ী বাহিনীর সোভিয়েত যুগের উপাদানগুলো আধুনিকায়নের উদ্যোগ তদারকি করেছেন। এর আওতায় শত শত নতুন স্থলভিত্তিক আন্তমহাদেশীয় ব্যালিস্টিক ক্ষেপণাস্ত্র মোতায়েন, নতুন পারমাণবিক সাবমেরিন সংযোজন এবং পারমাণবিক অস্ত্র বহনে সক্ষম বোমারু বিমান আধুনিকীকরণ করা হয়েছে।
২০১৮ সালে পুতিন প্রথমবারের মতো সারমাত ক্ষেপণাস্ত্র উন্মোচন করেন। একই সঙ্গে তিনি আরও কয়েকটি নতুন অস্ত্র ব্যবস্থার কথাও জানান। এর মধ্যে রয়েছে ‘অ্যাভানগার্ড’ হাইপারসনিক গ্লাইড ভেহিকল, যা শব্দের গতির ২৭ গুণ দ্রুতগতিতে উড়তে সক্ষম।
এই ব্যবস্থার প্রথম ইউনিট ইতোমধ্যে রুশ সামরিক বাহিনীতে যুক্ত হয়েছে। রাশিয়া নতুন পারমাণবিক সক্ষমতাসম্পন্ন ‘ওরেশনিক’ মাঝারি পাল্লার ব্যালিস্টিক ক্ষেপণাস্ত্রও যুক্ত করেছে। এর প্রচলিত অস্ত্রবাহী সংস্করণ ইউক্রেনে দুইবার হামলায় ব্যবহার করা হয়েছে। ২০২২ সালে মস্কো ইউক্রেনে সামরিক অভিযান শুরু করে।
ওরেশনিকের পাল্লা প্রায় ৫ হাজার কিলোমিটার বা ৩ হাজার ১০০ মাইল। ফলে ইউরোপের যেকোনো লক্ষ্যবস্তুতে আঘাত হানার সক্ষমতা রয়েছে এর।
পুতিন আরও জানান, পারমাণবিক অস্ত্রবাহী ‘পসাইডোন’ আন্ডারওয়াটার ড্রোন এবং ক্ষুদ্র পারমাণবিক রিয়্যাক্টরচালিত ‘বুরেভেস্তনিক’ ক্রুজ ক্ষেপণাস্ত্রের উন্নয়ন এখন চূড়ান্ত পর্যায়ে রয়েছে। পুতিন এসব নতুন অস্ত্রকে যুক্তরাষ্ট্রের ক্ষেপণাস্ত্র প্রতিরক্ষা ব্যবস্থার জবাব হিসেবে বর্ণনা করেছেন।
উল্লেখ্য, ২০০১ সালে ওয়াশিংটন শীতল যুদ্ধকালীন যুক্তরাষ্ট্র-সোভিয়েত ইউনিয়নের ক্ষেপণাস্ত্র প্রতিরক্ষা সীমিতকরণ চুক্তি থেকে সরে যাওয়ার পর যুক্তরাষ্ট্র তার ক্ষেপণাস্ত্র প্রতিরক্ষা ব্যবস্থা সম্প্রসারণ শুরু করে।
