মুক্তদেশ ডেস্ক: রাশিয়ার আগ্রাসন অব্যাহত এবং ট্রাম্পের আমেরিকা ন্যাটোকে প্রশ্নের মুখে ফেলছে— এমন পরিস্থিতিতে ইউরোপের ঐক্যবদ্ধ প্রতিরক্ষা আরও জরুরি।
এই শুক্রবার, ৮ মে, ইউরোপে দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধের সমাপ্তির ৮১তম বার্ষিকী পালনের সময় এটা স্পষ্ট যে জার্মানি আবার ইউরোপের প্রধান সামরিক শক্তি হয়ে উঠবে। সূত্র :গার্ডিয়ান
আগামী বছরই তাদের প্রতিরক্ষা ব্যয় ফ্রান্স ও ব্রিটেনের সম্মিলিত ব্যয়ের সমান হবে— এবং ২০৩০ সালের মধ্যে তা আরও অনেক বড় হবে বলে ধারণা করা হচ্ছে। জার্মান সরকারের লক্ষ্য হচ্ছে ইউরোপের সবচেয়ে শক্তিশালী প্রচলিত (কনভেনশনাল) সেনাবাহিনী গড়ে তোলা। সত্যি বলতে, ফ্রান্স ও ব্রিটেনের পারমাণবিক অস্ত্র রয়েছে, কিন্তু সে কারণে তাদের অন্যান্য প্রতিরক্ষা খাতে খরচ কমাতে হয়। তাই প্রশ্নটা আর “এটা হবে কি না” নয়— বরং “কীভাবে নিশ্চিত করা যায় যে জার্মানির এই সামরিক শক্তি বৃদ্ধির ফলে পুরো ইউরোপ উপকৃত হবে?” র্জামানির এই বড় পরিবর্তনের দুটি প্রধান কারণ আছে। প্রথমত, রাশিয়ার আগ্রাসন— বার্লিনে এখন অনেকেই মনে করেন, পুতিন ইউক্রেনেই থামবেন না। দ্বিতীয়ত, যুক্তরাষ্ট্রের প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প ইউরোপ রক্ষায় আমেরিকার প্রতিশ্রুতিকেই প্রশ্নবিদ্ধ করেছেন, যা ১৯৪৯ সাল থেকে ন্যাটোর মাধ্যমে কার্যকর ছিল। জার্মানি থেকে ৫,০০০ (বা তারও বেশি) মার্কিন সেনা প্রত্যাহারের ঘোষণাও সেই ইঙ্গিত দেয়।
এখন ইউরোপের সামনে বড় চ্যালেঞ্জ হলো— আমরা কি নিজেরাই একটি পারমাণবিক শক্তিধর, আগ্রাসী রাশিয়াকে ঠেকাতে পারব? আরেকটি গুরুত্বপূর্ণ চ্যালেঞ্জ হলো— ইউরোপীয় দেশগুলোর মধ্যে সামরিক শক্তির ভারসাম্য নিয়ে অতীতের মতো উত্তেজনা যেন আবার না ফিরে আসে।
এই দুই প্রশ্নের উত্তর খুঁজতে জার্মানির ভূমিকা অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। তাদের নতুন সামরিক কৌশলের নামই “ইউরোপের প্রতি দায়িত্ব”। কিন্তু শুধু কথায় নয়— কাজেও সেটা ইউরোপীয় হতে হবে।
মূল দুটি ক্ষেত্র হলো— প্রতিরক্ষা শিল্প এবং যুদ্ধ পরিচালনার সক্ষমতা। সামরিক শক্তির “নার্ভ” ও “মাসল” হচ্ছে প্রযুক্তি ও উৎপাদন। ইতিহাসবিদরা মনে করিয়ে দেন, বিসমার্ক “রক্ত ও লোহা” নয়, বরং “লোহা ও রক্ত” বলেছিলেন— অর্থাৎ আগে শিল্প, তারপর যুদ্ধ।
জার্মানি যদি তাদের বাড়তি প্রতিরক্ষা বাজেট নিজেদের শিল্পে বিনিয়োগ করে, তাহলে তারা ফ্রান্সকেও ছাড়িয়ে যেতে পারে অস্ত্র রপ্তানিতে। এতে ফ্রান্স উদ্বিগ্ন। শুধু ফ্রান্স নয়— পোল্যান্ডসহ অন্যান্য দেশও অস্বস্তি বোধ করছে। আরও একটি উদ্বেগ হলো— যদি জাতীয়তাবাদী দল AfD ভবিষ্যতে ক্ষমতায় আসে, তাহলে এই শক্তিশালী সামরিক বাহিনী তাদের নিয়ন্ত্রণে যেতে পারে।
জার্মানির ভেতরেও চাপ আছে— দেশের রপ্তানিনির্ভর অর্থনীতি সংকটে, তাই প্রতিরক্ষা খাতে বিনিয়োগকে সমাধান হিসেবে দেখা হচ্ছে। এমনকি কিছু গাড়ি কারখানাও অস্ত্র উৎপাদনে রূপান্তরিত হচ্ছে।
যুদ্ধের বাস্তবতায়, আজ ইউরোপের নিরাপত্তা এখনও যুক্তরাষ্ট্র-নেতৃত্বাধীন ন্যাটোর ওপর নির্ভরশীল। স্যাটেলাইট তথ্য থেকে শুরু করে বিমান, প্রতিরক্ষা ব্যবস্থা— সব ক্ষেত্রেই আমেরিকার ভূমিকা বড়। তাই ইউরোপকে নিজস্ব শক্তিতে দাঁড় করানো সহজ কাজ নয়, কিন্তু অত্যন্ত জরুরি।
তাহলে শুরু কোথা থেকে? জার্মানির চ্যান্সেলর ফ্রিডরিখ মের্জের উচিত ফ্রান্স, যুক্তরাজ্য ও পোল্যান্ডের নেতাদের সঙ্গে বসে বাস্তবসম্মত আলোচনা করা— কীভাবে ইউরোপের প্রতিরক্ষা শিল্পকে একীভূত করা যায় এবং যুদ্ধ সক্ষমতা বাড়ানো যায়।
বর্তমানে যুক্তরাষ্ট্রের যেখানে ৩৩টি প্রধান অস্ত্র ব্যবস্থা, সেখানে ইউরোপে আছে ১৭৪টি— যা অকার্যকর ও অদক্ষ। তাই সমন্বয় অত্যন্ত জরুরি।
১৯৯০-এর দশকে হেলমুট কোল যেমন একটি ঐক্যবদ্ধ জার্মানিকে ইউরোপীয় অর্থনীতির সঙ্গে যুক্ত করেছিলেন, তেমনই এখন ইউরোপের নিরাপত্তাকে শক্তিশালী করার সুযোগ রয়েছে।
শেষ পর্যন্ত প্রশ্ন দুটি থেকেই যায়:
- ইউরোপ কি সত্যিকারের সমন্বিত প্রতিরক্ষা ব্যবস্থা গড়ে তুলতে পারবে?
- এবং তা কি পুতিনকে নিরুৎসাহিত করার জন্য যথেষ্ট হবে?
যদি জার্মানি ও ইউরোপের নেতারা এই প্রশ্নগুলোর সন্তোষজনক উত্তর দিতে পারেন, তবে ইতিহাসে তাদের স্থান নিশ্চিত হবে।
