মুক্তদেশ ডেস্ক:প্রযুক্তি খাতে লক্ষ লক্ষ কর্মী এখন কঠিন এক বাস্তবতার মুখোমুখি। তাদের উচ্চ বেতনের চাকরিগুলো আর নিরাপদ নয়। কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা (AI) আসার পর তাদের ভবিষ্যৎ আর আগের মতো উজ্জ্বল মনে হচ্ছে না।
যুক্তরাষ্ট্রের বড় প্রযুক্তি কোম্পানিগুলো এআইয়ে বিনিয়োগ বাড়ানোর সঙ্গে সঙ্গে বিপুল সংখ্যক কর্মী ছাঁটাই করছে। গত বছর মাইক্রোসফট ১৫ হাজার কর্মী ছাঁটাই করেছে। অ্যামাজন গত ছয় মাসে ৩০ হাজার কর্মী বাদ দিয়েছে। আর্থিক সেবাদানকারী প্রতিষ্ঠান ব্লক ফেব্রুয়ারিতে তাদের ৪০% কর্মী—অর্থাৎ ৪ হাজারের বেশি মানুষকে ছাঁটাই করেছে। মেটা গত ছয় মাসে ১ হাজারের বেশি কর্মী ছাঁটাই করেছে এবং শিগগিরই মোট কর্মীর ২০% পর্যন্ত ছাঁটাই করতে পারে বলে খবর। সম্প্রতি সফটওয়্যার কোম্পানি ওরাকলও হাজার হাজার কর্মী ছাঁটাই করেছে। পিন্টারেস্ট ও অ্যাটলাসিয়ানও তাদের কর্মীদের যথাক্রমে ১৫% ও ১০% কমিয়েছে। Layoffs.fyi-এর হিসাব অনুযায়ী, গত এক বছরে প্রযুক্তি খাতে ১ লাখ ৬৫ হাজারের বেশি চাকরি হারিয়েছে।
একজন অভিজ্ঞ প্রযুক্তি কর্মী বলেন, “আমার পুরো ক্যারিয়ারে কখনও প্রযুক্তি খাতের ভবিষ্যৎ নিয়ে এতটা হতাশ হইনি। এটা সত্যিই দুঃখজনক, কারণ আমি এই ক্ষেত্রটিকে ভালোবাসি।”
এই উদ্বেগ শুধু সিলিকন ভ্যালিতেই সীমাবদ্ধ নয়। প্রযুক্তি কোম্পানিগুলোকে অন্য ব্যবসার পথপ্রদর্শক হিসেবে দেখা হয়। তাই তারা যখন কর্মী কমায়, তখন অন্য প্রতিষ্ঠানগুলোও একই পথে হাঁটতে পারে।
তবে অনেক এআই বিশেষজ্ঞের মতে, এআই এখনো এমন পর্যায়ে পৌঁছায়নি যে ব্যাপকভাবে মানুষের চাকরি কেড়ে নিতে পারবে। তাহলে আসলে কী ঘটছে?
গত এক মাসে গবেষক, অর্থনীতিবিদ ও প্রযুক্তি কর্মীদের সঙ্গে কথা বলে জানা গেছে—আমরা সবাই এক ধরনের পরীক্ষার মধ্য দিয়ে যাচ্ছি। আগামী কয়েক বছরে এআই ব্যবহারের এই পরীক্ষা থেকে কয়েকটি বড় ফলাফল আসতে পারে: আরও চাকরি কমে যাওয়া, এআইয়ের ওপর অতিরিক্ত নির্ভরতার কারণে অপ্রত্যাশিত সমস্যা, এবং কাজের ধরনে বড় পরিবর্তন।
ওয়ার্টন স্কুলের অধ্যাপক ইথান মলিক বলেন, “এখন যে প্রচারণা চলছে—এআই মানুষকে পুরোপুরি বদলে দিচ্ছে—তা সত্য নয়। আবার এটাও সত্য নয় যে এআই কখনো চাকরির জন্য হুমকি হবে না। বিষয়টা অনেক জটিল।”
কাজের ধরনে পরিবর্তন
OpenAI, Anthropic ও Google-এর মতো প্রতিষ্ঠানগুলো বলছে, তাদের এআই টুল—যেমন ChatGPT, Claude, Gemini—মানুষের কাজের ধরন বদলে দেবে। সময়সাপেক্ষ কাজগুলো স্বয়ংক্রিয় হবে, আর মানুষ জটিল কাজে মন দেবে।
কিন্তু বাস্তবে সবসময় ফলাফল প্রত্যাশামতো হচ্ছে না।
একজন সাবেক ইঞ্জিনিয়ার জানান, এআই কোড দ্রুত তৈরি করলেও কোড রিভিউ করা কঠিন হয়ে যাচ্ছে। “এখন কোড তিনগুণ বেশি হচ্ছে, কিন্তু সেগুলো যাচাই করা যাচ্ছে না,” তিনি বলেন।
অ্যামাজনের এক ডিজাইনার বলেন, তাদের ব্যবহৃত এআই টুলগুলো এখনো পুরোপুরি কার্যকর নয়। তবুও কর্মী ছাঁটাই হয়েছে, যা তাকে বিস্মিত করেছে।
অনেক কর্মীর মধ্যে এমন অনুভূতি তৈরি হয়েছে—যদি তারা এআই ব্যবহার না করে, তাহলে চাকরি হারাতে পারেন।
এআইয়ের ক্ষমতা ও সীমাবদ্ধতা
কিছু কোম্পানি ইতিমধ্যেই এআইয়ের সাফল্যের কথা বলছে। গুগল জানিয়েছে, তাদের ৫০% কোড এআই তৈরি করেছে। ব্লকের ৯০% কোড আংশিক বা পুরোপুরি এআই-নির্ভর।
তবে গবেষকরা বলছেন, এআই এখনো পুরোপুরি নির্ভরযোগ্য নয়। একই প্রশ্নে বারবার ভিন্ন উত্তর দিতে পারে। অনেক সময় ভুল তথ্যও আত্মবিশ্বাসের সঙ্গে দেয়।
প্রিন্সটন বিশ্ববিদ্যালয়ের গবেষক স্টেফান রাবানসার বলেন, “বিশ্বাসযোগ্যতা এখন সবচেয়ে বড় বাধা।”
ক্যালিফোর্নিয়া বিশ্ববিদ্যালয়ের অধ্যাপক স্টুয়ার্ট রাসেল বলেন, এআইকে ভালোভাবে কাজ করতে হলে বিপুল পরিমাণ মানসম্মত ডেটা দরকার—যা ক্রমশ কমে যাচ্ছে।
ঝুঁকি ও বাস্তবতা
কিছু কোম্পানি এখন এআই দিয়ে পুরো কাজ চালানোর চেষ্টা করছে—যেখানে মানুষের তদারকি নেই। এটিকে “ডার্ক ফ্যাক্টরি” বলা হচ্ছে। তবে এতে বড় ঝুঁকি রয়েছে—আর্থিক ক্ষতি, সুনাম নষ্ট হওয়া এবং ভুল সিদ্ধান্তের সম্ভাবনা।
বিশেষজ্ঞরা সতর্ক করছেন, স্বাস্থ্যসেবা বা বিচারব্যবস্থার মতো গুরুত্বপূর্ণ ক্ষেত্রে এআইয়ের ভুল মারাত্মক হতে পারে।
ছাঁটাইয়ের আসল কারণ
অনেক সময় কোম্পানিগুলো এআইকে অজুহাত হিসেবে ব্যবহার করছে বলেও ধারণা করা হচ্ছে। প্রকৃত কারণ হতে পারে অর্থনৈতিক চাপ, কম চাহিদা বা অতিরিক্ত কর্মী থাকা।
একজন বিশেষজ্ঞ বলেন, “এআইকে দায়ী করা সহজ, কারণ এটা এখন জনপ্রিয় বিষয়।”
ভবিষ্যৎ অনিশ্চিত
বিনিয়োগকারীরা এআই থেকে লাভের আশা করছে। কর্মী কমালে লাভ বাড়তে পারে—এমন ধারণাও রয়েছে। তবে বাজারও এখনো নিশ্চিত নয়, এই কৌশল দীর্ঘমেয়াদে কাজ করবে কি না।
সব মিলিয়ে, এআই কিছু কাজ বদলে দিচ্ছে ঠিকই, কিন্তু এর পূর্ণ প্রভাব বুঝতে আরও সময় লাগবে।
ইথান মলিক বলেন, “আগামী কয়েক বছরে পরিবর্তন দেখা যাবে। এআই ইতিমধ্যে প্রোগ্রামিং বদলে দিচ্ছে। তবে চাকরির ওপর এর প্রভাব কী হবে, তা এখনো পরিষ্কার নয়।”
