মুক্তদেশ ডেস্ক: ইরাকের মাটির নিচে গড়ে উঠছে ইরানের বিশাল এক ক্ষেপণাস্ত্র নেটওয়ার্ক। সাম্প্রতিক গোয়েন্দা তথ্য ও ভিডিও ফুটেজ বিশ্লেষণে দেখা গেছে, ইরাকের ভূগর্ভস্থ এলাকা এখন প্রায় ‘সুইস চিজ’-এর মতো ছিদ্রযুক্ত। সেখানে ডজনখানেক গোপন ক্ষেপণাস্ত্র শহর বা ‘মিসাইল সিটি’ নির্মাণ করা হয়েছে।
ইরাকের ভূখণ্ড তুলনামূলকভাবে সমতল হলেও অত্যাধুনিক প্রযুক্তি ব্যবহার করে মাটির গভীরে এসব টানেল খনন করা হচ্ছে। এই প্রকল্পের পরিকল্পনা শুরু হয়েছিল কাসেম সুলাইমানির সময়। বর্তমানে ইসমাইল কায়ানির নেতৃত্বে এর কাজ দ্রুতগতিতে এগিয়ে চলছে।
‘মিসাইল সিটিতে’ কী আছে
এসব টানেল মাটির প্রায় ৫০০ মিটার (প্রায় ১,৬০০ ফুট) গভীরে, পাহাড়ের নিচে নির্মিত। এত গভীরে হওয়ায় এগুলো প্রচলিত ‘বাঙ্কার বাস্টার’ বোমা এমনকি পারমাণবিক হামলার ধাক্কাও সহ্য করতে পারে বলে ধারণা করা হচ্ছে।
ইরানের প্রকাশিত ভিডিও অনুযায়ী, টানেলগুলো এতটাই প্রশস্ত যে বড় বড় মিসাইলবাহী ট্রাক বা লঞ্চার পাশাপাশি চলাচল করতে পারে। এজন্য এগুলোকে অনেকেই ‘আন্ডারগ্রাউন্ড হাইওয়ে’ বলেও উল্লেখ করছেন। এসব স্থাপনায় হাজার হাজার ব্যালিস্টিক ক্ষেপণাস্ত্র মজুত রাখা হয়েছে বলে দাবি করা হয়।
টানেলের ভেতর থেকেই সরাসরি ক্ষেপণাস্ত্র নিক্ষেপের জন্য স্বয়ংক্রিয় ব্যবস্থা—যেমন রেলভিত্তিক লঞ্চ সিস্টেম—স্থাপন করা হয়েছে। ইরানের ৩১টি প্রদেশেও এ ধরনের টানেল নেটওয়ার্ক রয়েছে বলে জানা যায়। কেন্দ্রীয় যোগাযোগ বিচ্ছিন্ন হলেও এসব নেটওয়ার্ক স্বতন্ত্রভাবে পরিচালিত হতে সক্ষম।
কৌশলগত সুবিধা
বর্তমানে সেখানে ‘কাহ’ নামের স্বল্পপাল্লার (৮৫ কিলোমিটার) নির্ভুল ক্ষেপণাস্ত্র দেখা গেলেও ভবিষ্যতে এখানে দীর্ঘপাল্লার ভারী ক্ষেপণাস্ত্র মোতায়েনের পরিকল্পনা রয়েছে।
সিরিয়া সীমান্তের কাছাকাছি এসব টানেলের অবস্থান হওয়ায় এখান থেকে সহজেই শত্রুপক্ষের ঘাঁটিতে আকস্মিক হামলা চালানো সম্ভব। শুধু সরঞ্জাম সরবরাহ নয়, বরং এসব টানেলের ভেতরেই ক্ষেপণাস্ত্র তৈরির কারখানা বা অ্যাসেম্বলি লাইন স্থাপনের পরিকল্পনাও রয়েছে।
এর ফলে শত্রুপক্ষের পক্ষে পুরো সরবরাহ ব্যবস্থা ধ্বংস করা প্রায় অসম্ভব হয়ে উঠতে পারে।
গাজার ‘গাজা মেট্রো’ টানেল নেটওয়ার্কের অভিজ্ঞতাকেও এখানে বড় পরিসরে কাজে লাগানো হচ্ছে। অনেক বিশ্লেষকের মতে, এটি সেই টানেল ব্যবস্থার আরও উন্নত ও বিস্তৃত সংস্করণ।
ইরাকের বিশাল ভৌগোলিক বিস্তৃতি বিবেচনায় এই নেটওয়ার্ক সম্পূর্ণভাবে ধ্বংস করা যেকোনো আধুনিক সেনাবাহিনীর জন্য অত্যন্ত কঠিন ও ব্যয়বহুল হবে।
মূল উদ্দেশ্য
এই প্রকল্পের মাধ্যমে ইরান তার প্রতিরক্ষা সীমানাকে কার্যত ভূমধ্যসাগর পর্যন্ত বিস্তৃত করার চেষ্টা করছে। ফলে ইরাকও ইয়েমেন বা লেবাননের মতো ‘প্রতিরোধ অক্ষ’ (Axis of Resistance)-এর একটি গুরুত্বপূর্ণ ঘাঁটিতে পরিণত হচ্ছে।
বিশেষজ্ঞদের মতে, ইরানের লক্ষ্য হলো ইরাককে একটি শক্তিশালী ও স্বাধীন সামরিক ফ্রন্ট হিসেবে গড়ে তোলা। যাতে সম্ভাব্য যুদ্ধে ইসরায়েল বা যুক্তরাষ্ট্র বিভিন্ন দিক থেকে আসা আক্রমণের মুখে বিভ্রান্ত হয়ে পড়ে।
তাদের মতে, ইরান ও ইরাকের ভৌগোলিক এবং ধর্মীয় সম্পর্ককে কাজে লাগিয়ে কার্যত দুই দেশের সামরিক প্রতিরক্ষা পরিসরকে একীভূত করা হচ্ছে—যা মধ্যপ্রাচ্যে মার্কিন ও পশ্চিমা উপস্থিতির জন্য বড় চ্যালেঞ্জ হয়ে উঠতে পারে।
