মুক্তদেশ ডেস্ক:
সম্প্রতি এক সন্ধ্যায় ভারতের উত্তর প্রদেশের শিল্পনগর কানপুরের একটি মুসলিমপ্রধান মহল্লায় এক উজ্জ্বল সাইনবোর্ড জ্বলে উঠল। বোর্ডে লেখা ছিল: “I love Muhammad” — যেখানে “love” শব্দের জায়গায় একটি লাল হৃদয়চিহ্ন ছিল। এটাই ছিল প্রথমবার, যখন কানপুরের সাঈদ নগরের মূলত শ্রমজীবী মুসলমানরা এমন এক সাইনবোর্ড লাগিয়েছিলেন নবীজির জন্মদিন উপলক্ষে। এই দিনটি দক্ষিণ এশিয়া জুড়ে ঈদে মিলাদুন্নবী হিসেবে পালিত হয়। মুসলমানরা নবীজির জীবন ও শিক্ষার ওপর ধর্মীয় সমাবেশ, কোরআন তেলাওয়াত ও ওয়াজ মাহফিল আয়োজন করেন। অনেক জায়গায় মিছিলও হয়, যেখানে মানুষ নবীজির প্রতি ভালোবাসা ও শ্রদ্ধা প্রকাশ করে পোস্টার বহন করেন।কিন্তু সাঈদ নগরে বোর্ডটি জ্বলে উঠতেই কিছু হিন্দু যুবক আপত্তি জানিয়ে ঘটনাস্থলে ছুটে আসে। পুলিশ ডাকা হয়, এবং কয়েক ঘণ্টার তর্ক-বিতর্ক শেষে গভীর রাতে বোর্ডটি খুলে ফেলা হয়।পুলিশ নয়জন মুসলমান ও অজ্ঞাতনামা ১৫ জনের বিরুদ্ধে ধর্মীয় বিদ্বেষ ছড়ানো ও অন্য ধর্মের অনুভূতিতে আঘাত করা সংক্রান্ত মামলা করে। তবে এখনো কোনো গ্রেপ্তার হয়নি।সাঈদ নগরের এক হিন্দু সংগঠন শ্রী রামনবমি সমিতি-র সদস্য মোহিত বাজপেয়ী আল জাজিরাকে বলেন, তার ‘I love Muhammad’ লেখায় আপত্তি নেই, কিন্তু বোর্ডটি এমন স্থানে ঝোলানো হয়েছিল যেখানে তারা রামনবমি উৎসবের সাজসজ্জা করেন।
“সংবিধান সব ধর্মকে সমান অধিকার দেয়। কিন্তু নতুন জায়গায় নতুন ধর্মীয় প্রথা শুরু করা উচিত নয়,” বলেন তিনি।অন্যদিকে, মুসলিম বাসিন্দারা দাবি করেন, ওই স্থানটিতে তারা প্রতিবছরই নবীজির জন্মদিন উপলক্ষে মিলাদুন্নবীর আয়োজন করেন। একজন ২৮ বছর বয়সী অভিযুক্ত যুবক বলেন, “আমাদের কাছে সাজসজ্জার সরকারি অনুমতিও ছিল। সংবিধান অনুযায়ী সবাই তাদের ধর্ম পালনের অধিকার রাখে।”‘সম্প্রীতি নষ্টের অভিযোগ’
উত্তর প্রদেশে প্রায় ৩ কোটি ৮০ লাখ মুসলমান বাস করে — যা সৌদি আরবের জনসংখ্যার চেয়েও বেশি — এবং রাজ্যের মোট জনসংখ্যার প্রায় ২০ শতাংশ। ২০১৭ সাল থেকে রাজ্যটি শাসন করছেন কঠোর হিন্দুত্ববাদী সন্ন্যাসী যোগী আদিত্যনাথ, যিনি প্রধানমন্ত্রী নরেন্দ্র মোদির বিজেপির একজন প্রভাবশালী নেতা এবং মুসলিমবিরোধী বক্তব্যের জন্য পরিচিত। কানপুরের ঘটনার কয়েক দিন পরই প্রায় ২৭০ কিলোমিটার দূরের বেরেলি শহরে একই রকম বিতর্ক ছড়ায় — যা সুন্নি মুসলমানদের বেরেলভি মতবাদ-এর কেন্দ্র হিসেবে পরিচিত। ১০ সেপ্টেম্বর বেরেলিতে নয়জন মুসলমানের বিরুদ্ধে মামলা হয়, যাদের বিরুদ্ধে অভিযোগ আনা হয় যে তারা সম্প্রীতি নষ্ট করেছে এবং নতুন ধর্মীয় প্রথা শুরু করেছে যা জনশৃঙ্খলার জন্য হুমকি। ২১ সেপ্টেম্বর বেরেলিভিত্তিক সংগঠন ইত্তেহাদে মিল্লাত কাউন্সিল (IMC)-এর প্রধান মাওলানা তৌকির রাজা খান—যিনি বেরেলভি মতবাদের প্রবর্তক ইমাম আহমদ রাজা খানের বংশধর—প্রতিবাদের ডাক দেন এবং ২৬ সেপ্টেম্বর শুক্রবার জুমার নামাজের পর সমাবেশ করার আহ্বান জানান। কর্তৃপক্ষ অনুমতি না দেওয়ায় সংগঠনটি ২৫ সেপ্টেম্বর এক বিবৃতিতে প্রতিবাদ স্থগিতের কথা জানায়। কিন্তু কিছুক্ষণ পর সামাজিক মাধ্যমে একটি ভুয়া বার্তা ছড়ায় যে বিবৃতিটি নাকি মিথ্যা এবং সংগঠনটিকে অপমান করার জন্য করা হয়েছে।
পরের দিন, শুক্রবার নামাজের পর হাজারো মুসলমান বেরেলির এক বিখ্যাত দরগার কাছে জড়ো হয়, হাতে “I love Muhammad” লেখা পোস্টার ও পুলিশের বিরুদ্ধে স্লোগান নিয়ে।প্রশাসনের দাবি, এই মিছিল অনুমোদনহীন ছিল এবং কিছু অংশগ্রহণকারী পুলিশের ওপর পাথর নিক্ষেপ ও ভাঙচুর করে। পুলিশ লাঠিচার্জ করে এবং মাওলানা তৌকির রাজা খানসহ বহুজনকে গ্রেপ্তার করে; শহরে ইন্টারনেট বন্ধ করে দেওয়া হয়। গ্রেপ্তারের আগে রেকর্ড করা এক ভিডিও বার্তায় খান বলেন, “আমাদের ধর্মীয় অনুভূতি দমিয়ে রাখার চেষ্টা করলে তার ফল উল্টো হবে।” পরদিন লখনউয়ে এক অনুষ্ঠানে মুখ্যমন্ত্রী আদিত্যনাথ ঘটনাটিকে “পরিকল্পিতভাবে সামাজিক সম্প্রীতি নষ্টের প্রচেষ্টা” বলে অভিহিত করেন। তিনি বলেন, “কখনো কখনো মানুষের খারাপ অভ্যাস ছাড়ানো কঠিন হয়, তখন কিছুটা ‘ডেন্টিং-পেইন্টিং’ দরকার হয়… গতকাল বেরেলিতে আপনি তা দেখেছেন। এক মাওলানা ভুলে গিয়েছিলেন কে ক্ষমতায় আছে।” এরপরই ‘ডেন্টিং-পেইন্টিং’ শুরু হয় — অর্থাৎ মুসলমানদের বিরুদ্ধে প্রশাসনিক কঠোরতা। অভিযুক্তদের একজনের মালিকানাধীন একটি ব্যাংকোয়েট হল বুলডোজার দিয়ে গুঁড়িয়ে দেয় স্থানীয় প্রশাসন, যা উত্তর প্রদেশে মুসলমানদের ওপর সরকারের কঠোর দমননীতির আরেকটি দৃষ্টান্ত হয়ে ওঠে।
