মুক্তদেশ ডেস্ক:
ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় কেন্দ্রীয় ছাত্র সংসদ (ডাকসু) নির্বাচনে প্রচারে নেমেছেন প্রার্থীরা। ব্যক্তিগত পর্যায় ও প্যানেলসহ তারা ভোটারদের কাছে পৌঁছানোর চেষ্টা করছেন, জানতে চাচ্ছেন তাদের চাওয়া-পাওয়া। একই সঙ্গে তাদের কাছে নিজেদের অতীতের শিক্ষার্থীবান্ধব কর্মকাণ্ডের ফিরিস্তি তুলে ধরছেন। বিশেষ করে ছাত্রী ও অনাবাসিক ভোটারদের আলাদা গুরুত্ব দিচ্ছে প্যানেলগুলো। ছাত্রীদের ভোট টানতে নারীবান্ধব ক্যাম্পাসের প্রতিশ্রুতি দিচ্ছেন প্রার্থীরা।
এবারের ডাকসু ও হল সংসদ নির্বাচনে ভোটার ৩৯ হাজার ৭৭৫ জন। এর মধ্যে ছাত্র ভোটার ২০ হাজার ৮৭১ জন ও ছাত্রী ভোটার ১৮ হাজার ৯০২ জন। এবারের নির্বাচনে ছাত্রী ও অনাবাসিক ভোটাররা বড় একটা পার্থক্য গড়ে দেবে বলে মনে করছেন অনেকে। এই বিষয়টি মাথায় রেখে বিশেষ কৌশল নিচ্ছে প্যানেলগুলো। তারা এসব শিক্ষার্থীর সঙ্গে কথা বলে তাদের দাবি-দাওয়া ইশতেহারে অন্তর্ভুক্ত করছেন। বিভিন্ন প্যানেলের ৯ জন ভিপি ও জিএস প্রার্থীর সঙ্গে কথা বলেছে সমকাল। তাদের সঙ্গে কথা বলে জানা যায়, আবাসিক হলগুলোর পাশাপাশি অনাবাসিক ভোটারদের টানতে বিশেষভাবে কাজ করছে প্যানেলগুলো। এ ছাড়া ছাত্রীদের আবাসন, স্বাস্থ্য, গর্ভকালীন ছুটি ও ক্লাস উপস্থিতির বিষয় শিথিল করাসহ বিভিন্ন সমস্যার সমাধান ডাকসুর মাধ্যমে তারা করবেন।
অন্যদিকে, অনাবাসিক শিক্ষার্থীদের ভোট টানতে ‘তুরুপের তাস’ হিসেবে কাজ করবে বিশ্ববিদ্যালয়ের লাল বাস। ডাকসুর মাধ্যমে বাসের শিডিউল ও অবস্থান সংক্রান্ত সমস্যার সমাধানে কাজ করার প্রতিশ্রুতি দিয়ে তাদের আকৃষ্ট করার চেষ্টা করা হচ্ছে। এ ছাড়া ভোটারদের একাডেমিক ও হল সমস্যার সমাধানেরও প্রতিশ্রুতি দিচ্ছেন প্রার্থীরা।
ছাত্রদলের প্যানেলের জিএস প্রার্থী তানভীর বারী হামিম সমকালকে বলেন, আমাদের ইশতেহারে শিক্ষার্থীদের দাবি-দাওয়ার ব্যাপারে বলেছি। আমাদের প্রথম বর্ষের শিক্ষার্থীরা ভালোমানের খাবার এবং আবাসন সংকটে ভোগে। এ ব্যাপারে যাতে উদ্যোগ নেওয়া হয়।
মাস্টার্সের ফলাফলের সঙ্গে সঙ্গে যেন শিক্ষার্থীর হলের আসন বাতিল হয়– সে পদ্ধতি চালু করব।
প্রথম বর্ষের শিক্ষার্থীদের জন্য কম্পিউটার লিটারেসি, এআই প্রেজেন্টেশন প্রশিক্ষণ দেব। শিক্ষার্থীরা পড়াশোনার সমস্যার ব্যাপারে মাস্টার্সের শিক্ষার্থীদের দিয়ে প্রথম বর্ষের অ্যাডভাইজিং টিম করব, যেটা প্রাইভেট ইউনিভার্সিটিতে আছে। এতে কর্মসংস্থানও হবে।
বাংলাদেশ গণতান্ত্রিক ছাত্র সংসদ সমর্থিত প্যানেল ‘বৈষম্যবিরোধী শিক্ষার্থী সংসদ’-এর ভিপি প্রার্থী আব্দুল কাদের বলেন, আমরা শিক্ষার্থীদের কাছে ও হলগুলোতে যাচ্ছি। আমরা অনাবাসিক শিক্ষার্থীদের যেখানে ভিড় দেখছি, সেখানে যাচ্ছি। বিশেষত পাঁচ হলের নারী শিক্ষার্থী, সনাতন ধর্মাবলম্বীসহ সবার কাছেই যাচ্ছি।
ছাত্রশিবির সমর্থিত ‘ঐক্যবদ্ধ শিক্ষার্থী জোটের’ ভিপি প্রার্থী আবু সাদিক কায়েম বলেন, ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় পুরো পলিটিক্যাল ইনস্টিটিউট হয়ে গেছে। আমরা একাডেমিক ইনস্টিটিউটের দিকে যেতে চাই। একাডেমিক এক্সিলেন্স নিশ্চিত করতে চাই। গবেষণার বাজেট বাড়ানো, রেজিস্ট্রার ভবনের ডিজিটালাইজেশন, ডে কেয়ার সিস্টেম, পরিবহন সংকটের পার্মানেন্ট সমাধান নিয়ে প্রস্তাবনা আছে। বিশেষত নারী শিক্ষার্থীদের ভোগান্তি নিয়ে আমাদের প্রস্তাবনা রয়েছে। ৪৭ শতাংশ নারী শিক্ষার্থীর জন্য মাত্র পাঁচটি হল। আমরা ছাত্রী আবাসন সংকট দূর করতে চাই।
উমামা ফাতেমার প্যানেল ‘স্বতন্ত্র শিক্ষার্থী ঐক্যের’ জিএস প্রার্থী আল সাদী ভূঁইয়া বলেন, বিরাজনীতিকরণ কিংবা দলীয়করণ নয়, আমরা ক্যাম্পাসে রাজনৈতিক সচেতনতা তৈরি করতে চাই। একটি একাডেমিক ক্যাম্পাস করতে চাই। আমাদের অবস্থান, একাডেমিক অঙ্গন যেমন, ফ্যাকাল্টি ও হলে আমরা ছাত্র রাজনীতির বিরোধিতা বা কোনো কার্যক্রম বিরোধিতার কথা বলেছি।
ছাত্র অধিকার পরিষদ সমর্থিত ‘ডাকসু ফর চেঞ্জ’ প্যানেলের ভিপি প্রার্থী বিন ইয়ামিন মোল্লা বলেন, ভোটারদের একটি বড় অংশ নারী শিক্ষার্থী। নারীদের নিরাপত্তা, আবাসন, স্বাস্থ্য, শারীরিকভাবে প্রতিবন্ধকতার শিকার নারীদের কার্যক্রম সহজ করাসহ তাদের নানা বিষয়ে আমরা কাজ করব। আমরা ডাকসুতে নির্বাচিত হলে বিশ্ববিদ্যালয়ের মাস্টারপ্ল্যান পুনর্বিবেচনা করে নারী শিক্ষার্থীদের আবাসন সংকট দূর করতে কাজ করব।
সাত বাম ছাত্র সংগঠন সমর্থিত প্যানেল ‘প্রতিরোধ পরিষদ’-এর ভিপি প্রার্থী শেখ তাসনিম আফরোজ ইমি বলেন, ক্যাম্পাসে অন্যায়ের বিরুদ্ধে আমাদের লড়াই-সংগ্রাম দীর্ঘদিনের। এই লড়াইটাই আমাদের ভোটারদের কাছে যাওয়ার সাঁকো। অন্যায়ের বিরুদ্ধে আমাদের আপসহীনতার কথাই আমরা শিক্ষার্থীদের সামনে তুলে ধরছি। তারাও আমাদের খুব ভালোভাবে গ্রহণ করছেন। আমাদের প্যানেলে ভিপিসহ অন্য পদে সবচেয়ে বেশি নারী আছেন।
খালিদ-মাহিন নেতৃত্বাধীন প্যানেল সমন্বিত শিক্ষার্থী সংসদের ভিপি প্রার্থী জামালুদ্দীন মুহাম্মদ খালিদ বলেন, আমরা ব্যক্তিগতভাবে ও প্যানেলসহ বিভিন্ন হল, বিভাগ ও বিভিন্ন জেলার সংগঠনেও যাচ্ছি। এ ছাড়া অনাবাসিক শিক্ষার্থীদের সঙ্গে কথা বলতে আমরা কার্জন হল, ভিসি চত্বরসহ বিশ্ববিদ্যালয়ের বিভিন্ন বাসস্টপগুলোতে যাচ্ছি। এ ছাড়া মেয়েদের হলগুলোতে টিমভিত্তিক প্রচারণা চালাচ্ছি।
তিন বাম ছাত্র সংগঠন সমর্থিত প্যানেল ‘অপরাজেয় ৭১-অদম্য ২৪’-এর ভিপি প্রার্থী নাইম হাসান হৃদয় বলেন, আমাদের ইশতেহারে মূলত শিক্ষার্থীদের নিজের মুখে বলা সমস্যাগুলোর সমাধানে কাজ করার অঙ্গীকার থাকবে। আমাদের ছাত্র সংগঠনগুলোর নারী কর্মীরা মেয়েদের হলগুলোতে গিয়ে তাদের সঙ্গে কথা বলেছেন। ছাত্রীরা তাদের সুনির্দিষ্ট দাবি-দাওয়া বিশেষ করে হলভিত্তিক সমস্যা আমাদের কাছে তুলে ধরেছেন। তাদের চাওয়া-পাওয়াগুলোই আমাদের ইশতেহারে থাকবে।
ইসলামী ছাত্র আন্দোলন সমর্থিত প্যানেল ‘সচেতন শিক্ষার্থী সংসদ’-এর জিএস প্রার্থী খায়রুল আহসান মারজান বলেন, ক্যাম্পাসে হিজাব ও ইসলামোফোবিয়ার বিরুদ্ধে আন্দোলনসহ শিক্ষার্থীদের স্বার্থে আমাদের বিভিন্ন আন্দোলনের ইতিহাস আমরা শিক্ষার্থীদের কাছে তুলে ধরেছি। আমরা আগেও শির্ক্ষাথীদের সঙ্গে ছিলাম, ডাকসুর মাধ্যমে সামনেও থাকব, এই প্রতিশ্রুতি আমরা দিয়েছি শিক্ষার্থীদের ।
