এম. হাসান
আপনি কীভাবে নিজেকে এখনই কাজ শুরু করতে বাধ্য করবেন? চলুন কিছু কার্যকর পরামর্শ জেনে নেওয়া যাক।
১. আপনার কাজের ফলাফল সম্পর্কে ইতিবাচকভাবে ভাবুন। আপনি যা করতে যাচ্ছেন, সেটার ফলাফল কেমন হবে, তা নিয়ে গভীরভাবে চিন্তা করুন। আপনার কল্পনায় পরিষ্কারভাবে ও প্রাণবন্তভাবে দেখে ফেলুন আপনার কাজটি শেষ হলে আপনি কী অর্জন করবেন। আপনি কিছু অর্জন করতে চাইছেন, বা কোনো সমস্যার সমাধান করতে চাইছেন। দুই ক্ষেত্রেই ভাবুন, কাজটি শেষ হওয়ার পরে আপনার জীবন কেমন হবে। আপনার কল্পনাশক্তি যত গভীর হবে, আপনার মধ্যে কাজের ইচ্ছাও তত বাড়বে।
২. ভাবুন, কাজ না করলে কী কী খারাপ হতে পারে। আমরা অনেক সময় কোনো কাজ এড়িয়ে যাই, কারণ সেটার সঙ্গে আমরা কিছু অস্বস্তি, কষ্ট বা ভয় জড়িয়ে ফেলি। যদিও সেই কাজটি ভবিষ্যতে আমাদের আনন্দ ও সাফল্য এনে দিতে পারে, তবু আমরা ছোটখাটো কষ্ট এড়াতে গিয়ে অনেক বড় ভালো দিক হাতছাড়া করি। এই মানসিকতা থেকে বের হওয়ার উপায় কী? আপনি যদি কাজ না করেন, তাহলে কী আরও বড় ক্ষতি হতে পারে সেটার কথা ভাবুন। যেমন: কাজটা না করলে হয়তো সারা জীবনের আফসোস থাকবে। এই ভয়টা কাজে লাগান। কাজ করার অল্প কষ্টের পরিবর্তে, কাজ না করার বড় কষ্টের কথা ভাবুন।
৩. সব অজুহাত সামনে আনুন তারপর ভেঙে ফেলুন। আপনি কাজটা না করার যত অজুহাত মাথায় আনতে পারেন, সব এক এক করে লিখে ফেলুন। তারপর এক শব্দ দিয়ে সেগুলোকে ধ্বংস করুন। সেই শব্দটি হলো: ‘কিন্তু’। এই কিন্তু শব্দটি অজুহাতকে ধ্বংস করে দিতে পারে।
উদাহরণ:
আজ খুব ক্লান্ত লাগছে, কিন্তু এই কাজটা করলে আমার প্রেজেন্টেশনে অনেক ভালো হবে।
আমি আগে কখনো এটা করিনি, কিন্তু আমি শিখে নিতে পারি।
প্রতিটি অজুহাতের শেষে ‘কিন্তু’ লাগান এবং বাক্যটি ইতিবাচকভাবে শেষ করুন।
সব অজুহাতকে এভাবে মোকাবিলা করুন, তাহলেই এগিয়ে চলা সহজ হবে।
৪. আপনি যে পরিস্থিতিতে আছেন, তা নিয়ে বিরক্তি অনুভব করুন এবং সেটাকে শক্তিতে রূপান্তর করুন। আপনি যদি সত্যিই বিরক্ত হন, তাহলে সেই বিরক্তি আপনাকে জানা”্ছে সময় এসেছে কিছু পরিবর্তন করার। তবে অনেক সময় আমরা বিরক্ত হলে তা থেকে পালিয়ে যাই অন্য কিছুতে মন দিই, অভিযোগ করি, কিন্তু প্রকৃত সমস্যা ঠিক করি না। কিন্তু আপনি যদি এই বিরক্তিটাকে সম্পূর্ণভাবে অনুভব করেন, যদি তা আপনাকে ভিতর থেকে নাড়িয়ে দেয়, তাহলে সেই অনুভূতিটাই আপনাকে তাৎক্ষণিক ইতিবাচক পদক্ষেপ নিতে সাহায্য করতে পারে। আপনার হতাশা, কষ্ট, বিরক্তি সবকিছুকে শক্তিতে রূপান্তর করুন।
৫. খুব ছোট একটি পদক্ষেপ নিন। পুরো কাজ নিয়ে চিন্তা না করে, কেবল একটি ছোট ও সহজ কাজ দিয়ে শুরু করুন। এই ছোট পদক্ষেপ আপনাকে চলার জন্য দরকারি গতি এনে দেবে।
যেমন: আপনি যদি গ্যারেজ পরিষ্কার করতে চান, তাহলে শুধু একটামাত্র পুরনো জিনিস ফেলে দিন। তারপর সেই ছোট কাজটির পর আপনার যে ভালো লাগা আসবে, সেটি অনুভব করুন। এই একটুখানি গতি আপনাকে পুরো কাজ শেষ করতে উৎসাহ দেবে।
৬. নিজেকে ‘আমার আমি’ ভাবুন:
সবচেয়ে ভালোভাবে প্রতিযোগিতা করার উপায় হলো প্রতিযোগিতাকে একেবারেই উপেক্ষা করা। সবচেয়ে বড় সুবিধা সে-ই পায়, যে কখনও সুবিধা পাওয়ার পেছনে ছোটে না। আপনি যদি সবসময় চিন্তা করেন অন্য কেউ কী করছে, তাহলে নিজের সেরা কাজগুলো করার সুযোগ হারিয়ে ফেলবেন।আপনি যদি সবসময় অন্যদের হারানোর চেষ্টা করেন, তাহলে ভুলে যাবেন আপনার সবচেয়ে বড় শক্তি কী, আর সেটা হলো আপনার নিজের দৃষ্টিভঙ্গি।
আপনি কি জানেন, আপনার দাম কতটা? আপনার ভাবনা, ধারণা, অনুভব, দক্ষতা, আগ্রহ, সম্পর্ক আর অভিজ্ঞতা সবকিছু মিলিয়ে আপনি এমন এক মানুষ, যাঁর কোনো দ্বিতীয়জন নেই এই গোটা মহাবিশ্বে। হীরা দামি, কারণ সেটা খুব কম পাওয়া যায়। কিন্তু আপনি তার চেয়েও অনেক বেশি দামী কারণ আপনি একজনই; পৃথিবীতে আর কেউ আপনার মতো নয়।
আপনার মতো একজন মানুষ থাকলে, হীরাগুলোর হয়তো ছাড়ে বিক্রি হতো! তাহলে বলুন তো, নিজেকে সবসময় অন্যদের সঙ্গে তুলনা করা, নিজের জীবনকে বাইরের মানদন্ড দিয়ে বিচার করা এগুলো কি আসলেই যুক্তিযুক্ত? একজন দক্ষ শিল্পীর আঁকা আসল একটি চিত্রকর্ম কল্পনা করুন। সেই মূল ছবির দাম হবে অনেক বেশি সেরা অনুলিপির চেয়েও বেশি। কেন জানেন? কারণ এটা একটাই। একমাত্র। আপনি যদি সত্যিকারের মূল্য তৈরি করতে চান, তাহলে দয়া করে অন্যের কাজের কপি করবেন না। নিজেকে প্রকাশ করুন, নিজের মতো করে। হ্যাঁ, আপনি পারবেন।
কীভাবে? : নিজের ভাবনাগুলোকে অবহেলা না করে, নিজের সত্যিকারের ইচ্ছাগুলোকে প্রকাশ করে, সেগুলো নিয়ে চিন্তা করে, যাচাই করে কিন্তু কখনোই তাদের অসম্মান না করে। এই চিন্তা আর ইচ্ছাগুলো আসতে হবে আপনার ভেতর থেকে।আপনার সেই একমাত্র ও অনন্য দৃষ্টিভঙ্গি থেকে। এসেছে সেই জায়গা থেকে, যেটা শুধুই আপনার। নিজেকে বোঝা, নিজের কথা বলা, নিজের ভাবনা প্রকাশ করা এগুলো আত্মপ্রেম নয়। আত্মপ্রেম বা নার্সিসিজম হলো নিজেকে সবার চেয়ে বড় ভাবা। আবার, নিজেকে সবার চেয়ে ছোট ভাবাটাও সমান করুণ। এভাবে তুলনা করলেই কেবল সময় নষ্ট হয়। সত্যি বলতে, তুলনা কোনো কাজে আসে না। আপনি যেদিকেই তুলুন না কেন, তা ফলদায়ক নয়। তাই দয়া করে তুলনা করা বাদ দিন। আপনার ভেতরে যেসব সম্ভাবনা লুকিয়ে আছে, সেগুলোকে জাগিয়ে তুলুন। আপনার সেই মূল্যবান শক্তিকে কাজে লাগান। হীরা কিংবা অন্যান্য চকচকে বস্তু নিয়ে চিন্তা করে সময় নষ্ট করবেন না, কারণ আপনার ভেতরে আছে এমন কিছু, যা তার চেয়েও অতুলনীয়ভাবে মূল্যবান। আপনার আছে জীবন একটি দৃষ্টিভঙ্গি থেকে দেখা জীবন, যেটা আগে কখনও কেউ অনুভব করেনি, আর যা প্রতিদিন আরও গভীর, আরও অর্থবহ হয়ে উঠছে। শুধু অন্যদের চেয়ে এগিয়ে যাওয়ার চেষ্টা করে ক্ষান্ত হবেন না। কারণ, সেটি অর্জন করলেও আপনার হৃদয়ে সত্যিকারের শান্তি আসবে না। বরং নিজেকে নিয়ে যান আরও এক উচ্চতায়। আপনি হোন আপনি নিজেই। আপনি হোন সেই একমাত্র, আসল, অনন্য প্রকাশ, যিনি জীবনকে ভালোবাসেন, সবকিছুকে গ্রহণ করেন আর পূর্ণভাবে বাঁচেন। আপনি অনন্য, আপনি দামী, আপনি একমাত্র। তাই নিজের মতো করে বাঁচুন ভালোবাসা নিয়ে, আত্মবিশ্বাসে ভরপুর হয়ে।
৭. কাজটিকে মজা করে তুলুন। আপনি যদি কোনো কাজকে মজার মনে করেন, তাহলে সেটা করতে কাউকে আপনাকে জোর দিতে হয় না। কাজটা যদি মজার হয়, তাহলে আপনি নিজে থেকেই তা করতে আগ্রহী হবেন। আপনি যেকোনো কাজকে মজার করে তুলতে পারেন শুধু মানসিকতা পরিবর্তন করতে হবে। যদি আপনি আনন্দ নিয়ে কাজ করতে পারেন, তাহলে কাজের মানও ভালো হবে। সেরা খেলোয়াড়েরা খেলা উপভোগ করেন। সেরা গজলশিল্পীরা গজলকে ভালোবাসেন। সেরা সফল মানুষগুলো সাফল্যের পথটাকেই উপভোগ করেন।
প্যাটার্নটা বুঝতে পারছেন তো? আপনাকে যেটা করতে হবে, সেটা হয় ভালোবাসা দিয়ে করুন, না হয় যেটা করছেন, সেটা ভালোবেসে করুন। কোনটা করছেন, সেটা বড় কথা নয় কাজ করাই মূল বিষয়। হ্যাঁ, আপনি যদি চান, কষ্ট করে নিজের ইচ্ছার বিরুদ্ধে গিয়ে লক্ষ্য অর্জন করতেও পারেন।
কিন্তু কেন সে পথে যাবেন?: আপনি যদি নিজের কাজটা উপভোগ করেন, তাহলে আপনি অনেক বেশি কার্যকর হবেন, এবং সফলতাও টিকবে দীর্ঘদিন।
তাই বলি কী আপনি যেকোনো সময় নিজের ভেতর থেকে শক্তি এনে কাজ শুরু করতে পারেন। শুধু নিজের লক্ষ্যটা পরিষ্কারভাবে কল্পনা করুন, অজুহাতকে পেছনে ফেলুন, মনের ভেতর থেকে আগুন জ্বালান, ছোট একটি পদক্ষেপ নিন, আর সেটাকে মজা করে তুলুন। আপনার সফলতার পথ শুরু হোক এই মুহূর্ত থেকেই।
