লিখেছেন: শোলা লাওয়াল। ভাষান্তর করেছেন এম. হাসান
রবিবার ভোরে যুক্তরাষ্ট্র ইরানের তিনটি গুরুত্বপূর্ণ পারমাণবিক স্থাপনায় হামলা চালিয়েছে। এই হামলার মাধ্যমে যুক্তরাষ্ট্র সরাসরি ইসরায়েল ও ইরানের চলমান যুদ্ধের মধ্যে জড়িয়ে পড়েছে। এই ঘটনার পর মধ্যপ্রাচ্যে আরও বড় ধরনের যুদ্ধের আশঙ্কা দেখা দিয়েছে, বিশেষ করে গাজায় ইসরায়েলের নৃশংস হামলার প্রেক্ষাপটে।
একটি টেলিভিশন ভাষণে মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প হামলার যৌক্তিকতা তুলে ধরে বলেন, “ইরানের পারমাণবিক হুমকি রুখতেই এই হামলা।” তিনি জানান, নাতাঞ্জ, ইসফাহান এবং ফোরদো—এই তিনটি স্থাপনায় আঘাত হানা হয়েছে, যেগুলো সমৃদ্ধ ইউরেনিয়ামের উৎপাদন বা সংরক্ষণের সঙ্গে জড়িত।
“আজ রাতে আমি বিশ্ববাসীকে জানাতে পারি যে, এই হামলা ছিল একটি অসাধারণ সামরিক সাফল্য। ইরানের প্রধান পারমাণবিক স্থাপনাগুলো পুরোপুরি ধ্বংস করা হয়েছে,” ট্রাম্প বলেন এবং তেহরানকে পাল্টা আঘাত না করার হুঁশিয়ারি দেন।
পারমাণবিক স্থাপনাগুলো নিয়ে কী বিতর্ক?
ইসরায়েল এবং ট্রাম্প প্রশাসনের দাবি, ইরান পারমাণবিক অস্ত্র তৈরির পথে রয়েছে। তবে ইরান সবসময় বলেছে, তাদের পারমাণবিক কর্মসূচি সম্পূর্ণভাবে শান্তিপূর্ণ এবং বেসামরিক। জাতিসংঘের পারমাণবিক পর্যবেক্ষক সংস্থা IAEA-ও ইসরায়েলের অভিযোগ খণ্ডন করে বলেছে, ইরান পারমাণবিক বোমা তৈরি করছে এমন কোনো তথ্য নেই।
ইরানের প্রতিক্রিয়া
যুক্তরাষ্ট্রের এ হামলার নিন্দা জানিয়ে ইরানের পররাষ্ট্রমন্ত্রী আব্বাস আরাগচি বলেন, “কূটনৈতিক পথ এখন বন্ধ। ইরান আত্মরক্ষার অধিকার রাখে।”
তিনি আরও বলেন, “ওয়াশিংটনের এই উসকানিমূলক এবং বেআইনি হামলার ভয়াবহ পরিণতির দায় শুধু যুক্তরাষ্ট্রেরই।”
ইরানের কর্মকর্তারা হামলার ক্ষয়ক্ষতি নিয়ে বিস্তারিত কিছু না জানালেও তা গুরুত্বহীন বলে দাবি করেছেন। ইরানি রাষ্ট্রীয় টিভিতে উপ-রাজনৈতিক পরিচালক হাসান আবেদিনি বলেন, “এই তিনটি পারমাণবিক স্থাপনাগুলো আগেই খালি করে ফেলা হয়েছিল, এবং গুরুত্বপূর্ণ উপাদানগুলো সরিয়ে নেওয়া হয়েছিল। তাই বড় ধরনের ক্ষতি হয়নি।”
কোন পারমাণবিক স্থাপনাগুলোতে হামলা হয়েছে?
১. ফোরদো (Fordow)
তেহরানের উত্তরে কোম শহরের কাছে পাহাড়ের নিচে অবস্থিত একটি গোপন ইউরেনিয়াম সমৃদ্ধকরণ কেন্দ্র।
এই স্থাপনাটিই ছিল হামলার প্রধান লক্ষ্য।
বাঙ্কার-বুস্টার বোমা ব্যবহার করা হয়েছে—বিশেষ করে GBU-57 MOP, যা ৬০ মিটার গভীরে বিস্ফোরণ ঘটাতে সক্ষম।
যুক্তরাষ্ট্রের B-2 স্টিলথ বোমার থেকে ১৪টি MOP বোমা ফেলা হয়েছে বলে জানিয়েছেন জেনারেল ড্যান কেইন।
২. নাতাঞ্জ (Natanz)
ইরানের সবচেয়ে বড় ইউরেনিয়াম সমৃদ্ধকরণ কেন্দ্র। তেহরান থেকে ৩০০ কিমি দক্ষিণে অবস্থিত।
এখানে দুটি স্থাপনা রয়েছে: একটি পরীক্ষা ও গবেষণা কেন্দ্র (PFEP), যেখানে সেন্ট্রিফিউজ তৈরি হয়; এবং একটি গভীর ভূগর্ভস্থ স্থাপনা (FEP) যেখানে ইউরেনিয়াম সমৃদ্ধ করা হয়।
ঠিক কী অস্ত্র দিয়ে হামলা চালানো হয়েছে, তা স্পষ্ট করা হয়নি।
৩. ইসফাহান (Isfahan)
১৯৭০-এর দশকে নির্মিত একটি পারমাণবিক গবেষণা কেন্দ্র।
ইউরেনিয়াম রূপান্তরের কাজ হয় এখানে।
এখানে যুক্তরাষ্ট্রের সাবমেরিন থেকে “দুই ডজনের বেশি” টমাহক মিসাইল ছোড়া হয়েছে।
মার্কিন কর্মকর্তারা দাবি করেছেন, ইরান এই হামলা বুঝতেই পারেনি, এবং পরবর্তীতে তাদের জানানো হয়েছে।
এই হামলাগুলো কতটা কার্যকর হয়েছে বা ইরানের পারমাণবিক কর্মসূচি কতটা ব্যাহত হয়েছে, তা এখনো স্বাধীনভাবে যাচাই করা যায়নি। তবে স্পষ্টতই এই ঘটনা মধ্যপ্রাচ্যে উত্তেজনা নতুন মাত্রায় নিয়ে যেতে পারে।
